বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের উত্থান ও চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:৪০ পিএম, ১২ এপ্রিল ২০২১

করোনাভাইরাস মহামারি শুরুর পর গত দেড় বছরের মধ্যে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম বিদেশ সফর ছিল প্রতিবেশী বাংলাদেশে। তার সাম্প্রতিক এ সফরকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও একধাপ এগিয়ে নেয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ‘মাইলস্টোন’ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তাদের একজন ড. রূপকজ্যোতি বোরাহ।

টোকিওর জাপান ফোরাম ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ এ গবেষক সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের উত্থান এবং এতে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ানো কিছু বিষয় নিয়ে নিজের মতামত জানিয়েছেন। তার সেই লেখাটি সোমবার (১২ এপ্রিল) প্রকাশ হয়েছে চীনা গণমাধ্যম সাউথ-চায়না মর্নিং পোস্টে।

এ গবেষক লিখেছেন, শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি শাসনামলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উষ্ণতম অবস্থানে পৌঁছেছে। তাদের সময়েই অনেক সীমান্তবিরোধ আপসে নিষ্পত্তি হয়েছে। দুই দেশ ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক সীমান্তচুক্তিতে সই করেছে এবং ২০১৪ সালের জুলাইয়ে জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক সম্মেলনের রায় মেনে সমুদ্রসীমা নিয়েও একমত হয়েছে।

রূপকজ্যোতি বোরাহর মতে, দক্ষিণ এশীয় দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের অনেক উপযুক্ত কারণ রয়েছে। প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অসাধারণ উন্নতি করেছে এবং শিগগির স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের সারিতে অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে। দেশটির এমন অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার সরকার ‘ইসলামপন্থীদের’ হুমকিতে রয়েছে এবং এর জন্য ভারতের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে স্বদেশে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদ হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে, ২০১৬ সালে হলি আর্টিজান ক্যাফেতে হামলার স্মৃতি এখনও তরতাজা। ওই ঘটনায় ২২ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, যার বেশিরভাগই বিদেশি।

তৃতীয়ত, ক্ষমতালাভের পর থেকে নরেন্দ্র মোদি ভারত এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) অন্য সদস্যদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়তে আগ্রহ দেখিয়েছেন, যেটিকে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে তার অভিষেক অনুষ্ঠানে সার্ক রাষ্ট্রপ্রধানদের আমন্ত্রণ জানানোর অভূতপূর্ব পদক্ষেপে সেটি দেখাও গেছে। পাকিস্তান ও নেপালের ক্ষেত্রে মোদির সফলতা বেশ কম, তবে বাংলাদেশে তিনি যে অভ্যর্থনা পেয়েছেন তা একেবারেই অনন্য।

jagonews24

চতুর্থত, বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে বহুমাত্রিক প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (বিমসটেক) এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশ উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মোদি সরকারের নজরও এটিকে ঘিরেই।

এই অঞ্চলে একসময় সামুদ্রিক যোগাযোগ ছিল। তবে ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সৃষ্টির পরে এটি অবরুদ্ধ হয়ে যায়। মোদি সরকার ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে আগের কয়েকটি রেল করিডোর ফের চালু করেছে।

গত মাসে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম এবং বাংলাদেশের রামগড়ের মধ্যে মৈত্রী সেতুর উদ্বোধন করেছেন নরেন্দ্র মোদি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও যৌথভাবে সেতুটির উদ্বোধন করেন)। উল্লেখ্য যে, সাব্রুম থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরেই অবস্থিত বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর।

পঞ্চমত, ভারত ও বাংলাদেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে একে অপরের কাছাকাছি এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত, বাংলাবান্ধার ফুলবাড়ী করিডোর, ডাউকি-তামাবিল ক্রসিং প্রভৃতি।

রূপকজ্যোতি বোরাহ বলেন, ভারত চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এ যোগ দেয়নি, কারণ নিজেদের অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে তারা যোগাযোগের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারে আগ্রহী। ভারত বিআরআইতে যোগ না দেয়া আরেক দেশ জাপানের সঙ্গে অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ, ভুটান, নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধিতেও তাদের নিজস্ব উদ্যোগ রয়েছে।

এ গবেষক মনে করেন, এত কিছুর পরেও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। প্রথমত, বাংলাদেশ বিআরআইয়ে যোগ দিয়েছে এবং তাদের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তাদের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ফলে বাংলাদেশ চীনের আরও ঘনিষ্ঠ হলে নয়াদিল্লিতে সতর্কঘণ্টা বেজে ওঠাই স্বাভাবিক।

দ্বিতীয়ত, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ করে, তিস্তার বিরোধ রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপরও।

ড. রূপকজ্যোতি বোরাহর মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে সামনের পথ বেশ জটিল। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশ উষ্ণ এবং ভবিষ্যতে তা আরও উন্নত হবে। তবে সেটি অনেকটাই নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর।

কেএএ/এইচএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]