হংকংয়ে গৃহকর্মীদের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবন!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৩৮ পিএম, ১০ জুলাই ২০২০

ফিলিপাইনের নাগরিক মার্তা (ছদ্মনাম)। ২০১১ সালে উন্নত জীবনের আশায় হংকংয়ে আসেন। দেশে একমাত্র মেয়ে এবং অসুস্থ বাবাকে যাতে সহায়তা করতে পারেন সেজন্যই হংকংয়ে পাড়ি জমান ২৯ বছর বয়সী এই নারী।

তিনি জানতেন, বিদেশে গৃহকর্মীরা দেশের কর্মীদের চেয়ে অনেক বেশি বেতন পান। হংকংয়ে পৌঁছানোর আগে দেশের একটি নিয়োগকারী সংস্থা তাকে গৃহকর্মীর চাকরি খুঁজে দেয়। এই চাকরি অনুযায়ী- নিয়োগকৃতদের গৃহকর্মী, ব্যক্তিগত শেফ, আয়া এবং তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করতে হয়।

হংকংয়ের সব গৃহকর্মীদের মতো কাজের জন্য নিয়োগকর্তার বাড়িতেই তাকে বসবাস করতে হয়। মার্তার কথায়, এই ছয় মাস নিয়োগকর্তার বাড়িতে যে ধরনের শারীরিক এবং মানসিক নিপীড়নের শিকার হতে হয় তা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে চুক্তি লঙ্ঘন করে পালিয়ে যান মার্তা।

নিয়োগকর্তার নিপীড়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার সারা শরীর তার জন্য মরে গেছে। বর্তমানে ফিলিপাইনের এই নাগরিকের বয়স ৩৭ বছর। পরিচয় প্রকাশে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এই নারী। তিনি বলেন, তিনি (নিয়োগকর্তা) আমার জীবনের এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়।

মার্তা যে ধরনের নিপীড়নের বর্ণনা দিয়ে হংকংয়ে গৃহকর্মীদের জন্য তা অস্বাভাবিক বা ব্যতিক্রমী কিছু নয়। চীনের বিশেষ প্রশাসনিক এই অঞ্চলের ৩ লাখ ৯০ হাজারের বেশি গৃহকর্মীর বেশিরভাগেরই গল্প মার্তার মতো নির্মম। এই গৃহকর্মীদের সিংহভাগই ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া থেকে এসেছেন।

শহরটির মোট শ্রম শক্তির প্রায় ১০ শতাংশ নারীরা হলেও পুরুষের সংখ্যা মাত্র ১ শতাংশ। আর এই শ্রমিকরা হংকংয়ের অর্থনীতি এবং দৈনিন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তারপরও শহরটির সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী তারাই।

গত বছর হংকংয়ে কর্মরত ৫ হাজার ২৩ জন বিদেশি প্রবাসী গৃহকর্মীর ওপর এক জরিপ পরিচালনা করে শ্রমিক অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংস্থা। মিশন ফর মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স নামের ওই সংস্থার জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ১৫ শতাংশই বলেছেন, চাকরিরত অবস্থায় তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। এছাড়া ২ শতাংশ গৃহকর্মী বলেছেন, তারা যৌন নিপীড়ন অথবা হয়রানির শিকার হয়েছেন।

নিম্নমানের কর্মক্ষেত্র এবং জীবন-যাপনের দূরাবস্থার মতো সমস্যাগুলো নিয়ে অহরহই অভিযোগ পাওয়া যায়। হংকংয়ে প্রথমবার চাকরি ছেড়ে দেয়ার পর দীর্ঘদিন মার্তাকে গৃহহীন এবং বেকার জীবন কাটাতে হয়। নতুন একটি কাজ খুঁজে পাওয়ার আগে পর্যন্ত একটি গির্জার মেঝেতে তোষকে ঘুমাতেন তিনি।

হংকংয়ে নিয়োগকর্তার বাড়িতে গৃহকর্মীদের বাধ্যতামূলক বসবাসের নিয়মে পরিবর্তনের দাবিতে এই বিষয়টিকে আদালতে নিয়ে গেছেন মার্তা।

নিয়ম বদলের লড়াই

২০১৬ সালে মার্তা হংকংয়ের একটি আদালতে নিয়োগকর্তার বাড়িতে গৃহকর্মীদের বাধ্যতামূলক বসবাসের নিয়মটি পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে আবেদন করেন। তিনি বলেন, এই নিয়মটি বৈষম্যমূলক এবং কর্মীদের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

তবে নিয়োগকর্তার সঙ্গে ভাল কাজের সম্পর্ক রয়েছে এমন অনেক গৃহকর্মী জীবনযাপনের ব্যয়-সাশ্রয়ের জন্য এটির প্রশংসা করেন। তাদের মতে, নিয়োগকর্তার বাড়িতে বসবাসের ব্যবস্থা থাকলে দেশে পরিবারের কাছে বেশি অর্থ পাঠাতে পারেন তারা।

অন্যদিকে, যেসব নিয়োগকর্তা গৃহকর্মীকে নিজ বাসায় রাখতে চান না তাদের কেউ কেউ অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করেন। সেই অর্থে গৃহকর্মীরা শহরের অবৈধ বোর্ডিংয়ে ভাড়ায় থাকেন। একই কক্ষে গাদাগাদি করে থাকেন অনেকে। বোর্ডিংয়ে থাকা গৃহকর্মীরা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা, সময় এবং কাজের ব্যাপারে নিয়ন্ত্রিত হলেও অনেক সময় পুলিশি হয়রানির মুখোমুখি হন। পুলিশ এসব অবৈধ বোর্ডিং হাউসে অভিযান চালিয়ে কাগজপত্রবিহীন কর্মীদের আটক করে।

মার্তা বলেন, আমি ব্যক্তি স্বাধীনতা চাই। নিজের ইচ্ছা মতো চলার স্বাধীনতা চাই। নিয়োগকর্তা এবং কর্মী- উভয়ের জন্য স্বাধীনতা চাওয়ার চেষ্টা করবো না কেন?

প্রথমবার আদালতে হোঁচট খান মার্তা। ২০১৮ সালে হংকংয়ের একটি আদালত তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে দেন। আদালত জানান, অসদাচরণের বিষয়টি আসলে খারাপ নিয়োগকর্তার সমস্যা। এটি একই বাড়িতে বসবাসের কারণে ঘটছে বিষয়টি তেমন নয়।

সূত্র: সিএনএন।

এসআইএস/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]