কাশ্মীরে ভারতপন্থী রাজনীতিবিদদের সঙ্গে প্রতারণা করেছে নয়াদিল্লি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:১৫ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

সকিনা ইতো একসময় বিশ্বাস করতেন, ভারতের সঙ্গে থাকাই কাশ্মীরিদের জন্য সবদিক দিয়ে ভালো। কিন্তু গত বছরের আগস্টে নয়াদিল্লি জম্মু-কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন বাতিলের পর সেই বিশ্বাস উঠে গেছে তার।

৪৮ বছর বয়সী ভারতপন্থী এ রাজনীতিবিদ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, আমরা জানি না মানুষের কাছে আবার কীভাবে যাব। আমাদের নিজেদের কাছেই কোনও জবাব নেই, তাহলে তাদের কী বলব।

ইতোর বাবাও ছিলেন ভারতপন্থী রাজনীতিবিদ। ১৯৯৬ সালে বিদ্রোহীদের হাতে প্রাণ হারান তিনি। এরপরই রাজনীতিতে যোগ দেন সকিনা ইতো। হয়েছিলেন আঞ্চলিক সরকারের অর্থমন্ত্রীও। কিন্তু নয়া দিল্লির ভক্ত হওয়ায় বেশ কয়েকবার স্বাধীনতাকামীদের হামলার শিকার হতে হয়েছে তাকে। গত এপ্রিলেও তার বাড়িতে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছিল।

jagonews24

নয়া দিল্লির প্রতি আনুগত্যের ফল
ইতোর দল ন্যাশনাল কনফারেন্স উপত্যকা অঞ্চলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। কাশ্মীরের স্বাধীনতার বদলে তারা বরাবরই নয়া দিল্লির প্রতি অনুগত ছিল। এরপরও গত বছর ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সময় দলটির প্রধান শক্তি আব্দুল্লাহ পরিবারকে জেলে যেতে হয়।

সেই থেকে ন্যাশনাল কনফারেন্সসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলোর গায়ে যে দাগ লেগেছে, তাতে কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে ভারতপন্থী অনুসারীদের।

ইতো বলেন, আমরা সবসময় মানুষকে অনুপ্রাণিত করতাম ও বলতাম, ভারতই আমাদের দেশ আর এটাই সবার জন্য ভালো। কিন্তু তরুণরা এখন আর সেই কথা শুনতে রাজি নয়।

নয়া দিল্লি মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় ভারতপন্থী রাজনীতিবিদরা এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ হয়ে গেছেন, বিদ্রোহীদের ভয়ে জনসম্মুখেও খুব একটা আসছেন না।

সাবেক অর্থমন্ত্রী ইতো বলেন, আগে বিদ্রোহী যোদ্ধারা আক্রমণ করত, তবে আমরা সরকারের সাহায্য পেতাম। এখন এ দুইয়ের মধ্যে আটকে গেছি।

কাশ্মীর অঞ্চলের সবশেষ দুই মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি) থেকে। দলটির শীর্ষনেতা ও সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি এখনও বন্দি।

jagonews24

গত বছরের আগস্টে পিডিপির শত শত নেতাদের সঙ্গে জেলে যেতে হয়েছিল তরুণ নেতা ওয়াহিদ পারাকে। তিনি বলেন, কাশ্মীর ৫ আগস্টের আগেও সমস্যা ছিল, এখনও আছে। আমাদের দুঃখ ও আফসোস যে, জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রতি করেছিলাম, সেগুলো ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।

৩০ বছর বয়সী এ নেতা বলেন, আমরা কাশ্মীরি যুবকদের সাংবিধানিক অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, (ভারতীয়) সংবিধানের মধ্যে সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আজ এগুলো শুধু জনগণ বা বিদ্রোহীদের মাধ্যমেই নয়, সরকারের দিক থেকেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

তিনি বলেন, আজ আমরা নিজ বাড়িতেই ঘরের বাইরে যেতে পারি না। অথচ আমরাই সেই লোক যারা গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলাম।

কাশ্মীরি জনগণ কাঁদছে আগে থেকেই
দানিশ আহমেদ নামে কাশ্মীরের এক তরুণ বলেন, ৫ আগস্টের পর যা হয়েছে তাতে কাঁদছেন শুধু রাজনীতিবিদরা। কিন্তু সাধারণ কাশ্মীরিদের অবস্থা সবসময়ই একই। তারা সবসময়ই নিপীড়িত।

২৫ বছর বয়সী এ শিক্ষার্থী বলেন, এরা সেই রাজনীতিবিদ যারা এত বছর ধরে আমাদের সঙ্গে অবিচার করেছে। তাদের ওপর আমার কোনওকালেই আশা ছিল না।

jagonews24

অনেকটা একই কথা বলছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি-ও। কাশ্মীরের আঞ্চলিক সরকার নির্মূল করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করার পক্ষে দলটির মত, এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার কাশ্মীরি রাজনীতিবিদদের ‘দোকান বন্ধ’ করে দিয়েছে মাত্র।

জম্মু-কাশ্মীরে বিজেপির মুখপাত্র অশোক কৌল বলেন, জনগণের জন্য তারা কী করেছেন? তারা শুধু নিজেদের ওপরে তোলার জন্যই কাজ করেছেন।

প্রতারণা করেছে নয়া দিল্লি?
গত তিন দশক ধরে ভারতপন্থী রাজনীতিবিদরা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন। কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের উত্থানের প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা পাওয়ার শর্তে নয়া দিল্লির প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন তারা।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ ইউসুফ তারিগামি ১৯৯৬ সাল থেকে দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগাম আসনের সব কয়টি নির্বাচনেই জিতেছেন। তিনি বলেন, বিরোধপূর্ণ এ অঞ্চলে স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে ভারতপন্থী রাজনীতিবিদদের যে রেখাটি আলাদা করে রেখেছিল, সেটি মুছে দিয়েছে নয়া দিল্লি।

‘এখন আমরা সবাই একই রেখায়। কোনও বিভাজন নেই। এখন সবাই একই জেলে রয়েছি, সেটা সন্ত্রাসী হোক বা স্বাধীনতাকামী বা মূলধারার।’

ফল হতে পারে উল্টো
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাশ্মীর নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তে বিপরীত ফল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক রাধা কুমার বলেন, এই মুহূর্তে পরিস্থিতি অনেকটা বিবর্ণ। বৈধ রাজনৈতিক কার্যকলাপ না থাকলে গণতন্ত্র কাজ করে কীভাবে? বাস্তবে এর অর্থ গণতন্ত্র নয়। এটি খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।

তিনি বলেন, এটা খুবই বিপজ্জনক পদক্ষেপ। আমরা সেখানে আরও আগ্রাসন ও বিদ্রোহ দেখতে পারি। সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে সেগুলোর ফল বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেএএ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]