সু চিকেও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:০০ পিএম, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বলছেন, মিয়ানমারের এক সময়কার গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সু চি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন। সেখানে তিনি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যায় তার দেশের সামরিক বাহিনীর পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনী গণহত্যা চালায়নি।

এক সময় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করা ও দীর্ঘদিন গৃহবন্দি থাকা এই নেত্রী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন এবং ধর্ষণের ঘটনা দেখেও নীরব থেকেছেন। মিয়ানমারের রাখাইনে গণহত্যার দায়ে দায়েরকৃত মামলার দ্বিতীয় দিনের শুনানিতে নিজের দেশের সামরিক বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে সু চি বলেন, দুঃখজনকভাবে রাখাইনের অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর চিত্র উপস্থাপন করেছে গাম্বিয়া।

জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গত নভেম্বরে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ এনে মামলা করে গাম্বিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যার দায়ে তৃতীয় মামলা এটি। বুধবার নেদারল্যান্ডসের রাজধানী দ্য হেগেতে মিয়ানমারের গণহত্যার বিরুদ্ধে শুনানি শুরু হয়। শুনানি তিনদিন চলবে।

নিউজ এজেন্সি এপিকে আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোহিবুল্লাহ বলেন, পুরো বিশ্ব গণহত্যার প্রমাণ দেখবে। তারা গণহত্যা চালায়নি বলে যে দাবি করছে তার বিচার করবে বিশ্ব।

কক্সবাজারের কুতুপাং রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে এই রোহিঙ্গা নেতা বলেন, কোন চোরই স্বীকার করে না যে সে চোর। কিন্তু প্রমাণের মাধ্যমে তাকে ন্যায়বিচারের আওতায় আনা হয়।

যদি সু চি মিথ্যা বলে থাকেন তবে তিনিও ছাড় পাবেন না। তাকেও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। বিশ্ব তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। সামরিক জান্তা সরকারের আমলে দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দি থেকেছেন সু চি। আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড়িয়ে সেই সেনাবাহিনীর পক্ষ নিয়ে তিনি বলেছেন, এখানে শুধু অনুমানের ওপর ভিত্তি করে গণহত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে; যা হতে পারে না। সামরিক বাহিনীর অভিযানে রক্তপাত হলেও গণহত্যার মতো কিছু হয়নি।

su-kyi-2

সু চি বলেন, সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে ২০১৭ সালে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে রোহিঙ্গারা। বেসামরিক হত্যা, নারীদের ধর্ষণ ও বাড়ি-ঘরে সেনাবাহিনীর আগুন দেওয়ার ঘটনা তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বেশ কিছু পুলিশ ও সেনা পোস্টে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেখানে অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। অভিযানের নামে রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ, হত্যা ও তাদের বাড়ি-ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

জাতিসংঘের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী সেখানে জাতিগত নিধন চালিয়েছে। তবে মিয়ানমারের তরফ থেকে বরাবরই এই অপরাধের কথা অস্বীকার করা হয়েছে। দেশটির তরফ থেকে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে শতাধিক গ্রামে সেনা অভিযান চালানো হয়েছে।

সেনাবাহিনীর নির্যাতন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। বাংলাদেশের শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে এসব রোহিঙ্গা। অধিক জনসংখ্যা নিয়ে বিপাকে থাকা বাংলাদেশ বহুদিন ধরেই এসব রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। অথচ এই ঘটনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করলেন সু চি। তিনি জাতিগত নিধন এবং গণহত্যার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

আল জাজিরার কাছে দেয়া এক বিবৃতিতে নিউ ইয়র্কের গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট আকিলা রাধাকৃষ্ণ বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ছাড়া অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বের যে চিত্র সু চি তুলে ধরেছেন তা মিথ্যা।

বেশ কিছু স্বতন্ত্র সংস্থা এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি এমনকি বহু রোহিঙ্গা গণহত্যা, ব্যাপকহারে ধর্ষণ এবং নিরীহ বেসামরিকদের সম্পদ দখল ও নির্বিচারে হত্যার প্রমাণ দেখিয়েছেন। দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। নুর কামাল নামের এক রোহিঙ্গা শরণার্থীও সু চির সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনারা লোকজনকে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে, তাদের বাড়ি-ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এটা কি গণহত্যা নয়?

টিটিএন/জেআইএম