সুগার হাত ধরে জাপানে আসবে পরিবর্তন, থাকবে ধারাবাহিকতাও

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১:১৫ এএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০

রাজনৈতিক নেতাদের বিষয়ে তাদের ঐতিহাসিক রোল মডেলরাই অনেক কিছু বলে দেন। ইয়োশিহিদে সুগার রোল মডেল ১৬ শতকের শাসক টয়োটমি হিদেয়োশির ছোট ভাই ও তার ডান হাত টয়োটমি হিদেনাগা। সেসময় যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে জাপানকে একত্রিত করেছিলেন হিদেয়োশি, আর এ কাজে তাকে সহায়তা করেছিলেন হিদেনাগা। প্রায় আট বছর ধরে শিনজো আবের বিশ্বস্ত ইয়োশিহিদে সুগা সামলেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব। জাপানের হামাগুঁড়ি দিতে থাকা আমলাতন্ত্রে গতি আনায় অনেকটা হিদেনাগার মতোই পর্দার অন্তরালে থেকে কলকাঠি নেড়েছেন তিনি। এরপরও অনেকের কাছেই এ নেতা ছিলেন একেবারেই অচেনা।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে গত ২৮ আগস্ট শিনজো আবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব ছেড়ে দেয়ার পর থেকেই আলোচনায় উঠে আসে সুগার নাম। ১৪ সেপ্টেম্বর ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) দলীয় নির্বাচনে ৫৩৫ ভোটের মধ্যে ৩৭৭টি পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ অনেকটাই নিশ্চিত হয় তার। এর দু’দিন পরেই আনুষ্ঠানকিভাবে জাপানের ৯৯তম প্রধানমন্ত্রী হন ইয়োশিহিদে সুগা। ‘এবার আমার লক্ষ্য হিদেয়োশি’, জানিয়েছেন তিনি।

Japan-1.jpg

পূর্বসূরির দেখানো পথ অনুসরণ ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী। তার মন্ত্রিসভার অর্ধেক জুড়েই রয়েছে আবে প্রশাসনের ঝানু নেতৃত্ব। নতুনদের মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন শিনজো আবের ভাই কিশি নোবুও।

রাজনীতিতে আবে ও সুগার উত্থানের পথ ছিল একেবারেই ভিন্ন। শিনজো আবের জন্মই হয়েছে জাপানের শাসক পরিবারে। তার বাবা ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, দাদা-চাচার মতো পূর্বসূরীরা বসেছেন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারেও। বলা হয়, আবের জন্মই হয়েছিল জাপানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য। বিপরীতে, প্রত্যন্ত এলাকায় কৃষক বাবা ও স্কুলশিক্ষক মায়ের ঘরে জন্ম ইয়োশিহিদে সুগার। ১৯৫৫ সালের পর তিনিই এলডিপির প্রথম শীর্ষনেতা যার শরীরে কোনও শাসক গোষ্ঠীর রক্ত নেই।

কিছুটা বড় হয়ে জন্মস্থান আকিতা অঞ্চল ছেড়ে টোকিও পাড়ি জমিয়েছিলেন সুগা। সেখানে পৌঁছে কাজ নেন একটি কার্ডবোর্ড ফ্যাক্টরিতে। রাজনীতিতে পদার্পণ ঘটে ইয়োকোহামার এক নেতার সেক্রেটারি হওয়ার মাধ্যমে। এরপর ঘটনাচক্রে শহরটির কাউন্সিলর থেকে শুরু করে জাতীয় নেতৃত্বের চূড়ায় পৌঁছেছেন তিনি।

Japan-1.jpg

পারিবারিক পটভূমির ভিন্নতার কারণে পার্থক্য তৈরি হয়েছে দুই নেতার দর্শনেও। শিনজো আবের লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাপানের অবস্থান সুদৃঢ় করা। তিনি জাপানের অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণকে এ লক্ষ্য পূরণের উপায় হিসেবে দেখতেন। ইয়োশিহিদে সুগার কাছে অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের অর্থ অনেকটা অভ্যন্তরীণ। প্রধান মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে তিনি সবসময় কৃষি ও টেলিকম খাতে উন্নয়নের জন্য জোর দিয়েছেন, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পক্ষে কথা বলেছেন, অন্তর্মুখী পর্যটনকে উজ্জীবিত করতে কাজ করেছেন। আরও বেশি বিদেশি শ্রমিককে কাজের সুযোগ দেয়ারও পক্ষপাতী ছিলেন অভিজ্ঞ এ নেতা।

বছরের পর বছর ধরে চলা মন্দাভাব কাটিয়ে জাপানের অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়েছিলেন শিনজো আবে। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সেই শম্বুকগতি আবারও ফিরে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইয়োশিহিদে সুগা সম্প্রসারণমূলক আর্থিক নীতি এবং রাজস্ব উদ্দীপনাসহ আবের চালু করা ‘আবেনোমিকস’ এগিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে সংকটের মধ্যে থাকা জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে খুব বেশি সুযোগ নেই। একারণে কাঠামো পুনর্গঠনে ‘তৃতীয় তির’ আগের চেয়ে বেশি আবশ্যক হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

Japan-1.jpg

তবে এধরনের পরিবর্তন আনতে গেলে সেটি অবশ্যই বাধার মুখে পড়বে। এর সাফল্য নির্ভর করছে মূলত জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী তিনটি চ্যালেঞ্জ কতটা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারবেন তার ওপর। প্রথম চ্যালেঞ্জ বহির্বিশ্বের। ইয়োশিহিদে সুগা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিষয়ে খুব কমই আগ্রহ দেখিয়েছেন। দ্বিতীয়টি নিজ দলের অভ্যন্তরেই। কোনও শাসক গোষ্ঠীর অধীনে না থাকায় কাজের ক্ষেত্রে হয়তো কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য পেতে পারেন সুগা। তবে যদি হোঁটচ খান, সেটি তাকে দলের ভেতর দুর্বল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে আগামী বছরই যেহেতু নির্বাচন, সেক্ষেত্রে দলের ভেতর তার প্রতিপক্ষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তৃতীয়টি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনগণ। সুগার ভেতর ক্যারিশমার অভাব রয়েছে, মিডিয়ার সঙ্গেও তেমন সুসম্পর্ক নেই। অর্থাৎ, জনসংযোগের দিক থেকে বেশ পিছিয়ে রয়েছেন এ নেতা।

তবে কঠোর পরিশ্রম ও সংগ্রামের জীবন কাহিনী এবং প্যানকেকের প্রতি ভালোবাসার কথা বলে মানুষের কাছে নিজের নতুন একটি ইমেজ তৈরি করতে চাচ্ছেন ইয়োশিহিদে সুগা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজের প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই ঘোষণা করেছেন, কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে তিনি গ্রামাঞ্চলের উন্নয়নে কাজ করবেন। এছাড়া আগামী বছর নির্বাচন থাকায় শিগগিরই হয়তো ভোটারদের কাছাকাছি যাওয়ার আরেকটি সুযোগ আসছে তার সামনে।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

কেএএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]