করোনা পরবর্তী বিশ্বে সামাজিক সুরক্ষা বলয় গড়বে কীসে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৫৭ এএম, ০৫ মার্চ ২০২১

মহামন্দা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ধনী দেশগুলোর সরকার রাষ্ট্র ও নাগরিকদের মধ্যকার সম্পর্ক পুরোপুরি ঢেলে সাজিয়েছিল। করোনাভাইরাসের বৈশ্বিক মহামারি এখন সেই পুরোনো নীতিগুলোকেও ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নাগরিক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা বিলে সমর্থন করেন, যেখানে বেশিরভাগ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য ১ হাজার ৪০০ ডলারের চেক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, ব্রিটেনের সরকারি দেনা ১৯৪৫ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ার পরেও দেশটি সাময়িক ছুটিতে থাকা শ্রমিকদের মজুরি কর্মসূচির মেয়াদ আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে।

এধরনের সাহসিকতায় বিপদও রয়েছে। সরকারের আর্থিক অবস্থা চূড়ান্ত সহনসীমায় পৌঁছে যেতে পারে, প্রণোদনা বিকৃত হতে পারে এবং একটি অনমনীয় সমাজ গড়ে উঠতে পারে। তবে তাদের সামনে নতুন সামাজিক কল্যাণ নীতিমালা তৈরি সুযোগও রয়েছে, যা সাশ্রয়ী হবে এবং প্রযুক্তিগত বাধার মুখেও শ্রমিকদের উন্নতি করতে সহায়তা করবে।

গত বছর সামাজিক ব্যয় নিয়ে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেখা গেছে। বিশ্বজুড়ে অন্তত ১ হাজার ৬০০টি নতুন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শুরু হয়েছে ২০২০ সালে। ধনী দেশগুলো তাদের জিডিপির গড়ে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ রেকর্ড সংখ্যক কর্মীদের সহায়তায় কাজে লাগিয়েছে। সরকারগুলোর দেনা বাড়ছে ঠিকই, তবে সুদের নিম্নহারের কারণে তা এখন পর্যন্ত সস্তাই রয়েছে।

economist-3.jpg

জনগণের মনোভাবও ইতোমধ্যে বদলে গেছে। ব্রিটিশরা আগে অভিযোগ করত, বিনাকাজে সহায়তা কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। অথচ এখন তারাই বলছে, সহায়তা কম হয়ে গেছে। গত বছর দুই-তৃতীয়াংশ ইউরোপীয় বলেছিল, তারা একটি সার্বজনীন মৌলিক আয়কে (ইউবিআই) সমর্থন করছে, যা প্রাপ্তবয়স্ক সবার জন্য নিঃশর্ত ও পুনরাবৃত্তিমূলক মজুরি নিশ্চিত করে।

করোনাভাইরাস আঘাত হানার আগে থেকেই অনেক ধনী দেশের সামাজিক সুরক্ষা বলয় সংকটে ছিল। অটো ভন বিসমার্ক এবং উইলিয়াম বেভারিজের ধারণার ভিত্তিতে তৈরি মডেলগুলো প্রায়ই বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিগত সামাজিক পরিবর্তনের হাত থেকে কর্মীদের রক্ষায় ব্যর্থ হয়। ১৯৯৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শ্রমশক্তির বাইরে থাকা ২৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সী মার্কিনিদের সংখ্যা ২৫ শতাংশ বা ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন বেড়েছে, যা সরকারের প্রধান সহায়তা কর্মসূচিতে সাহায্যপ্রাপ্ত সংখ্যার চেয়ে অন্তত ছয়গুণ বেশি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা এবং পেনশন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি সরকারগুলো শ্রমজীবী মানুষের জন্য সহায়তাও কমিয়ে দিয়েছে। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় পেনশন বিল অন্তত চার বিলিয়ন পাউন্ড (৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার) বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে এর কল্যাণমূলক বাজেটের বাকি অংশ ১৬ দশমিক ৫ বিলিয়ন পাউন্ড সংকুচিত হয়েছে। একদিকে মধ্যম আয়ের চাকরি ক্রমশ কমছে, অন্যদিকে অর্থনীতির অস্থিরতা বাড়ছে। এতে সরকারের তুলনায় শ্রমবাজারগুলো দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

economist-3.jpg

জনগণের আগ্রহ এবং অর্থনীতিবিদদের একাংশের উৎসাহে অপরিকল্পিত আর্থিক ব্যয় বাড়াতে অথবা ইউবিআইর মতো বিশাল প্রকল্প চালু করতে রাজনীতিবিদরা প্ররোচিত হতে পারেন। তবে এসবের পরিবর্তে তাদের একটি পরিমিত ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

সুরক্ষা বলয় অবশ্যই সাশ্রয়ী হতে হবে। শক্ত বাজেটই গড়ে দেবে এই বিশ দশকের ভাগ্য। মহামারির আগে বড় অর্থনীতিগুলোর বাৎসরিক আর্থিক ঘাটতি ছিল তাদের সম্মিলিত জিডিপির চার শতাংশ। ভবিষ্যতে তা আরও বাড়তে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় অভাবীদের কাছে সামাজিক ব্যয় অবশ্যই দ্রুত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রবাহিত হতে হবে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের মতো সংকটকালীন মুহূর্তে জরুরি আইন পাস করে নয়, সরকারগুলোকে এমন প্রক্রিয়া খুঁজে বের করতে হবে, যা আর্থিক সংকট ও বেকারত্বের সময় মানুষকে কার্যকরভাবে সাহায্য করবে, একইসঙ্গে তাদের চাকরিতে নিরুৎসাহিত ও অর্থনীতির গতিশীলতাও নষ্ট করবে না।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট

কেএএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]