মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি কি বদলে দিচ্ছে খাশোগি হত্যাকাণ্ড?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৩৩ পিএম, ২৮ অক্টোবর ২০১৮

ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তুরস্ক ও সৌদি আরবের সম্পর্কে টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তুরস্ক নয়, পশ্চিমা আরো কিছু দেশ; সৌদি আরবের সাথে যাদের বহুদিন ধরে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক তাদের জন্যও এই ঘটনা বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে।

বলা হচ্ছে, নিষ্ঠুর এই ঘটনার মধ্য দিয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, যিনি আগামী কয়েক দশক ধরে দেশটির নেতৃত্ব দেবেন, তার চরিত্র সম্পর্কে সত্যিকারের একটা চিত্র ক্রমশঃ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

খাশোগিকে খুন করার ঘটনায় খুব বেশি বিচলিত যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন আশা করেছিল পুরো ঘটনার রেশ যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ হয়ে যাক, কিন্তু মার্কিন রাজনীতিকদের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাই এমন একটি ঘটনার পর সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে নতুন করে যাচাই করে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

বিবিসির প্রতিরক্ষা ও কূটনীতি বিষয়ক সংবাদদাতা জনাথন মার্কাস বলছেন, জামাল খাশোগিকে ঠিক কীভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং পরে তার মৃতদেহ কোথায় ও কীভাবে গুম করা হয়েছে; যখন এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে, তখন যে প্রশ্নটি সবার আগে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে তা হলো কে তাকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন : তুরস্ক যাচ্ছেন সৌদি অ্যাটর্নি জেনারেল 

হয়তো এই প্রশ্নের উত্তর কোনদিনই পাওয়া যাবে না। কিন্তু এখনও পর্যন্ত যেসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে তাতে অনেকেই অভিযোগ করছেন যে সৌদি সরকারের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কাছ থেকে এই হত্যাকাণ্ডের আদেশ এসে থাকতে পারে।

এই সৌদি যুবরাজ এমবিএস নামে পরিচিত, দেশের বহু ক্ষমতা এখন যার হাতে। অনেক সৌদি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, উপর মহলের আদেশ ছাড়া এরকম একটি হত্যাকাণ্ড ঘটানো অসম্ভব। তবে এমবিএস এর সাথে কতটা সরাসরি জড়িত সেনিয়ে এখনও স্পষ্ট কোন তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- তুরস্কের কাছে এবিষয়ে আর কী ধরনের তথ্য আছে?

বিবিসির সাংবাদিক জনাথন মার্কাস বলছেন, তুর্কী প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সৌদি যুবরাজের সাথে অনেকটা ইঁদুর-বিড়ালের মতো খেলছেন। 'এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে লোকজনকে তিনি যা বলছেন, মনে হচ্ছে তিনি তার চাইতেও বেশি জানেন। কিন্তু কতোটা বেশি জানেন ও কী জানেন সেটা এখনও পরিষ্কার নয়।'

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন, আইনগত সব ধরনের ব্যবস্থাই তারা নিচ্ছেন, কিন্তু নাটকীয়তাও ধরে রেখেছেন তিনি। কারণ তিনি চান এমবিএসকে যতোটা সম্ভব চাপের মধ্যে রাখতে- লিখেছেন মার্কাস।

আরও পড়ুন : কাতারের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে সৌদির 

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় সুন্নি অধ্যুষিত ও নিয়ন্ত্রিত দুটো দেশ- সৌদি আরব ও তুরস্ক। তারা উভয়ই চাইছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আরো বৃহত্তর নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে।

এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা একদিকে তুরস্কের ভেতরে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে আবার একই সাথে ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক উন্নত করার জন্যেও এটি একটি সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।

সাংবাদিক জনাথন মার্কাস বলছেন, শুধু তাই নয়, এরদোয়ান যদি সৌদি আরবের ওপর এই চাপকে দক্ষতার সাথে কাজে লাগাতে পারেন এবং সময় মতো সেটা ব্যবহার করেন তাহলে তিনি হয়তো সৌদি আরব থেকে আরো বেশি বিনিয়োগ অথবা অর্থনৈতিক সাহায্য আদায় করে নিতে পারবেন; যা তুরস্কের দুর্বল অর্থনীতিকে কিছুটা হলেও চাঙা করবে।

তুরস্কের জন্যে এটা এতোটা সহজ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে ঠিক ততোটাই কঠিন। কারণ ওয়াশিংটনকে একদিকে যেমন নিজেদের স্বার্থ দেখতে হবে তেমনি অন্যদিকে তারা যেসব রাজনৈতিক মূল্যবোধের কথা বলে সেগুলোকেও রক্ষা করতে হবে। এটা শুধু সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। দুটো দেশের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক এই অস্ত্র বিক্রি তার একটি অংশ মাত্র। এই সম্পর্কের পেছনে আরো রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক হিসাব নিকাশ। একসময় এই সম্পর্কের একেবারে কেন্দ্রে ছিল তেল। কিন্তু সেই নির্ভরতা এখন আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।

এই দুটো দেশের সম্পর্কে এর আগেও টানাপড়েনের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সৌদি আরবের ক্ষমতাবলয়ে এমবিএসের আবির্ভাবের পর এটি আরো জটিল রূপ নিয়েছে। ক্ষমতায় এসেই তিনি দেশের ভেতরে সংস্কারের যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন সেগুলো তার গৃহীত নীতিমালার বহু খারাপ দিককেও ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে।

আরও পড়ুন : মালিকের অনুমতি ছাড়াই দেশে আসতে পারবেন কাতার প্রবাসীরা

কিন্তু খুব বেশি দিন চাপা দিয়ে রাখতে পারেননি। কাতারকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টার মূল নায়ক হিসেবে দেখা হয় তাকেই। লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে কিছুদিনের জন্যে অপহরণ করে আটকে রাখার জন্যেও তাকে দায়ী করা হয়। মানবাধিকার নিয়ে কানাডার সঙ্গে সম্প্রতি যে তর্কাতর্কি হয়েছে এবং সর্বোপরি ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বে সামরিক অভিযানের পেছনেও দেখা হয় এই এমবিএসকেই- লিখেছেন জনাথন মার্কাস।

এসব কারণে ওয়াশিংটনে অনেকেই মনে করেন, এমবিএসের গৃহীত নীতিমালা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক তো নয়ই, বরং এর বিপরীত হিসেবেই কাজ করছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন তাদের নীতিমালার সব ডিম রেখেছেন এমবিএসের ঝুড়িতে।

এসব নীতিমালার মধ্যে রয়েছে তিনটি লক্ষ্য। প্রথমত : সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহযোগিতা করা, দ্বিতীয়ত : ইসরায়েল-ফিলিস্তিনি বিরোধের নিষ্পত্তিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে শান্তি পরিকল্পনা দিয়েছেন তার ব্যাপারে ফিলিস্তিনিদের উদ্বুদ্ধ করা এবং তৃতীয়ত : যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিও, সেটা হচ্ছে সৌদি আরবকে সাথে নিয়ে ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা।

আর এসব কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে খাশোগির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সেটা যেন তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। ফলে ট্রাম্পের শাসনামলে সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে নতুন করে যাচাই করে দেখার হয়তো কোন সুযোগ নেই।

আরও পড়ুন : ‘পাকিস্তান বা ব্রিটিশরা নয়, দেশভাগের জন্য দায়ী ভারত’

তাহলে সৌদি আরব কি এমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে যার ফলে যুবরাজ এমবিএসের ক্ষমতায় লাগাম পরানো হবে? কিন্তু গত সপ্তাহে অর্থনৈতিক ফোরামের এক সম্মেলনে এমবিএসকে দেখে মনে হয়েছে দেশের ভেতরে তার কোন ধরনের সমস্যা নেই।

রাশিয়া ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা সাইড-লাইনে থেকে সবকিছু দেখছে। তারা এই হত্যাকাণ্ডে সৌদি আরবের ভাষ্যকে বিশ্বাস করে নিতে বলছে। এর কারণ হয়তো এই যে রাশিয়াও এখন সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে আগ্রহী।

এছাড়াও প্রেসিডেন্ট পুতিন নিজেও চান মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব ও ভূমিকা বাড়াতে। সৌদি আরবের পক্ষেও খুব দ্রুত অস্ত্রের জন্যে পশ্চিমা দেশ থেকে চীনের দিকে সরে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ পশ্চিমা অস্ত্র, প্রশিক্ষক, উপদেষ্টা দিয়েই তারা ইয়েমেনে অভিযান পরিচালনা করছে।

সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর মধ্যেও রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান। ফলে তারা যদি একসাথে ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে সৌদি আরবের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্কে পরিবর্তন আসার কোন সম্ভাবনা আপাতত নেই, অন্তত হোয়াইট হাউসে ক্ষমতার পালাবদল না ঘটা পর্যন্ত। বিবিসি বাংলা।

এসআইএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :