বাইডেনকে আক্রমণে শেষ বিতর্কেও ট্রাম্পের মিথ্যার আশ্রয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:২৫ পিএম, ২৩ অক্টোবর ২০২০

নির্বাচনের ঠিক ১২ দিন আগে শেষ বিতর্কে অংশ নিয়ে নির্ধারিত ছয়টি বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন। বিতর্কে ওঠা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উভয় দিক থেকে যেসব দাবি উঠেছে তার সত্য-মিথ্যা যাচাই করেছে গণমাধ্যমগুলো। তারই একটি অংশ এখানে তুলে ধরা হলো।

স্থানীয় সময় ২২ অক্টোবর রাত ৯টায় টেনেসি অঙ্গরাজ্যের নাশভিলে নগরীর বেলমন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে মুখোমুখি হন দুই প্রার্থী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন। ৯০ মিনিটের এ বিতর্কে করোনা আমেরিকান ফ্যামিলি, বর্ণ বিদ্বেষ, জলবায়ু পরিবর্তন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নেতৃত্ব-এ ছয়টি বিষয় নির্ধারণ করা হয়।

ট্রাম্প দাবি করেছেন করোনাভাইরাস চলে যাচ্ছে। কিন্তু তার এ দাবি মিথ্যা। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সব অঙ্গরাজ্যে করোনার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। বেড়েছে নতুন সংক্রমণ, সংক্রমণের হার আর হাসপাতালে ভর্তি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে করোনায় শীর্ষ বিপর্যস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হচ্ছে।

বাইডেন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে দুই লক্ষাধিক মানুষ করোনায় প্রাণ হারিয়েছেন। চলতি বছরে শেষে আরও দুই লাখ প্রাণ হারাবেন। কিন্তু তার এ দাবি আংশিক সত্য। কেননা জেএএমএ নামের একটি মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছিল চলতি বছর শেষে ৪ লাখের বেশি মৃত্যু হবে। কিন্তু এখন সংখ্যাটা ২ লাখ ২৩ হাজার।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন প্রস্তুত। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তা পাওয়া যাবে। কিন্ত তার এমন দাবি মিথ্যা। বিশ্বে এখনও করোনার ভ্যাকসিন কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে অনেকগুলো ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছের, তা পেতে পেতে আগামী বছরের মাঝামাঝি।

যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এখনও জরুরি ব্যবহারের জন্য কোনো ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়নি। চূড়ান্ত অনুমোদন তো পরের কথা। কিছু কিছু ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপে রয়েছে। এখনও তা শেষ হয়নি। শেষ হলে তা কয়েক মাস পুনঃনিরীক্ষণের পরই সবার ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হবে।

ট্রাম্প দাবি করেছেন বাইডেন গ্রিন নিউ ডিলের সমর্থক। গ্রিন নিউ ডিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই পরিকল্পনা পাগলামির। তারা ১০০ ট্রিলিয়ন এ খাতে ব্যয় করতে চায়। তারা ভবন ভেঙে আবার গড়তে চায় নতুন ভবন।‘ কিন্তু বাইডেন এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তিনি এই ১০০ ট্রিলিয়ন সংখ্যাটা কোথায় পেলেন আমার জানা নেই।’

Trump-Biden-1.jpg

গ্রিন নিউ ডিল হলো আসন্ন ঝুঁকি বিবেচনায় নেয়া জলবায়ু পরিবর্তনের উদারনৈতিক পরিকল্পনা। তবে সত্য ঘটনা হলো বাইডেন কখনো গ্রিন নিউ ডিলের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্থনের কথা জানাননি। কিন্তু তিনি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তার সঙ্গে গ্রিন নিউ ডিলের কিছু অংশের মিল রয়েছে।

বাইডেনের দাবি, জলবায়ু নিয়ে কিছুই করেননি ডোনাল্ড ট্রাম্প। বরং ক্ষমতায় আসার পর ২০১৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বৈশ্বিকভাবে স্বাক্ষরিত প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিয়ে ট্রাম্প যে সেই প্রমাণই দিয়েছেন তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। কিন্তু ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি পরিবেশকে ভালোবাসেন।

ট্রাম্প বলেন, আমরা লাখ লাখ কোটি ডলার গচ্চা দেব অথচ যুক্তরাষ্ট্রকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছিল না। ‘চীনকে দেখুন তাদের বায়ু দূষিত। রাশিয়া ও ভারতকে দেখুন। তাদের বাতাসও দূষণে ভরা। প্যারিস চুক্তির কারণে আমি লাখ লাখ মানুষকে চাকরিচ্যুত হতে দিতে পারি না। শেষ হতে দিতে পারি না কোম্পানিগুলোকে।’

ট্রাম্প দাবি করেন, ‘তার প্রশাসন কার্বন নিঃসরণের সংখ্যা এতটা কমিয়ে এনেছে; যা গত ৩৫ বছরে হয়নি। ব্লুমবার্গ বলছে, তার এ দাবি আংশিক সত্য। ২০০৫ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সংক্রান্ত কার্বন নিঃসরণ ১৫ শতাংশ কমেছে। এর মধ্যে অবশ্য চলতি বছর করোনার লকডাউনের প্রভাবও রয়েছে ব্যাপক।

তবে কার্বন নিঃসরণের এই কৃতিত্ব অবশ্য শুধু ট্রাম্প প্রশাসনকে দিতে নারাজ বিশ্লেষকরা। আশঙ্কার খবর হলো, দেশটির জ্বালানি তথ্য প্রশাসন পূর্বাভাস দিচ্ছে, অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক হওয়া এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাত থেকে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ ৪.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, জো বাইডেন ট্যাক্স বাড়াতে চান। ট্রাম্প বলেন, আমি সবার ট্যাক্স কমাতে চাচ্ছি আর তিনি সবার ট্যাক্স বাড়াতে চান। সবার ওপর নতুন নিয়ম চাপাতে চান। যদি তিনি নির্বাচিত হন তাহলে আপনাকে অবসাদে ভুগতে হবে। আর এটা হবে এমন যেমনটা আপনার জীবনে আর কখনোই হয়নি।

Trump-Biden-1.jpg

তবে ঘটনা হলো বাইডেন বলেছেন, যাদের বার্ষিক আয় ৪ লাখ ডলারের বেশি তাদের ট্যাক্স বাড়ানো হবে। তিনি সবার কথা বলেননি। তিনি আয়কর বৃদ্ধির প্রস্তাবও দিয়েছেন। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাইডেন করপোরেট কর বৃদ্ধির কথা বলেছেন। তাতে উচ্চবিত্তদের কিছুটা সমস্যা হতে পারে। কিন্তু কম আয় করেন তারা এর ফল ভোগ করবেন।

করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে জীবাণুনাশক খাওয়ার কথা বলে এর আগে বিতর্কিত হয়েছিলেন ট্রাম্প। শেষ বিতর্কে সেই প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্পের সমালোচনা করেছেন বাইডেন। কিন্তু এর উত্তর দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, তিনি মজা করেই এমনটা বলেছেন। কিন্তু আত্মবিশ্বাস নিয়েই ট্রাম্প যে জীবাণুনাশক খাওয়ার কথা বলেন তা প্রমাণিত।

বাইডেন রাশিয়ার কাছ থেকে ২৫ লাখ ডলার নিয়েছেন বলে দাবি করেন ট্রাম্প। কারণ বাইডেনের সঙ্গে পুতিনের ভালো সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। এটা মিথ্যা দাবি। বাইডেন রাশিয়ার কাছ থেকে এমন কোনো অর্থ নেননি। তবে তার ছেলে হান্টার বাইডেনের নামে অভিযোগ আছে। কিন্ত তা প্রমাণিত নয়।

তবে এবারের বিতর্কে বিতণ্ডা হলেও প্রথম বিতর্কের মতো বিশৃঙ্খল ছিল না। দুজনেই অনেকটা শান্ত আর ঠান্ডা মেজাজে একে অপরকে আক্রমণ করেছেন। সময় নিয়ে কথা শুনেছেন একে অপরের। বাধাহীনভাবে কথা বলতে ‘সুইচ অফ’ করে অন্য প্রার্থীর মাইক্রোফোন বন্ধ রাখা হবে বলে আগেই জানিয়েছিলেন আয়োজকরা।

সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে তিনটি বিতর্ক হয়। কিন্ত ট্রাম্প করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় বিতর্কটি বাতিল হয়েছিল। চূড়ান্ত বিতর্ক সঞ্চালনা করেন এনবিসি নিউজের হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি ক্রিস্টেন ওয়েকার। 

এসএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]