তালেবান পতনের পর কতটা বদলেছে আফগানিস্তান?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:৫০ পিএম, ২৩ এপ্রিল ২০২১

আফগানিস্তান আক্রমণ করে তালেবান নেতৃত্ব উৎখাতের প্রায় ২০ বছর পর সেখান থেকে বিদায় নিতে চলেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা। আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই দেশটি থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন।

এই দুই দশকে আফগানিস্তানের পরিস্থিতির কি সত্যিই উন্নতি হয়েছে? দেখে নেয়া যাক কী বলছে পরিসংখ্যান-

সহিংসতার অবস্থা কী?
আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহার এবং আফগান সরকার ও তালেবানের মধ্যে শান্তি আলোচনা সত্ত্বেও দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সহিংসতা কমার বদলে উল্টো বেড়েছে।

জাতিসংঘের হিসাবে, এক বছর আগের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আফগানিস্তানে বেসামরিক নাগরিক হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। বেড়েছে নারী ও শিশুদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও। এসব ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তালেবানের মতো বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো দায়ী বলা হচ্ছে।

jagonews24

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০ সালে টানা সপ্তম বছর আফগানিস্তানে তিন হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। সেখানে সুশীল সমাজের সদস্য, গণমাধ্যমকর্মী, সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনাও বাড়তে দেখা গেছে।

২০১৯ সালের আগস্টজুড়ে আফগানিস্তানে সহিংসতার ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে বিবিসি দেখেছে, সেখানে দৈনিক গড়ে ৭৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর আগের বছর দেশটিতে নিহত হয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি- ৩ হাজার ৮০০ জন এবং আহত হয়েছিলেন সাত হাজারেরও বেশি মানুষ।

নারীদের পরিস্থিতি কেমন?
নব্বইয়ের দশকে তালেবান শাসনামলে নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল, এমনকি মেয়েদের স্কুলে যেতেও বাধা দেয়া হতো। ২০০১ সালে মার্কিন বাহিনী প্রবেশের পর এ পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়।

jagonews24

আফগানিস্তানের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, যদিও দেশটিতে এখনও সরকারি চাকরি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পুরুষের সংখ্যাই বেশি, তবে গত দুই দশকে সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০০৪ সালে আফগানিস্তানে এসব খাতে কর্মরত ছিলেন মাত্র ৫১ হাজার ২০০ জন নারী। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮৭ হাজারে।
এসময়ে কর্মজীবী পুরুষের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে শতকরা হিসাবে এগিয়ে নারীরাই (পুরুষ ৪১ শতাংশ ও নারী ৬৯ শতাংশ)।

অবশ্য আফগানিস্তানে কর্মজীবী নারীরা ঠিক কোন পর্যায়ে কাজ করছেন এবং তাদের বেতন কেমন তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। এছাড়া বেসরকারি খাতে কর্মরত নারীদের সঠিক পরিসংখ্যানও পাওয়া যায়নি।

jagonews24

তবে সাম্প্রতিক একটি মার্কিন প্রতিবেদন বলছে, গত কয়েক বছরে আফগানিস্তানে নারী পুলিশের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০০৫ সালে আফগান পুলিশে নারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ১৮০ জন, ২০১৯ সালে তা সাড়ে তিন হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

নারীশিক্ষা কতদূর?
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, আফগানিস্তানে সব পর্যায়ের স্কুলে শিশুদের সংখ্যা ২০০১ সালের ৯০ লাখ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৭ সালে ৯২ লাখে পৌঁছেছে। এদের মধ্যে ৩৯ শতাংশই মেয়ে শিক্ষার্থী।

প্রাথমিক শিক্ষার দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১২ সালে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছিল। তবে এরপর থেকে সেই হার কিছুটা নিম্নমুখী।

২০১৯ সালে ইউনিসেফ এক প্রতিবেদনে বলেছিল, আফগানিস্তানে ছেলেদের তুলনায় সব বয়সের মেয়েদের স্কুলে উপস্থিতির হার অনেক কম। সেখানে ১০ বছর বয়স থেকে লিঙ্গবৈষম্য বাড়তে শুরু করে এবং ১৪ বছরে শিখরে পৌঁছায়।

সংস্থাটির তথ্যমতে, আফগানিস্তানে ৩৭ লাখ শিশু শিক্ষাবঞ্চিত, এর মধ্যে ৬০ শতাংশই মেয়ে।

jagonews24

ইউনিসেফ আরও বলেছে, আফগানিস্তানের বিশাল এলাকায়, বিশেষ করে তলেবান ও অন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে স্কুলে মেয়েদের উপস্থিতির হার একেবারেই কম।

তবে দেশটির শিক্ষাখাতে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ২০১৮ সালে আফগানিস্তানে শিক্ষকদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশই ছিলেন নারী। এছাড়া সেখানে নারীদের মধ্যে সাক্ষরতার হারও বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুসারে, ২০০২ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশটির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাতগুণ।

দারিদ্র্য কতটুকু গেল?
বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ আফগানিস্তান। তবে ২০০১ সালে মার্কিন অভিযান শুরুর পর আন্তর্জাতিক ত্রাণ সহায়তার ঢল নামায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত এগোতে থাকে। এর নমুনা দেখা যায় জিডিপির হিসাবেও।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০০৩ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে গড়ে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে আফগানিস্তানে।

তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রবৃদ্ধির গতিও কমতে থাকে। তার ওপর ২০১৫ সাল থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আফগান অভিবাসী দেশে ফিরতে শুরু করেন, যার ফলে জনসংখ্যা আরও ফুলেফেঁপে ওঠে।

jagonews24

সরকারি জরিপে দেখা গেছে, আফগানিস্তানের ৫৪ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন, যাদের মাসিক আয় ২ হাজার ৬৪ আফগানিরও (আফগান মুদ্রা) কম। অথচ ২০১১-১২ সালেও দারিদ্র্যের এই হার ছিল ৩৮ শতাংশের মতো।

২০১৯ সালের আগস্টে গ্যালাপের একটি জরিপ বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চরম খরার কারণে আফগানিস্তানের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। সেখানকার প্রতি ১০ জনের ছয়জনই জানিয়েছেন, তারা গত বছর খাদ্য জোগাড় করতে হিমশিম খেয়েছেন।

করোনাভাইরাস মহামারিতে সেই পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সূত্র: বিবিসি

কেএএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]