স্বায়ত্তশাসন হারিয়ে এক বছরে কতটা বদলেছে কাশ্মীর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:০৪ পিএম, ০৪ আগস্ট ২০২০

ঠিক এক বছর আগে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট বাতিল করা হয়েছিল ভারতশাসিত কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা। পূর্বতন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য পুরোপুরি মুছে ফেলে একে দিখণ্ডিত করে লাদাখ এবং জম্মু-কাশ্মীর নামে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করা হয়েছিল।

এর পর দীর্ঘদিন লকডাউন করে সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যকলাপ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ ছিল শিক্ষা ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন—সবকিছুই। বিশেষ সাংবিধানিক রক্ষাকবচ সরিয়ে নেওয়ার সময়ে কাশ্মীরের যেসব উন্নয়নের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল, তা কতটা কার্যকর হলো? এক বছরে কি কোন পরিবর্তন হয়েছে কাশ্মীরের?

প্রশাসনের একটি বৈঠকের ছবি

কিছুদিন আগে জম্মু-কাশ্মীর প্রশাসনের প্রধান—কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলটির লেফটেন্যান্ট গর্ভনর জি সি মুর্মু একটি বৈঠক করেছিলেন প্রশাসনের শীর্ষ আমলাদের নিয়ে। সেটির ছবি প্রকাশিত হতেই কাশ্মীরের মানুষদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়।

অনেকেরই চোখ এড়ায় নি যে বৈঠকে হাজির ১৯ জনের মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন কাশ্মীরি মুসলমান। সামাজিক মাধ্যমে চর্চা শুরু হয়, কাশ্মীরের ৯৭ শতাংশ মানুষ যেখানে মুসলিম, সেখানকার প্রশাসনের শীর্ষে কেন মাত্র একজন কাশ্মীরি মুসলিম?

বিবিসির রিয়াজ মাসরুর বলেন, ‘প্রশাসন যদি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতো এক বছরে, তাহলে ৪-৫ আগস্ট বিক্ষোভের ভয়ে কারফিউ জারি করতে হত না। বিজেপি তো বলেছিল ৫ থেকে ১৫ আগস্ট অবধি তারা ধুমধাম করে উদযাপন করবে দিনটা। কিন্তু প্রশাসনই আজ আর আগামীকাল কারফিউ জারি করেছে।’

jagonews24কাশ্মীরে সর্বত্র চোখে পড়বে সেনা উপস্থিতি

তিনি বলেন, ‘প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তেই তো বোঝা যাচ্ছে যে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে নি সরকার। সেটা যদি হতো, তাহলে তো আজ রাস্তাঘাট শুনশান থাকত না। বিজেপির সদর দফতরে ধুমধাম হত। মানুষ যে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নেয় নি, এটা প্রশাসনও বুঝেছে।

বহু বছর পিছিয়ে গেছে অবরুদ্ধ কাশ্মীর

কাশ্মীরের সাংবিধানিক রক্ষাকবচ তুলে নেওয়ার পর থেকে দীর্ঘদিন টেলিফোন, মোবাইল, ইন্টারনেট যেমন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তেমনই বন্ধ থেকেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য।

কাশ্মীরিদের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল যে পর্যটন, তাও বন্ধ। কাশ্মীরের মানুষ লকডাউন প্রত্যক্ষ করেছেন দেশজুড়ে কোভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য জারি লকডাউনের অনেক আগে থেকেই। গত বছরের ৫ অগাস্ট থেকেই তারা তো অবরুদ্ধ।

মার্চে করোনা নিয়ন্ত্রণের লকডাউন শুরুর ঠিক আগেই পুলওয়ামায় গ্রামের বাড়িতে পৌঁছিয়েছিলেন কলকাতার একটি কলেজে পড়াশোনা করেন এমন এক কাশ্মীরি ছাত্র। নিজের নাম প্রকাশ করতে চাইছিলেন না তিনি।

অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন ওই ছবিটি দেখে, যে ৩৭০ ধারা বিলোপের পর কি তাহলে কাশ্মীরে কাশ্মীরিরাই ব্রাত্য হয়ে গেলেন! তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম একবছর পরে কাশ্মীরে কী পরিবর্তন দেখছেন তিনি?

ওই ছাত্রটির কথায়, ভালোর দিকে কোনও পরিবর্তন তার চোখেই পড়ছে না। ব্যবসা-বাণিজ্য তো ভীষণভাবে মার খেয়েছে একবছরে কিন্তু সবথেকে ক্ষতি বোধহয় হয়েছে শিক্ষার্থীদের।

ছাত্রটি বলেন, ‘গত এক বছরে খুব বেশি হলে ৭ দিন ঠিক মতো স্কুল কলেজে ক্লাস হয়েছে। তারপর তো আবার করোনা মোকাবিলার লকডাউন শুরু হয়ে গেলো। এখনও ৩জি আর ৪জি ইন্টারনেট বন্ধ। শুধু ২জি চলছে। শিক্ষার্থীরা তাই অনলাইন ক্লাসও ঠিক মতো করতে পারছে না।’

‘সবার চোখেমুখেই একটা উদ্বেগের ছাপ। কাল কী হবে, কেউ জানে না। যে নতুন কাশ্মীরের কথা সরকার বলেছিল, তার তো দেখা পাওয়াই যাচ্ছে না, উল্টো এই একটা বছরের মধ্যে কাশ্মীরকে বহু বছর পিছিয়ে দেওয়া হলো। ’— বলছিলেন কলকাতায় পড়াশোনা করা ওই কাশ্মীরি শিক্ষার্থী।

Kashmir

ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, রাজনীতি সবই বন্ধ কাশ্মীরে

ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেমন করোনার লকডাউনের জন্য এখন বন্ধ, কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকান্ড বন্ধ এক বছর ধরেই। ওমর আবদুল্লাহসহ কয়েকজন নেতাকে মুক্তি দেওয়া হলেও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিসহ বহু নেতা-নেত্রী এখনও গৃহবন্দী।

কাশ্মীর টাইমস পত্রিকার সম্পাদিকা অনুরাধা ভাসিনে বলছিলেন, যেভাবে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তা গণতন্ত্রের ভাবনারই বিরোধী। তার কথায়, যেভাবে গত এক বছর ধরে নানা নীতি নেওয়া হয়েছে, তাতে কোনও ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আর জায়গা নেই।

অনুরাধা ভাসিন বলেন, ‘রাজনীতি তো আর শুধুই ভোটের প্রচার নয়। কিন্তু যেভাবে নির্দিষ্ট রেখা টেনে দিয়ে বলে দেওয়া হচ্ছে যে এই বিষয়ে কথা বলা যাবে না, ওই বিষয়ে নিয়ে কথা বলা যাবে—এটা গণতন্ত্রের মূল ভাবনাটাকেই তো অস্বীকার করা হচ্ছে। যেটুকু রাজনৈতিক কথাবার্তা হচ্ছে, তা সাধারণ মানুষের মনের কথা নয়।’

কাশ্মীরে এক বছরে কী কী পরিবর্তন হয়েছে, কীভাবে বদলেছে সেখানকার মানুষের জীবন এ প্রসঙ্গে বিবিসির রিয়াজ মাসরুর বলেন, ‘পরিবর্তন তো হয় তখনই, যখন জীবন চলতে থাকে, কাজকর্ম হতে থাকে। কিন্তু কাশ্মীরে তো জীবন হঠাৎ করেই গত বছরের ৫ আগস্ট সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেছে। যেন সময় থেমে গেছে সেদিনই।’

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এসএ

 

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]