নাগোরনো-কারাবাখ: পুরনো উত্তেজনায় নতুন লড়াই, নেপথ্যে কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯:৩০ পিএম, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

বিতর্কিত নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে প্রতিবেশী আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের লড়াইয়ে উভয়পক্ষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, রোববারের লড়াইয়ে তারা আজারবাইজানের চারটি হেলিকপ্টার, ১৫টি ড্রোন ও ১০টি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেছে।

আর্মেনিয়া এই লড়াইয়ের জেরে মার্শাল ল জারি করে, সীমান্তে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করেছে। অন্যদিকে, আজারবাইজান পুরো সীমান্তজুড়ে গোলাবর্ষণের জবাব দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে। উভয়পক্ষের বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটলেও কোনও পক্ষেও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করে কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি।

নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলের কর্তৃপক্ষ বলছে, আজারবাইজানের সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ে সামরিক বাহিনীর অন্তত ১৬ সদস্য নিহত ও আরও শতাধিক আহত হয়েছেন।

রোববারের লড়াইয়ে আর্মেনীয়দের নিয়ন্ত্রণে থাকা ছয়টি গ্রামের দখলে নেয়ার দাবি করেছে আজারবাইজান। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ফরাসী বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেছেন, আমরা ছয়টি গ্রামকে দখলমুক্ত করেছি। এরমধ্যে পাঁচটি ফিজুলি জেলার এবং অন্যটি জেব্রাইল জেলার।

নাগোরনো-কারাবাখ নিয়ে বিবাদের নেপথ্যে

ঘন-গহীন অরণ্যের পার্বত্য অঞ্চল নাগোরনো-কারাবাখ। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আজারবাইজান ভূখণ্ডের ভেতরে অবস্থিত এই অঞ্চল। বিতর্কিত এই অঞ্চল আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের অংশ হিসেবে স্বীকৃত।

কিন্তু জাতিগত আর্মেনীয়রা আজারি শাসন প্রত্যাখ্যান করে এই ভূখণ্ড নিজেদের বলে দাবি করে। আর্মেনিয়ার সহায়তায় নিজেদের সব ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করেন জাতিগত আর্মেনীয়রা। ১৯৯০ সালের যুদ্ধের পর সেখান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় আজারবাইজান।

war

তবে দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এই ভূখণ্ড ফিরে পেতে প্রয়োজনে সব পন্থা অবলম্বন করা হবে বলে তখন থেকেই জানিয়ে আসছে আজারি সরকার।

এই অঞ্চলের আর্মেনীয় খ্রিস্টান ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের দীর্ঘদিনের জাতিগত উত্তেজনা ১৯৮০ সালে নাগোরনো-কারাবাখে চরম আকার ধারণ করে। ২০১৬ সালে দুই দেশের মাঝে ব্যাপক লড়াই শুরু হয়। এতে উভয়পক্ষের কয়েক ডজন মানুষের প্রাণহানি ঘটে। কিন্তু এবারের উত্তেজনা চার বছর আগের লড়াইকে ছাড়িয়ে গেছে।

টানতে পারে আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকেও

নাগোরনো-কারাবাখের এই সংঘাত আঞ্চলিক পরাশক্তি রাশিয়া এবং তুরস্ককে টেনে আনতে পারে। আর্মেনিয়ার সঙ্গে মস্কোর প্রতিরক্ষা সমঝোতা রয়েছে; অন্যদিকে আজারবাইজানের জাতিগত তুর্কি জনগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন রয়েছে তুরস্কের। রোববারের সংঘাতের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আর্মেনিয়াকে সতর্ক করে দিয়েছেন।

বিতর্কিত অঞ্চলের এই সংঘাতে আর্মেনীয়দেরকে নিজ দেশের সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রতিক্রিয়ায় তুরস্কের প্রেসিডেন্টকে নাক গলানো থেকে বিরত রাখতে আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনইয়ান বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে, আজারবাইজান-আর্মেনিয়া সংঘাতে মধ্যস্থতা করতে রাজি আছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে।

১৯৮০'র দশকে নাগোরনা-কারাবাখ অঞ্চল সাবেক সোভিয়েতভূক্ত আজারবাইজানের অন্তর্ভূক্ত ছিল। সেই সময় এই অঞ্চল পরিচালনায় বেশিরভাগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো মস্কো। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চল সরাসরি আজারবাইন সরকারের শাসনে চলে যায়। যদিও জাতিগত আর্মেনীয়রা আজারবাইনের শাসন মেনে নেননি।

সাম্প্রদায়িক সংঘাত থেকে যুদ্ধ

সাম্প্রদায়িক সংঘাত থেকে উত্তেজনার পারদ চরমে পৌঁছালে ১৯৯১ সালে তা যুদ্ধে রূপ নেয়। আজারবাইজানের সৈন্যদের সঙ্গে আর্মেনিয়া সমর্থিত জাতিগত আর্মেনীয় বাহিনীর পুরোমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় হাজার হাজার মানুষ মারা যান এবং বাস্ত্যুচুত হন লাখ লাখ।

azeri-armenia

ওই বছরই নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চল স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়; যদিও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই স্বাধীনতা তেমনভাবে স্বীকৃতি পায়নি। এর ফলে জাতিগত আর্মেনীয় প্রশাসন সেখানে সংকটের কেন্দ্রে চলে আসে। অবরোধ আরোপ করে আজারবাইজান সরকার।

বিশ্ব মোড়লদের সমঝোতার ব্যর্থ চেষ্টা

১৯৯৪ সালে বিশ্ব নেতাদের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয় উভয় দেশ। নাগোরনো-কারাবাখের বেশিরভাগ এলাকা এবং এর আশপাশের বেশ কিছু আজারি জেলা জাতিগত আর্মেনীয়রা নিয়ন্ত্রণে নেয়। সেখানে একটি বাফার জোন প্রতিষ্ঠা করা হয়।

দখলকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করা হবে বলে দীর্ঘদিন ধরে হুশিয়ারি দিয়ে আসছে আজারবাইজান। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স এই আঞ্চলিক বিবাদের সমাধানে বহুবার মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি।

আজারবাইজান-আর্মেনিয়ার রোববার লড়াইয়ের ঘটনায় বিশ্বের বিভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ করে উভয়পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছে। এরমধ্যে রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, ইরান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রয়োজনে মধ্যস্থতার প্রস্তাবও দিয়েছে।

এসআইএস/পিআর

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]