বিক্ষোভে উত্তাল পশ্চিমবঙ্গের ছয় জেলায় ইন্টারনেট বন্ধ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:২৮ পিএম, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯

বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে ভারতের উত্তরপূর্বের রাজ্যগুলোর সঙ্গে গত শুক্রবার থেকে পশ্চিমবঙ্গেও বিক্ষোভ শুরু হয়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা গণআন্দোলনের ডাক দিয়ে নিজে রাস্তায় নামার ঘোষণা দেন। কিন্তু টানা তিনদিনের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়ায় ছয় জেলায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দিয়েছে মমতার রাজ্য সরকার।

নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে গতকাল শনিবার বিক্ষোভ-অগ্নিসংযোগের পর আজ রোববারও রাজ্যটির বিভিন্ন এলাকায় উত্তাপ বিরাজ করছে। কোথাও রেল অবরোধ, কোথাও রাস্তা আটকে আইনটির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যম বলছে, এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার রোববার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বারবার অনুরোধ ও নির্দেশনা (মমতা এর আগে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান) সত্ত্বেও ‘কিছু বহিরাগত গোষ্ঠী বিক্ষোভে অনুপ্রবেশ করে সহিংসতার উস্কানি দিয়ে বিক্ষোভকারীদের প্ররোচিত করার মাধ্যমে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে।’

বিবৃতিতে উল্লিখিত যুক্তি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকার বলছে, পরিস্থিতি এমন রূপ ধারণ করার প্রেক্ষিতে সরকারের হাতে অন্য কোনো উপায় না থাকায় ছয় জেলা ও মহকুমায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে আজ রোববার ওই বিবৃতি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া জেলা ও উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসত ও বসিরহাট মহকুমা এবং দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুর ও ক্যানিং মহকুমায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করার কথা জানানো হয়।

গতকাল শনিবার নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও হাওড়া জেলা। মুর্শিদাবাদের কৃষ্ণপুরে বেশ কয়েকটি ট্রেনে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে স্টেশন ভাঙচুর করে বিক্ষোভকারীরা। হাওড়ার বেশকিছু স্থানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। ক্ষুব্ধ জনতা ১৫টি গাড়িতে আগুন দেয়, ভাঙচুর করা হয় স্টেশন ও ট্রেন।

এরপর আজ রোববার দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মাল্লিকপুর স্টেশন অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। মহেশতলা থানার ডাকঘর থেকে ডাকঘরা জালখুরা পর্যন্ত রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষুব্ধ জনতা। নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করা হয় বজবজ ট্যাঙ্করোড।

এদিকে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) ও নাগরিকত্ব সংশোধনী বলি (সিএএ) প্রতিবাদে পথে নেমেছে তৃণমূল কংগ্রেস। মমতার রাজ্য সরকারের মন্ত্রী মলয় ঘটকের নেতৃত্বে আসানসোল ট্রাফিক কলোনি থেকে গির্জা মোর পর্যন্ত প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি। জিটি রোড হয়ে গির্জা মোড়ে গিয়ে শেষ হয়।

গতকাল শনিবার পাঞ্জাব ও কেরালার মুখ্যমন্ত্রীর মতো পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও ফের ঘোষণা দেন তার রাজ্যে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কার্যকর করতে দেবেন না। সহিংসতার পথ পরিহার করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিজেপি সরকারের এ আইনের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদে সবাইকে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘সড়ক-রেলপথ অবরোধ করবেন না। সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করা হলে তা বরদাস্ত করা হবে না। যারা সমস্যা তৈরির চেষ্টা করবেন এবং যারা আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন তারাও ছাড় পাবে না। এছাড়া যারা বাসে আগুন দিচ্ছেন, ট্রেনে পাথর মারছেন কিংবা সরকারি সম্পদ ধ্বংস করছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে উত্তরপূর্ব ভারতের আসাম সবচেয়ে বেশি বিক্ষোভে উত্তাল। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সীমানা লাগোয়া রাজ্যটির ১০ জেলায় ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কারফিউ ভেঙে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেন বিক্ষোভ করছেন। উত্তরপূর্বে কিছু সেনা মোতায়েন ছাড়াও আরও সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতি নিয়েছে কেন্দ্র সরকার।

প্রসঙ্গত, ভারতের ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে এ সংশোধনে গত সোমবার ভারতীয় পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভায় একটি বিল (সিএবি) উত্থাপন করেন অমিত শাহ। ব্যাপক বিতর্কের পর সেদিন মধ্যরাতে বিলটি পাস হয়। এরপর গত বুধবার রাজ্যসভায়ও বিলটি পাসের পর রাষ্ট্রপতি গত বৃহস্পতিবার স্বাক্ষর করায় সেটি এখন আইন।

নতুন এই আইন অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ ২০১৫ সালের আগে প্রতিবেশী পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে ‘ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার’ হয়ে যেসব অমুসলিম (হিন্দু, শিখ, খ্রিষ্টান, জৈন, পারসি ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা) ভারতে গেছেন তাদের ভারতীয় নাগরিকত্ব দেয়া হবে।

বিরোধী দলের এমপিরা পার্লামেন্টে মোদি সরকারের প্রস্তাবিত এ বিলটিতে আপত্তি জানালেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিলটি পাসে কোনো বেগ পেতে হয়নি সরকারকে। বিরোধীরা বলছেন, নতুন আইনের মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষদের নাগরিক সুরক্ষাকে উপেক্ষা করা হবে, যা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন রাজ্য আসামসহ উত্তরপূর্ব ভারতে বিক্ষোভকারীদের দাবি, আইনটির মাধ্যমে অন্য দেশ থেকে আসা অভিবাসীরা সহজেই এ দেশের (ভারতের) নাগরিকত্ব পাবেন। তাতে সংকটে পড়বেন আদি বাসিন্দারা। তবে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বলেছেন, আইনটিতে উত্তরপূর্বের অনেকটা অংশই বাদ দেয়া হয়েছে।

এসএ/এমএস