ভারতীয় সেনাবাহিনীতে লিঙ্গ বৈষম্য ঘোচাতে সুপ্রিম কোর্টের রায়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:৫৪ পিএম, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ভারতের সেনাবাহিনীতে লিঙ্গ-বৈষম্য ঘোচাতে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। আজ সোমবার সুপ্রিম কোর্ট তার রায়ে সেনাবাহিনীতে নারীদের ‘স্থায়ী কমিশন ব্যবস্থা’ কার্যকর করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন। কমব্যাট উইং বাদে সেনাবাহিনীর সব স্তরে আগামী তিন মাসের মধ্যে এই নিয়ম চালু করতে বলা হয়েছে।

আনন্দবাজার পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেনাবাহিনীতে নারীরা যাতে পুরুষদের মতো সমান সুযোগ-সুবিধা পান, সুপিম কোর্ট তার রায়ে সে দিকেও নজর রাখারও নির্দেশ দিয়েছেন। সেনাবাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া যুক্তি লিঙ্গ বৈষম্যমূলক, পুরনো ধারণা প্রসূত এবং বিরক্তিকর বলেও মন্তব্য করেছেন আদালত।

শর্ট সার্ভিস কমিশনের (এসএসসি) আওতায় যেসব নারী ১৪ বছরের বেশি সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন, তাদের স্থায়ী কমিশনে অন্তর্ভূক্ত করতেও কেন্দ্রকে নির্দেশ দিয়েছেন শীর্ষ আদালত। বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় ও অজয় রাস্তোগির ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, সেনাবাহিনীতে নারী নিয়োগ প্রগতিশীল পদক্ষেপ। এ নিয়ে কোনওরকম বৈষম্য চলবে না।

ভারতীয় বাহিনীতে চিকিৎসা পরিষেবার বাইরে অন্য ভূমিকায় নারীদের নিযুক্তি শুরু হয় ১৯৯২ সালে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত স্থায়ী ‘কমিশনড অফিসার পদে’ কাজ করার সুযোগ নারীরা পাননি। পদোন্নতি বা পেনশনের আশা না করে শুধু ১৪ বছর কাজের সুযোগ পাচ্ছিল তারা। আর এই বৈষম্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির নারী সেনারা সরব।

সশস্ত্র বাহিনীতে যুদ্ধ করা এবং কমান্ডিং অফিসার পদে নিযুক্তির জন্য আবেদন করেন ৫৭ নারী সেনা। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে দেয়া এক রায়ে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর তিন বিভাগেই নারীদের ‘স্থায়ী কমিশন’ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল দিল্লি হাইকোর্ট। কিন্তু হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার।

হাইকোর্টের রায়কেই চ্যালেঞ্জ করে সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয় দেশটির সরকার। তারপর ২০১০ সাল থেকে সেই আবেদন বিচারাধীন ছিল। সুপ্রিম কোর্ট আজ সোমবার দেয়া ঐতিহাসিক রায়ে বলেন, হাইকোর্টের রায়ের ওপর শীর্ষ আদালত স্থগিতাদেশ দেয়নি। তাহলে কেন হাইকোর্টের নির্দেশ এর আগে কার্যকর করা হয়নি।

তবে ২০১৮ সালে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে সেনাবাহিনীতে স্থায়ী কমিশনড পদে নারীদের নিয়োগ করা হবে বলে জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সব শাখায় এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে কি না, তা খোলসা করেননি তিনি। এরপর থেকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে।

সম্প্রতি তা নিয়ে নতুন করে শুনানি শুরু হলে কেন্দ্রীয় সরকার আদালতকে বলে, নারী সেনাদের একটি বড় অংশ গ্রাম থেকে আসেন। নারীদের নির্দেশ মানার মতো উপযুক্ত মানসিকতা এখনো তৈরি হয়নি। এমনকি দেহগঠন সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে মেয়েরা যুদ্ধ করার উপযুক্ত নয় বলেও আদালতে যুক্তি দেয় কেন্দ্রীয় সরকার।

মাতৃত্ব, শিশুপরিচর্যা, যুদ্ধক্ষেত্রে বিপক্ষের হাতে ধরা পড়ার বিপদসহ নানা প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। এ নিয়ে কেন্দ্রকে ভর্ৎসনাও করেন শীর্ষ আদালত। আদালত জানায়, ‘পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন নারীরা। কেন্দ্রের যুক্তি পুরনো ধারণাপ্রসূত এবং লিঙ্গ বৈষম্যমূলক। নারী সেনা কর্মকর্তারাও দেশের সম্মান বৃদ্ধি করছেন।’

ভারতে এখন শর্ট সার্ভিস কমিশনের আওতায় ১০ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে কাজের সুযোগ পান নারীরা। তবে এর আওতায় সেনা পরিষেবা বিভাগ, অস্ত্র কারখানা, শিক্ষা ও বিচার বিভাগ, ইঞ্জিনিয়ারিং, সিগন্যাল, গোয়েন্দা এবং ইলেকট্রিক্যাল এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে কাজের সুযোগ রয়েছে তাদের।

কিন্তু পদাতিক বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, যন্ত্রনির্ভর বাহিনী এবং কামান বাহিনীতে যুদ্ধ করার সুযোগ নেই দেশটির সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত নারী সদস্যদের। বিমানবাহিনী এবং নৌবাহিনীর ক্ষেত্রেও একইভাবে বঞ্চিত নারীরা। দেশটির গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে, সর্বোচ্চ আদালতের এ রায় সেনাবাহিনীতে লিঙ্গবৈষম্য দূর করলো।

এসএ/এমকেএইচ