বিতর্কিত ‘হংকং নিরাপত্তা আইন’ সম্পর্কে যা জানা দরকার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:১৪ পিএম, ০৪ জুলাই ২০২০

গত ৩০ জুন চীনের পার্লামেন্টে পাস হয়েছে বিতর্কিত হংকং নিরাপত্তা আইন। এতে আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলটির ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব আরও বেড়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এতে হংকংয়ের নাগরিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কী আছে হংকং নিরাপত্তা আইনে?
১৯৯৭ সালে যুক্তরাজ্য হংকংকে চীনের হাতে তুলে দেয়ার পর থেকেই জাতীয় নিরাপত্তা আইন পাসের দাবি ছিল বেইজিংয়ের। হংকংয়ের নেতারা সেই চেষ্টাও করেছিলেন, কিন্তু জনতার বাধার মুখে তা আর পাস করতে পারেননি।

শেষ পর্যন্ত অধৈর্য হয়ে গত ২২ মে আইন প্রণয়নের দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেয় চীন সরকার। হংকংয়ের স্বাধীন আইন ব্যবস্থা থাকলেও তাদের ক্ষুদ্র-সংবিধানে এরকম একটি সুযোগ রাখা ছিল। ফলে বেইজিংয়ের হস্তক্ষেপে বেশি কিছুর করার ছিল না হংকংয়ের নেতাদের।

নতুন আইনে বর্ণিত চারটি অপরাধ হল- বিচ্ছিন্নতা দাবি, কেন্দ্রীয় চীন সরকারের বিরোধিতা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং জাতীয় সুরক্ষা বিপন্ন করতে বিদেশিদের সঙ্গে জোট বাঁধা।

নতুন আইনে কী হবে?
আইনটি মূল ভূখণ্ডের চীনা কর্মকর্তাদের প্রথমবারের মতো হংকংয়ে কাজ করার অনুমতি দিয়েছে। হংকংয়ের স্থানীয় আইন ও সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদের ওপরও প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা পেয়েছে বেইজিং।

হংকংয়ের স্বাধীনতা দাবি এখন অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। বিক্ষোভের সময় সরকারি সম্পত্তি নষ্ট হলে তা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে ধরা হবে।

hong-kong-1

এসব অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে নতুন নিরাপত্তা আইনে।

আইন পাসের পর
হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা কার্যালয় স্থাপন করবে বেইজিং, এটি পরিচালনা করবেন চীনের মূল ভূখণ্ডের কর্মকর্তারা। তারা শহরটিতে আইনের শাসন পরিচালনা করবেন এবং তাদের কাজ হংকংয়ের বিচার ব্যবস্থার অধীনে থাকবে না।

হংকং সরকার নিজস্ব জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি গঠন করবে, সেখানে বেইজিং নিযুক্ত একজন পরামর্শক থাকবেন। আইনিভাবে তাদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা যাবে না।

হংকংয়ের আদালত জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক ঘটনাগুলো দেখাশোনা করবে, তবে বিশেষ ক্ষেত্রে বেইজিং তাদের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারবে।

আইনটি হংকংয়ে যেকোনও মানুষের জন্য, অর্থাৎ বিদেশিদের জন্যেও প্রযোজ্য। কেউ বিদেশে আইনভঙ্গ করলেও তিনি যখন হংকং আসবেন, তখন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

হংকং নিজে কেন আইন পাস করেনি?
২০০৩ সালে তৎকালীন হংকং সরকার জাতীয় নিরাপত্তা আইন পাসের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু, স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার শঙ্কায় ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয় তারা। পরে আর কোনও সরকার এ উদ্যোগ নেয়ার সাহস করেনি।

hong-kong-2

২০১৯ সালে আবারও বিক্ষোভে উত্তায় হয়ে ওঠে হংকং। সেসময় অপরাধী প্রত্যর্পণ আইনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন হংকংবাসী। এই আইনে হংকংয়ের কোনও অভিযুক্তকে চীনের মূল ভূখণ্ডে প্রত্যপর্ণের বিধান রাখা হয়েছিল।

শুরুতে প্রত্যর্পণ আইনবিরোধী হলেও ধীরে ধীরে গণতন্ত্রকামী ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয় এ আন্দোলন। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা এ আন্দোলন দমাতে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।

হংকং সরকারের ব্যর্থতায় শেষ পর্যন্ত আইন প্রণয়নের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেয় বেইজিং।

হংকং নিরাপত্তা আইন নিয়ে এত বিতর্ক কেন?
নতুন আইনে হংকংয়ের ওপর বেইজিংয়ের প্রভাব ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে। এতে হংকংয়ের রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণের আশঙ্কা করছেন সমালোচকরা। অনেকের দাবি, বিদ্রোহীদের দমনে এই আইনের ব্যবহার করবে চীন।

চীনের মূল ভূখণ্ডে গণতন্ত্রকামী, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাংবাদিকদের চাপে রাখতে জাতীয় নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করে বেইজিং। হংকংয়ে এধরনের ঘটনা এতদিন না শোনা গেলেও নতুন আইনের পর পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে।

হংকং সরকার কী বলছে?
আইনের খসড়া প্রণয়নের সময় হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যারি লাম বলেছিলেন, গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ‘ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া বিকল্প নেই’, তাছাড়া চীনের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় হংকংয়েরও একটা ‘সাংবিধানিক দায়িত্ব’ রয়েছে।

hong-kong-4

তিনি বরাবরই নতুন আইনে নাগরিক অধিকার খর্ব হওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন। আইন পাস হওয়ার পরদিন গত ১ জুলাই এ ঘটনাকে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ বলে উল্লেখ করেন ক্যারি লাম।

বিশ্বনেতারা কী বলছেন?
হংকং নিরাপত্তা আইন পাসের আগেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এ প্রক্রিয়ায় জড়িত চীনা কর্মকর্তাদের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও হংকংয়ের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা বাতিল করে বেইজিংয়ে কড়া সতর্কতা দিয়েছেন। হংকং নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করেছেন অন্যান্য মার্কিন নেতারাও।

নতুন আইনে হংকয়ের স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন হচ্ছে জানিয়ে হংকংয়ের ৩০ লাখ মানুষকে নাগরিকত্ব দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।

হংকংয়ে নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নও।

সূত্র: সিএনএন

কেএএ/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]