বিজেপির গানে বাংলাদেশের ঘটনা রাজনৈতিক স্বার্থে : আনন্দবাজার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:২৫ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০২১

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রচারণার একটি গান নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ নিয়ে শুধু ভারতেই নয়, কথা হচ্ছে বাংলাদেশেও। কারণ ওই গানে বাংলাদেশে ২০ বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ধর্ষণের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যা দিয়ে এ দেশে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায় চরম দুর্দশায় রয়েছে এবং এর কারণে ভারতে অনুপ্রবেশ হচ্ছে বলে বোঝানোর চেষ্টা দেখছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।

দু’দিন আগে অনুপ্রবেশ ইস্যুতে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফের সমালোচনার ঝড় তুলেছেন বিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা ও ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তার দাবি, বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে উন্নয়ন না হওয়ায় গরিবরা ঠিক মতো খেতে পায় না। এ কারণে তারা ভারতে চলে যাচ্ছে।

বিজেপি শিবির এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধর্মীয় বিভাজন কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। বাংলা ভাষার শীর্ষস্থানীয় কলকাতাভিত্তিক দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকাও এতে রাজনৈতিক স্বার্থই দেখছে। বৃহস্পতিবার (১৫ এপ্রিল) পত্রিকাটির সম্পাদকীয়তে বিজেপির এমন বিতর্কিত নীতির কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।

‘ইন্ধন’ শিরোনামে প্রকাশিত ওই লেখায় বলা হয়েছে, ২০০১ সালে বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে দুষ্কৃতকারীদের কাছে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন এক নারী। তিনি ধর্মপরিচয়ে হিন্দু। দীর্ঘ মামলা শেষে ২০১১ সালে অপরাধীরা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। তারপর কেটে গেছে ১০টি বছর। পড়াশোনা শেষে তিনি চাকরি করেছেন, সংসদীয় রাজনীতিতে যোগদানের চেষ্টাও চালিয়েছেন। দুর্ভাগ্য, দুই দশক পুরোনো সেই হিংস্রতার স্মৃতি তার পিছু ছাড়ল না! পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি-সমর্থকরা যে গান বেঁধেছেন, তাতে এই নারীর কথা উল্লেখ রয়েছে। স্বভাবতই তিনি ক্ষুব্ধ— অন্য রাষ্ট্রের একটি রাজনৈতিক দল ভোটের আবহে নির্মিত ও প্রচারিত গানে কোনও অনুমতির ধার না ধরেই তার নাম ও ছবি ব্যবহার করছে, তার জীবন নিয়ে রাজনীতি করছে। সেই গানের ভিডিওতে বারবার ফিরে এসেছে একটি কথা- সেই ‘ছোট্ট মেয়ে’র খবর কেউ রাখে না। তিনি সঙ্গত প্রশ্ন তুলেছেন, এই গানের নির্মাতাই কি তার খবর রেখেছেন?

আন্দবাজার পত্রিকার ভাষায়, ‘‘খবর ‘রাখিবার’ প্রয়োজন নাই, খবর ‘ব্যবহার করিবার’ প্রয়োজন আছে।’’ ধর্ষণের মতো ঘটনা থেকে হিন্দু-মুসলিম বিভেদের সারমর্ম গানে ঢেলে দিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধিই বিজেপির লক্ষ্য। নাহলে ২০ বছর আগের এবং অন্য দেশের এক প্রান্তের একটি ঘটনা বাছাই করে তুলে আনার কোনও কারণ থাকতে পারে না।

সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ধর্ষণ-রাজনীতির এই ব্যবহার কেবল অপ্রাসঙ্গিকই নয়, বিদেশের ঘটনাকে নিজ দেশে কার্যসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করা নির্বাচনী বিধিরও বিরোধী। তবে সময় ও সুযোগ বুঝে বাছাই করা বিষয়ের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যবহার এটাই প্রথম নয়— এই কাজে বিজেপির সমর্থক-কর্মী, নেতা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীও দক্ষ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রীতিমতো তালিকা করে দেখিয়েছেন, নরেন্দ্র মোদি এমন সব পরিসর থেকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দলীয় রাজনীতির বার্তা দিয়েছেন, যেখানে তার প্রকৃত পরিচয় থাকার কথা ছিল দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে, দেশের প্রধানমন্ত্রী রূপে। তার যুক্তরাষ্ট্র সফরেও রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে মিশে ছিল প্রবাসী বিজেপি-সমর্থকদের প্রত্যক্ষ প্রণোদনা দান ও ভারতের নির্বাচন সংক্রান্ত প্রচার।

আনন্দবাজার পত্রিকার মতে, বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণার গানে আলাদা করে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ তোলার কারণ স্পষ্ট। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে (১৯৪৭ সালের) দেশভাগ ও তার কারণে জনবিভাজনে জোর দিচ্ছে বিজেপি, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) চালুর প্রেক্ষাপট হিসেবে তারা দেখাতে চাচ্ছে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের দুরবস্থা এবং অনুপ্রবেশের প্রবণতাকে। অথচ তথ্য-পরিসংখ্যান বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশের ভিন্ন চিত্রই দেখাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরকে ছাপিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থনীতি নাগরিকদের সামাজিক-রাজনৈতিক স্থিতি দিয়েছে।

আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয়টির শেষাংশে বিজেপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতির যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ভারতের সমস্যা প্রসঙ্গে অন্য দেশ প্রশ্ন তুললে বিজেপি ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ’ বলে রাগ দেখায়, কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া কথা শোনায়। অথচ ২০ বছর আগে বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনা সমর্থকরা দলীয় গানে জুড়ে দিলে তাতে তাদের আপত্তি নেই। নিজস্বার্থ হাসিলের কৌশলে কোনও রাখঢাক নেই। ভোটের আবহে ধর্মীয় বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে জনসমর্থন আদায়ের এই নির্লজ্জ প্রচেষ্টা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এটি আগুন নিয়ে খেলা নয়, এটি ঘরে আগুন লাগানোর চেষ্টা!

কেএএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]