যুদ্ধাপরাধ স্বীকার করে মিয়ানমার বলছে ‘গণহত্যা হয়নি’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:২১ এএম, ২১ জানুয়ারি ২০২০

‌রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কঠোর অভিযানের সময় রাখাইনে কোনও ধরনের গণহত্যার ঘটনা ঘটেনি। তবে সেখানে কিছু সেনাসদস্য যুদ্ধাপরাধের মতো কিছু অপরাধ সংঘটিত করেছেন। রাখাইনে রোহিঙ্গা নিপীড়নের ঘটনা তদন্তে মিয়ানমার সরকারের গঠিত স্বাধীন তদন্ত কমিশনের (আইসিওই) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সোমবার মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কাছে তদন্তের সারসংক্ষেপ জমা দিয়েছে কমিশন।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা বলছে, জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালত রাখাইনে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে রুল জারি করা হবে কিনা সে ব্যাপারে ২৩ জানুয়ারি আদেশ দেবেন। তার আগেই এ প্রতিবেদন প্রকাশ করলো মিয়ানমার।

আইসিওইর তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু কর্মকর্তা নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা, তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়াসহ অসম শক্তিপ্রয়োগ করেছে; যা মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন এবং যুদ্ধাপরাধের শামিল। তবে সেটাকে গণহত্যা বলা যায় না।

কমিশনের মতে, একটি জাতি, গোষ্ঠী, জাতিগত বা ধর্মীয় সংগঠনকে পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সেখানে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে- এ নিয়ে তর্ক করার জন্য যথেষ্ট প্রমাণের অভাব রয়েছে; আর সিদ্ধান্তে আসার ক্ষেত্রে এর অভাব আরও বেশি।

২০১৭ সালে রাখাইনে সামরিক অভিযানে ব্যাপক দমন-পীড়নের মুখে অন্তত ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

ধাপ্পাবাজির চেষ্টা

রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের হামলায় কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হওয়ার কারণ দেখিয়ে তাদের সমূলে উৎখাত করতে শুরু থেকেই সশস্ত্র শক্তি প্রয়োগ করছে মিয়ানমার। কিন্তু ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ, ধর্ষণ, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগসহ বর্বর হামলা চালানো হয়েছে। সেই ভয় আর নিরাপত্তাশঙ্কায় এখনও নিজভূমিতে ফিরে যেতে রাজি হচ্ছেন না রোহিঙ্গারা।

গ্লোব্যাল জাস্টিস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট আকিলা রাধাকৃষ্ণ এক বিবৃতিতে বলেন, সব লক্ষণ মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ ও রোহিঙ্গারা ইতোমধ্যে যা জানেন সেদিকেই নির্দেশ করছে যে, গণধর্ষণ ও অন্যান্য গণহত্যার মতো অপরাধে দোষীদের বিচারের আওতায় আনার কোনও ইচ্ছা নেই সরকারের। এই কমিশন হচ্ছে দায়িত্ব বিপথগামী ও রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে ধাপ্পাবাজির আরেকটি দেশীয় চেষ্টা।

মিয়ানমারের এই তদন্ত কমিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফিলিপাইনের কূটনীতিক রোজারিও মানালো। তার সঙ্গে দু’জন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিও রয়েছেন।

কাজের শুরু থেকেই সন্দেহ

মিয়ানমারের গঠিত কমিশনের এই তদন্তকে ‘শুরু থেকে গভীর ত্রুটিযুক্ত’ বলে জানিয়েছে দ্য বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকে (বিআরওইউকে)। পাশাপাশি, কমিশনের ম্যান্ডেট নিয়ে উদ্বেগ ও তাদের কাজে স্বাধীনতার অভাব ছিল বলেও দাবি করেছে তারা।

সংস্থাটির মুখপাত্র তুন খিন এক বিবৃতিতে এ তদন্ত প্রতিবেদনকে ‘চলতি সপ্তাহে আন্তর্জাতিক আদালতের রুল থেকে দৃষ্টি ফেরানোর বিশ্রী চেষ্টা’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এটা রোহিঙ্গা গণহত্যাকে কার্পেটের নিচে চাপা দেয়ায় মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের খুবই সাধারণ একটা চেষ্টা।

আইসিওই’র প্রতিবেদনে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের উল্লেখ নেই

রোহিঙ্গা সংকটে তদন্তে ২০১৮ সালের জুন মাসে মিয়ানমারের স্বাধীন তদন্ত কমিশন (আইসিওই) গঠন করা হলে এর প্রধান রোজারিও মানালো জানিয়েছিলেন, এতে কাউকে দোষারোপ করা হবে না, কারও দিকে আঙুল তোলা হবে না।

এর কয়েক মাস পরেই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, জাতিসংঘের সংস্থা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কথিত ‘মিথ্যা অভিযোগ’-এর জবাব দিতেই এ তদন্ত করা হচ্ছে।

গতবছর জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দলকেও রাখাইনে ঢুকতে দেয়নি মিয়ানমার। দলটি জানিয়েছিল, কমিশনের এই প্যানেল ‘কার্যকর স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়া’র জন্য নয়।

আন্তর্জাতিক আদালতের রুল

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ডেপুটি ডিরেক্টর ফিল রবার্টসন তাৎক্ষণিকভাবে কমিশনের পুরো তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, আইসিওই’র পদ্ধতি ও কার্যক্রমসহ পুরো তদন্তটাই স্বচ্ছতা থেকে অনেক দূরে।

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি গত মাসে নেদারল্যান্ডেসের হেগ-এ গিয়ে তার দেশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত নিজেরাই করতে সক্ষম বলে সাফাই গেয়েছিলেন। সেসময় ওআইসির পক্ষ থেকে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে যে মামলা করেছে, তা পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তিনি।

শুধু এই একটাই নয়, আরও আইনি লড়াইয়ের মুখে রয়েছে মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের একটি পৃথক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে, রয়েছে আর্জেন্টিনার দায়ের করা মামলাও। কমিশন বলছে, মিয়ানমারের বেসামরিক ও সামরিক কর্তৃপক্ষের তদন্ত এবং সম্ভাব্য মামলা দায়েরের সুবিধার্থে ৪৬১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি হস্তান্তর করা হবে।

টিটিএন/কেএএ/জেআইএম