আতাতুর্ক থেকে এরদোয়ান, ধ্বংসস্তূপ থেকে আধুনিক তুরস্ক

সাইফুজ্জামান সুমন
সাইফুজ্জামান সুমন সাইফুজ্জামান সুমন , সহ-সম্পাদক, আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮:২৫ পিএম, ২৫ জুন ২০১৮

অটোম্যান সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ থেকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে গিয়ে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে তুরস্ক। আজ বিশ্বে কৌশলগত শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে দেশটি; যার পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে গ্রিস এবং পূর্বে শক্তিশালী ইরান।

২০০২ সাল থেকে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের রক্ষণশীল ইসলামি দলের শাসনাধীনে রয়েছে দেশটি। ১৯২৩ সালে আধুনিক তুরস্কের যাত্রা শুরুর পর থেকে দেশটিতে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের যেসব পরিবর্তন এসেছে তার বেশিরভাগই এনেছেন তিনি।

রোববারের প্রেসিডেন্ট ও আইনসভার নির্বাচনে এরদোয়ান এবং তার রাজনৈতিক দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি (একেপি) বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে বলে অনেক বিশ্লেষক আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। প্রায় দেড় দশক ধরে ক্ষমতাসীন এরদোয়ান নির্বাচনে বড় ধরনের অগ্নি-পরীক্ষার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল শেষ পর্যন্ত তা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে।

শেষ ফলাফলে ব্যাপক ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন এরদোয়ান। ২০১৭ সালের এপ্রিলে এক গণভোটে জয়ের পর দেশটির সংবিধানে পরিবর্তন এনে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে একচ্ছত্র রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ঘোষণা দিয়েছিলেন। শিগগিরই তা কার্যকর করা হবে বলে নির্বাচনে জয়ের পর জানিয়েছেন এরদোয়ান। এর ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকবেন তিনি। একই সঙ্গে মন্ত্রিপরিষদে মন্ত্রী নিয়োগেও থাকবে তার একচ্ছত্র ক্ষমতা।

তবে তার এই ঘোষণার পর বিরোধীরা অভিযোগ করে বলেছেন, ‘এটি চালু হলে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারেন এরদোয়ান। এর মাধ্যমে আরো এক দশক ক্ষমতায় থাকার পথ পোক্ত করবেন তিনি।’

রোববার আঙ্কারায় ফেরার আগে ইস্তাম্বুলে তিনি নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। পরে একেপির প্রধান কার্যালয়ের সামনে লাখ লাখ সমর্থকের উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। এ সময় তাকে ভোট দেয়ার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ৮৮ শতাংশ মানুষ ভোটে অংশ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘তুরস্কের কাছে পুরো বিশ্বের গণতন্ত্র শেখার আছে।’

অটোম্যান সাম্রাজ্যের শাসনাধীনে ছিল ইউরোপের দক্ষিণের বলকান অঞ্চল থেকে আধুনিক সৌদি আরবও। কিন্তু শতাব্দিপ্রাচীন অটোম্যান সাম্রাজ্যের শাসনের অবসান ঘটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে। সাম্রাজ্যবাদী জার্মানির পক্ষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লড়াই করে অটোম্যান সাম্রাজ্য।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মুস্তফা কামাল আতাতুর্কসহ তুরস্কের সামরিক প্রধানরা দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের থ্রেইস থেকে মেসোপটমিয়া পর্যন্ত সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটায়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২৩ সালে আধুনিক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র সৃষ্টির ঘোষণা দেয়া হয়।

অটোম্যান আমলের সেই প্রভাব-প্রতিপত্তি মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে এরদোয়ানের শাসনাধীন বর্তমান তুরস্ক। বিশেষ করে সিরিয়া এবং ইরাকে; পাশাপাশি বলকান উপদ্বীপ এবং আফ্রিকায়।

মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক ছিলেন তুরস্কের প্রথম প্রেসিডেন্ট। ১৯৩৮ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। দেশকে পশ্চিমামুখী করার পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি।

১৯৪৬ সালে দেশটিতে প্রথমবারের মতো বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। আতাতুর্কের উত্তরসূরি ইসমেত ইনোনুর আমলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তুরস্ক নিরপেক্ষ অবস্থান ধরে রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল সমর্থনে একসময়ের শত্রু গ্রিসের সঙ্গে ১৯৫২ সালে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোতে যোগ দেয় তুরস্ক।

এরদোয়ানের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা জোরালো করার অভিযোগ রয়েছে সমালোচকদের। পশ্চিমমুখী অবস্থান থেকে তুরস্ককে সরিয়ে এনেছেন তিনি। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র গড়তে তিনি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে ন্যাটোর কাছে অবস্থান তুলে ধরেন এরদোয়ান।

১৯৬০, ১৯৭১ এবং ১৯৮০ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার ক্ষমতাচ্যুত করে তুরস্কের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। ১৯৬০ সালের অভ্যুত্থানের পর দেশটির ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী আদনান মেনেদেরেস ও তৎকালীন দুই মন্ত্রীকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। এই আদনানই এরদোয়ানের ‘রাজনৈতিক নায়ক।’

রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ক্ষমতায় আসার পর এরদোয়ান সামরিক বাহিনীর লাগাম টানেন। যার মাধ্যমে ২০১৬ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনীর একটি বিদ্রোহী অংশের অভ্যুত্থান চেষ্টা নস্যাৎ করতে সক্ষম হোন তিনি।

এরদোয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত তার একসময়ের মিত্র ফেতুল্লাহ গুলেনই এ অভ্যুত্থান চেষ্টার ইন্ধনদাতা। তবে এরদোয়ানের এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন গুলেন। অভ্যুত্থান চেষ্টার পর এরদোয়ান দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। এই সময়ে দেশে নজিরবিহীন অভিযান চালিয়ে ৫৫ হাজার মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি এবং তার বিরোধীরা নির্বাচনের পর জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছিলেন।

সিরিয়া গৃহযুদ্ধে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরোধিতা করে সেখানে প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে ৮ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ তুরস্ক। সংঘাতের অবসান ঘটাতে সিরিয়ায় মিত্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে আঙ্কারা।

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার প্রায় ৩৫ লাখ শরণার্থী তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। এই শরণার্থীদের বেশিরভাগই তুরস্কের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এবং ইস্তাম্বুলে বসবাস করছেন। ইরাক এবং আফগানিস্তানের কিছুসংখ্যক শরণার্থীর আশ্রয় হয়েছে তুরস্কে।

ইউরোপে শরণার্থীদের ঢল সীমিত করতে ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছায় তুরস্ক। আগের বছর তুরস্ক হয়ে এজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছায় প্রায় ১০ লাখ শরণার্থী। ইইউতে তুরস্কের যোগদানের প্রত্যাশা থেকেই এই চুক্তি স্বাক্ষর বলে সেই সময় ধারণা করা হয়। কিন্তু ইইউতে তুরস্কের যোগদানের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়।

সিরিয়ার কয়েক হাজার শরণার্থীকে পাসপোর্ট দিয়েছে তুরস্ক। কিন্তু সমালোচকরা বলেছেন, শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির ব্যাপারে কৌশলের ঘাটতি রয়েছে তুরস্কের। ২০ শতকের দিকে আধুনিক তুরস্ক ছাড়তে বাধ্য হয় দেশটির অমুসলিম সংখ্যালঘুরা। বর্তমানে দেশটিতে খুব অল্পসংখ্যক সংখ্যালঘু রয়েছেন।

আর্মেনীয়রা তাদের পূর্বপুরুষদের ওপর চালানো হত্যা ও নৃশংসতাকে তুরস্কের ‘গণহত্যা’ বলে দাবি করেন। তবে তুরস্ক এটিকে ‘গণহত্যা’ বলতে নারাজ। ১৯২৩ সালে জনসংখ্যা বিনিময়ের শর্তে অধিকাংশ গ্রিক তুরস্ক ছেড়ে চলে গেছেন।

এখন পর্যন্ত তুরস্কের বৃহত্তম সংখ্যালঘু গোষ্ঠী হলো কুর্দিরা। জনসংখ্যায় পঞ্চম অবস্থানে থাকলেও দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে তারা অধিকারবঞ্চিত বলে অভিযোগ রয়েছে। ১৯৮৪ সালে এক রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহের মাধ্যমে কুর্দিদের দল কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে) হাতে অস্ত্র তুলে নেয়। ওই সময় সশস্ত্র সংঘাতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

এরদোয়ান ক্ষমতায় এসে প্রথম বছরে কুর্দিদের অধিকারের ব্যাপারে নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এমনকি পিকেকের সঙ্গে আলোচনায়ও বসেছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১৫ সালে কুর্দিদের সঙ্গে তুরস্কের অস্ত্রবিরতি চুক্তি ভেস্তে যায়। সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত দেশটিতে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। এমনকি এখন পর্যন্ত পিকেকের সঙ্গে কোনো শান্তিচুক্তি হয়নি।

সূত্র : এএফপি, দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।

এসআইএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :