স্বাধীন বালুচ মাতৃভূমির স্বপ্নের জন্য লড়ছে পাকিস্তানের যে তরুণরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২৬ এএম, ০৩ আগস্ট ২০২০

বালুচিস্তানে ২০ হাজারের বেশি মানুষ উধাও হয়ে গেছে, যাদের বেশিরভাগই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মী। সামরিক বাহিনীই এর নেপথ্যে কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বালুচ মধ্যবিত্ত শ্রেণিই সামরিক বাহিনীর টার্গেট, উদ্দেশ্য বালুচ জাতীয়তাবাদকে নিশ্চিহ্ণ করা।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এম ইলিয়াস খান এক প্রতিবেদনে বলেছেন, সানা বালুচ নিখোঁজ হওয়ার পর পেরিয়ে গেছে প্রায় তিন মাস। গত বসন্তে আরও অনেক ছাত্রের মতো তিনিও ফিরে গিয়েছিলেন বাড়িতে। আরও অনেকের মতো তার সামনেও ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।

সানা বালুচ পড়তেন ইসলামাবাদে পাকিস্তানের সেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। স্নাতকোত্তর শ্রেণির মেধাবী ছাত্র সানার জন্ম বালুচিস্তান প্রদেশের ছোট্ট এক শহর খারানে। তাদের শহরটি ইসলামাবাদ থেকে শত শত মাইল দূরে দক্ষিণ-পশ্চিম বালুচিস্তানে। সেখানে জনবসতি খুবই কম। গত ১১ মে এই খারান শহরের উপকণ্ঠ থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলেন সানা।

সানার ঘটনাটি অভিনব কিছু নয়। বালুচিস্তানে এই ঘটনা ঘটেছে আরও বহু মানুষের ভাগ্যে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ পাকিস্তানের এই প্রদেশে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ। বালুচিস্তানে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে যে আন্দোলন চলছে সেটি দমনে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নৃশংস পথ বেছে নিয়েছে বলে অভিযোগ আছে। তবে সামরিক বাহিনী এ অভিযোগ অস্বীকার করে।

বালুচিস্তানে যেসব সেনানিবাস আছে, সেগুলোর ভেতরে নাকি অনেক বন্দীশালা আর নির্যাতন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। পাকিস্তানের হিউম্যান রাইটস কমিশনের ভাষায়, এসব জায়গা থেকে মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়, সেখানে মানুষের ওপর নির্যাতন চালানো হয়, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এসব কিছুই ঘটে আইনের আওতার বাইরে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজারো মানুষ এভাবে নিখোঁজ হয়ে গেছেন।

সানা বালুচের ঘটনাটি জানেন এরকম কয়েকটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাকে খারান শহরের এরকম একটি জায়গাতেই আটকে রাখা হয়েছে। সানার পরিবার জানে না, কিংবা বলতে চায় না, তিনি কোথায় আছেন। সানা কোথায় আছে সেই তথ্য জানার জন্য তারা আদালতেও যায়নি। এর মানে এই নয় যে তারা সানাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়।

একটি সূত্র বলছে, বালুচিস্তানে থাকলে আপনি এ কাজ করবেন না। আপনি নীরবে অপেক্ষা করবেন, ভালো কিছু আশা করবেন। যেমনটা করেছিলেন শাহদাদ মুমতাজের বাবা-মা।

শাহদাদ মুমতাজ বালুচিস্তানেরই আরেকজন ছাত্র। ২০১৫ সালের শুরুর দিকে তিনি নিখোঁজ হয়ে যান। তার পরিবার একেবারে চুপ করে ছিলেন। তাদের ছেলে ফিরে আসে কয়েক মাস পর। তবে শেষ পর্যন্ত তার বেলায় কী ঘটেছিল সেটা হয়তো অন্যদের জন্য একটা ভালো শিক্ষা হতে পারে।

এ বছরের ১ মে শাহদাদ মুমতাজ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক গোলাগুলিতে নিহত হন। এটি ঘটেছিল সানা বালুচ নিহত হওয়ার দশদিন আগে। বালুচিস্তানের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী, বালুচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) দাবি করেছিল, শাহদাদ মুমতাজ ছিল তাদের দলের লোক। শাহদাদকে যারা চিনতেন, তারা একথা শুনে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন।

বালুচ লিবারেশন আর্মি তাদের বিবৃতিতে বলেছিল, শাহদাদ মুমতাজ মারা গেছেন ‌পাকিস্তান আর্মি আর তাদের দোসর ডেথ স্কোয়াডের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে।

শাহদাদ মুমতাজ কি আগাগোড়াই সশস্ত্র বিদ্রোহী হওয়ার প্রস্তুতিই নিচ্ছিলেন, যা তিনি গোপন করেছিলেন তার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের কাছ থেকে? আর যদি তিনি সশস্ত্র বিদ্রোহীই হয়ে থাকেন, তাহলে তাকে যারা বন্দী করেছিল, কেন তারা তাকে ছেড়ে দিয়েছিল? সানা বালুচও কি সেই পথেই চলেছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে বালুচিস্তানের সঙ্গে ইসলামাবাদের বৈরি সম্পর্কের ইতিহাসে এবং এই ইতিহাস প্রদেশটির শিক্ষিত তরুণদের মানসে যে প্রতিঘাত তৈরি করছে তার ভেতরে। বালুচিস্তানের রয়েছে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ। পাকিস্তানের মোট আয়তনের ৪৪ ভাগই বালুচিস্তান।

অথচ বালুচরা হচ্ছে দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। বালুচিস্তানের খনিজ সম্পদের আর্থিক মূল্য হিসেব করলে তা এক লাখ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু কেবল এই বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না বালুচিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বন্দ্ব।

বালুচিস্তান ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ আফগানিস্তানের খুবই কাছে। ওই অঞ্চলে কয়েক দশক ধরে সংঘাত চলছে। এই সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বালুচিস্তানেও। শাহদাদ মুমতাজ এবং সানা বালুচের মতো তরুণরা বেড়ে উঠেছেন এরকম এক জগতে।

শাহদাদ মুমতাজ পড়াশোনা করেছেন বালুচিস্তানের দক্ষিণে তার নিজের শহর তুরবাতের এক নামী গ্রামার স্কুলে। তিনি ছিলেন উচ্চশিক্ষিত এবং সামাজিক কাজে বেশ সক্রিয়। কাজ করতেন এইচআরসিপি নামে একটি সংগঠনে। এটি নিখোঁজ ব্যক্তিদের হদিস পাওয়ার জন্য কাজ করতো, যা কিনা বালুচিস্তানের এক বড় সমস্যা।

কিন্তু ২১০৫ সালে শাহদাদ মুমতাজ নিজেই নিখোঁজ তালিকার অংশ হয়ে গেলেন। তবে স্থানীয় এক পর্যবেক্ষকের মতে, শাহদাদ ছিলেন সেই সৌভাগ্যবানদের একজন, যিনি তার আটককারীদের বোঝাতে পেরেছিলেন, তিনি ভালো হয়ে গেছেন এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ এক বড় ভুল ছিল।

২০১৬ সালে শাহদাদ মুমতাজ যখন ছাড়া পান, তখন তিনি ইসলামাবাদের কায়েদ ই আজম বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বালুচ বন্ধুর কাছে তিনি বলেছিলেন, বন্দী অবস্থায় তার জীবনে কী ঘটেছিল। শাহদাদ মুমতাজের বন্ধু এই সাবেক ছাত্র বলেন, ও আমাকে বলেছিল, রাজনীতিতে জড়ানো যে কত খারাপ কাজ, বন্দী অবস্থায় তাকে মূলত সেই বার্তাই দেয়া হচ্ছিল। নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে তিনি তার নাম গোপন রাখার অনুরোধ করেন।

‘ওরা বলতো, এগুলো বাদ দাও। পড়াশোনায় মন দাও, চাকুরি খোঁজ। কেন খামাকা শ্লোগান দিয়ে সময় নষ্ট করছো, যা থেকে কিনা পাকিস্তানের শত্রুরাই কেবল ফায়দা তুলবে? শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে আর মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে এই কথাগুলো তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হতো।’

‘তাদের লাথি মারতো, লাঠি দিয়ে পেটাতো, মেরে ফেলার কিংবা সন্মানহানির হুমকি দিত, দিনের পর দিন ঘুমাতে দিত না। তাদের কেবল ডাল খেতে দেয়া হতো।’

শাহদাদ ডাল খেতে মোটেই পছন্দ করতো না, বলছেন এই বন্ধু। কারণ ডাল খেতে গেলেই নাকি তার বন্দী জীবনের কথা মনে পড়তো। তবে শাহদাদ মুমতাজের মনে জাতীয়তাবাদের যে শিখা প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, সেটি আসলে কখনোই নিভে যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ধরণের কাজ-কর্মে সক্রিয়ভাবে তিনি অংশ নিতেন, তা থেকে সেটা স্পষ্ট।

তিনি যোগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট কাউন্সিলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মীয় উগ্রপন্থী ছাত্রগোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাতে তিনি আহত হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে এক ছাত্র বিক্ষোভে অংশ নেয়ায় অন্য কিছু ছাত্রের সঙ্গে তাকেও গ্রেফতার হতে হয়েছিল।

শাহদাদ বালুচদের অধিকার নিয়ে সারাক্ষণ কথা বলতেন, প্রচারণা চালাতেন, বলছেন তার বন্ধু। তার সঙ্গে থাকতো ইতালিয়ান মার্কসবাদী তাত্ত্বিক অ্যান্থনি গ্রামসির বই প্রিজন নোটবুকস। তার কাছে এটি যেন ছিল বাইবেল।

‘শিক্ষকদের এবং সহপাঠীদের সঙ্গে অন্তহীন বিতর্কে শাহদাদ এই বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করতেন, কিভাবে একটি আধিপত্যবাদী সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়ে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি বালুচদের নিজস্ব সংস্কৃতি এবং স্বাতন্ত্র্যকে ধ্বংস করছে।’

বালুচিস্তানে বহু মানুষের মধ্যেও রয়েছে এই একই ক্ষোভ। এর শেকড় প্রোথিত ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে। ব্রিটেন যখন ভারত ভাগ করলো, তখন উপমহাদেশের রাজা শাসিত রাজ্যগুলিকে বলা হয়েছিল, তারা পাকিস্তানে যাবে না ভারতে যাবে, নাকি আলাদা থাকবে, সেটা তারা নিজেরাই ঠিক করুক।

তখন কালাত নামের প্রদেশটি, যার বেশিরভাগটাই আজকের বালুচিস্তান, স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়। কিন্তু নয় মাস পর পাকিস্তান এটি জোর করে দখল করে নিজের অঙ্গীভূত করে। কিন্তু এই ঘটনা থেকেই জন্ম নয় বালুচদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন। এটি ক্রমশ ঝুঁকতে থাকে বামধারার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দিকে। কোন কোন ক্ষেত্রে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে।

বালুচিস্তানে সংঘাতের শুরু সেই থেকে। বালুচরা চায় অধিকতর স্বায়ত্বশাসন। তাদের যে বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, তার অধিকতর হিস্যা। বিশেষ করে তাদের গ্যাস সম্পদের।

তবে বালুচিস্তানের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং তীব্র সংঘাতের সূচনা হয়েছে ২০০০ সালের শুরু থেকে। সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মুশাররফ সেখানে অনেকের ভাষায় এক কারচুপির নির্বাচন করেন। এ থেকে বিরাট রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। ২০০৫ সালে রাজনৈতিক বিক্ষোভ সহিংস হয়ে উঠে। বালুচিস্তানের সুই এলাকায় এক নারী চিকিৎসক সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত হন। কিন্তু এজন্য কাউকে সাজা দেয়া হয়নি। এর জের ধরে যে ব্যাপক বিক্ষোভ-বিদ্রোহ শুরু হয়, তা দমনে পারভেজ মুশাররফ সেখানে হাজার হাজার সৈন্য পাঠান।

এরপর বিগত বছরগুলোতে সেখানে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি কেবলই বেড়েছে। তৈরি করা হয়েছে আরও অনেক সেনানিবাস। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো অভিযোগ করছে, সেখানে এমনকি বেসরকারি গোয়েন্দা নেটওয়ার্কও তৈরি করা হয়েছে; যাতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যারা জড়িত বা জড়িত বলে সন্দেহ করা হয়, তাদের ধরা যায়। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ- সেনাবাহিনীর হাতে এভাবে ধরা পড়া মানুষ একেবারেই হাওয়া হয়ে গেছেন। তাদের কখনও আদালতের সামনে হাজির করা হয়নি।

সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ, বালুচিস্তানে এবং সীমান্তের ওপারে আফগানিস্তানে যেসব অঞ্চলে ধর্মনিরপেক্ষতার ঐতিহ্য ছিল, সেখানে তারা হীন স্বার্থে ইসলামপন্থী জঙ্গিদের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে।

সেনাবাহিনী স্থানীয় অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে বালুচ জাতীয়তাবাদী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আন্দোলন দমনে ব্যবহার করছে এমন অভিযোগও ব্যাপক। এই অপরাধী গোষ্ঠীগুলো এবং বন্দীশিবিরে গিয়ে ভুল শোধরানো সাবেক বিদ্রোহীদের দিয়ে তৈরি করছে ডেথ স্কোয়াড। এই সশস্ত্র গ্রুপগুলো অনুচর হিসেবে কাজ করে, তারা জাতীয়তাবাদী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ করে সামরিক বাহিনীকে দেয়। এরপর সামরিক বাহিনী তাদের নির্মূল করে দেয়।

ইউরোপভিত্তিক একটি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল অব বালুচিস্তান (এইচআরসিবি) এক হিসেবে জানিয়েছে, অন্তত ২০ হাজার রাজনৈতিক কর্মী নিখোঁজ হয়ে গেছে ২০০০ সালের পর থেকে। তাদের মধ্যে ৭ হাজার মারা গেছে।

বালুচিস্তানে এ ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতনের কথা পাকিস্তান সরকার বরাবর অস্বীকার করে। বিবিসি এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করেছিল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র এবং পাকিস্তানের মানবাধিকার বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে। কিন্তু কোন সাড়া পাওয়া যায়নি। অতীতে এ ধরনের নির্যাতন, নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার ঘটনা, নির্যাতন কেন্দ্র বা বিচার বহির্ভূত হত্যার অভিযোগের ব্যাপারে কোন মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে সামরিক বাহিনী।

অন্যদিকে, বালুচিস্তানে ক্ষমতায় আছে যে বেসামরিক সরকার, তারা অতীতে শত শত রাজনৈতিক কর্মীকে এবং সন্দেহভাজন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হত্যার জন্য বিদ্রোহীগোষ্ঠীগুলোর নিজেদের অর্ন্তদ্বন্দ্বকে দায়ী করে

বিশ্লেষকরা বলছেন, বালুচিস্তানে অব্যাহতভাবে এই নিপীড়ন-নির্যাতনের নীতি এবং ক্ষমতাধর সামরিক বাহিনীর রাশ টেনে ধরতে পার্লামেন্ট এবং বিচার বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যর্থতা সেখানকার জাতীয়বাদী গোষ্ঠীগুলোকে আরও চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রবিষয়ক একটি থিংকট্যাংক কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যশনাল পিস ২০১৩ সালে বালুচিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। এটিতে তারা বলেছিল, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর প্রধান টার্গেট এখন বালুচিস্তানের মধ্যবিত্ত। মনে হচ্ছে, এর উদ্দেশ্য বালুচ জাতীয়তাবাদের সব নিশানা নির্মূল করা এবং এটির যাতে পুনর্জাগরণ না ঘটে সেই সম্ভাবনাও বিনাশ করা‌।

শাহদাদ মুমতাজ বালুচিস্তানের এই শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীরই একজন ছিলেন। কিন্তু যেসব ছাত্ররা তাকে চিনতেন, তারা বলছেন, কখনোই তাদের একথা মনে হয়নি যে শাহদাদ বন্দুক হাতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাবেন।

শাহদাদ বরং ২০১৮ সালে তার মাস্টার্স শেষ করে এমফিল কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। তার আরও ইচ্ছে ছিল এক বন্ধুর সঙ্গে লাহোর যাবেন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিতে। পাকিস্তানে প্রশাসনিক উচ্চপদে যেতে হলে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।

তবে বন্ধুরা এ কথাও বলছেন, কোন কোন সময় তাদের এমনটাও মনে হয়েছে শাহদাদ যেন ভেঙে পড়ছেন। যখন তার পরিচিত কোন রাজনৈতিক কর্মী নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছেন বা তার বিকৃত মৃতদেহ পাওয়া যাচ্ছে, যখন কোন সাংবাদিক বা শিক্ষককে হামলা চালিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, তখন ও বলতো, রাষ্ট্র কেবল বন্দুকের ভাষা বোঝে।

বন্ধুরা শাহদাদকে শেষ দেখেছিল গত জানুয়ারির শেষে। তখন তিনি লাহোর যাচ্ছিলেন তার সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে। এরপর আর শাহদাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়নি। এরপর মে মাসের এক তারিখে বালুচিস্তানের শরপারোদ এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে তিনি মারা যান।

সানা বালুচের কাহিনীও শাহদাদ মুমতাজের কাহিনীর চাইতে আলাদা কিছু নয়। আরও শত শত বালুচ রাজনৈতিক কর্মীর কাহিনীও এ রকমই। সানা বালুচও এক বলিষ্ঠ জাতীয়তাবাদী। বিএনপি-এম দলের এক সক্রিয় সদস্য। এক কৃতি ছাত্র, বালুচ সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। ইসলামাবাদের আল্লামা ইকবাল ওপেন ইউনিভার্সিটিতে এমফিল কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি।

তার একজন শিক্ষক বিবিসিকে জানিয়েছেন, তিনি তার এমফিল থিসিস প্রায় শেষ করে এনেছিলেন। মে মাসের শেষে তার এটি জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে যখন লকডাউন জারি করা হলো, তখন তাকে তার বাড়ি ফিরে যেতে হয়।

বালুচ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (বিএনপি-এম) একটি সূত্র বলছে, খারানে ফিরে সানা বালুচ তার রাজনৈতিক কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি স্থানীয় লোকজনকে জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার জন্য কাগজপত্র তৈরি করে দিতে সাহায্য করছিলেন। পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে লোকজনের নানা সমস্যার সমাধানে সাহায্য করছিলেন।

কিন্তু তার ভাগ্য কী ঘটবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

কোন প্রত্যন্ত এলাকায় খাদের মধ্যে কি তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যাবে? নাকি তিনি অন্য জাতীয়তাবাদীদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তিতে রাজী হয়ে যাবেন? যা এর আগে অনেকেই করেছেন। তিনি শুধরে ভালো হয়ে ঘরে ফিরবেন, চুপচাপ বসে থাকবেন এবং এরপর একদিন শাহদাদ মুমতাজের মতো অস্ত্র হাতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যাবেন?

এর উত্তর একমাত্র সময়ই দিতে পারবে। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত সানা বালুচের পরিবারকে অপেক্ষাতেই থাকতে হবে।

এসআইএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]