বিয়ে সন্তানে কেন অনীহা দ. কোরিয়ার তরুণীদের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৩৫ পিএম, ১৬ আগস্ট ২০১৮

সন্তান না নেয়া এবং বিয়ে না করার প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণীদের ঝুঁকে পড়ার হার বেড়ে গেছে। এমনকি পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রেও দেশটির তাদের অনীহা রয়েছে। পৃথিবীতে সবচেয়ে কম জন্মহার যেসব দেশে তার মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া অন্যতম।

বর্তমান অবস্থার কোন পরিবর্তন না হলে দেশটিতে জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমে আসবে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। ২৪ বছর বয়সী জ্যাং ইয়ান-ওয়া বলেন, আমি কখনই সন্তান নেব না। আমার সে পরিকল্পনা নেই। সন্তান নেয়ার জন্য যে শারীরিক ধকল সইতে হয় সেজন্য প্রস্তুত নন তিনি। সন্তান জন্ম দিলে পেশাগত ক্ষতি হতে পারে বলেও মনে করেন এই তরুণী।

ইয়ান-ওয়া একজন ওয়েব কমিক আর্টিস্ট। পেশাগতভাবে তিনি এখন যে অবস্থানে আছেন সেখানে আসতে তাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তিনি চান না তার এ কষ্টার্জিত পেশাগত অর্জন নষ্ট হয়ে যাক। ইয়ান বলেন, একটি পরিবারের অংশ হওয়ার চেয়ে আমি একা এবং স্বাধীন থাকতেই পছন্দ করি।

ওয়ার মতো দক্ষিণ কোরিয়ার অনেক নারী মনে করেন পেশাগত উৎকর্ষতা এবং পরিবার- দু'টি একসঙ্গে হয় না। একটি রাখতে হলে আরেকটি ছাড়তে হবে। এটি তাদের ধারণা।

চাকরি অবস্থায় কোন নারী গর্ভবতী হলে সে যাতে বৈষম্যের শিকার না হয়, সেজন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় আইন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। চোই মুন-জেয়ং-এর গল্পটা সে রকম। তিনি যখন গর্ভবতী হয়ারর বিষয়টি তার অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানালেন, তখন খুব বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আচরণে তিনি রীতিমতো বিস্মিত হন। আমার বস বললেন, আপনার সন্তান হলে সেটিই হবে আপনার মনযোগের জায়গা। তখন কর্মস্থলকে আপনি কম গুরুত্ব দেবেন। তখন আপনি কাজ করতে পারবেন?

সে সময় তিনি একজন ট্যাক্স অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তার উপর কাজের বোঝা চাপাতে থাকেন এবং অভিযোগ করেন যে কাজের প্রতি মুন-জেয়ংয়ের কোন মনযোগ নেই।

মানসিক চাপ সইতে না পেরে একদিন অফিসেই অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। মুন-জেয়ং যাতে চাকরি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয় সে পরিস্থিতি তৈরি করেন তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমার আশপাশে অনেকেই আছেন যাদের কোন সন্তান নেই এবং সন্তান নেয়ার কোন পরিকল্পনাও তাদের নেই।

দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে যেসব কারণ রয়েছে সেগুলো হচ্ছে - মানুষের কঠোর পরিশ্রম, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করা, কাজের প্রতি একাগ্রতা। এসব কারণে দেশটি গত ৫০ বছরে উন্নয়নশীল দেশ থেকে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

কিন্তু এক্ষেত্রে নারীদের অবদানের বিষয়টি উপেক্ষিত রয়ে গেছে। তবে দেশটিতে ব্যাপক অর্থনৈতিক অগ্রগতি হলেও নারীর প্রতি সামাজিক মনোভাব বদলায়নি। ইয়ান-ওয়া বলেন, পুরুষদের মনোরঞ্জনের বিষয় হিসেবে দেখা হয় নারীদের।

কোন মেয়ে চাকরিজীবী হলেও সন্তান জন্মদানের পর তা লালন-পালনের ভার নারীর উপরেই বর্তায়। ইয়ান-ওয়া বলেন, শুধু বিয়ে নয়, তিনি ছেলে বন্ধুও চান না। এর একটি কারণ হচ্ছে, ছেলে বন্ধুর মাধ্যমে পর্নোগ্রাফির ভিকটিম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনেক ছেলে তাদের মেয়ে সঙ্গীর অন্তরঙ্গ ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন এটি বড় একটি ইস্যু।

এছাড়া ছেলে বন্ধু কিংবা স্বামীদের দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতনের আশংকাও রয়েছে। এতে থেকে বোঝা যাচ্ছে যে দক্ষিণ কোরিয়ায় কেন জন্মহার কম। দেশটিতে বিবাহের হার এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে। প্রতি হাজারে ৫.৫ শতাংশ। ১৯৭০ সালে এ হার ছিল ৯.২ শতাংশ।

বিয়ে কিংবা সন্তান নিতে অনাগ্রহের আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। এসব নানা কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার সমাজ ব্যবস্থায় একটি বড় ধরণের পরিবর্তন ঘটছে। এর ফলে দেশটিতে তৈরি হয়েছে সাম্পা প্রজন্ম। সাম্পা শব্দের অর্থ হচ্ছে তিনটি জিনিস বাদ দাও- সম্পর্ক, বিয়ে এবং সন্তান। বিবিসি বাংলা।

এসআইএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :