রোহিঙ্গা : ইউএনএইচসিআরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এইচআরডব্লিউর

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৫৭ পিএম, ১৫ জুন ২০২১ | আপডেট: ০৬:২৩ পিএম, ১৫ জুন ২০২১

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) ভুল পদ্ধতিতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে তা বাংলাদেশের কাছে প্রকাশ করেছে। পরবর্তীতে এসব তথ্য বাংলাদেশ সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের সত্যতা যাচাই করতে মিয়ানমারের কাছে প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

সংস্থাটি তাদের নীতিমালা অনুসারে পূর্ণ তথ্য মূল্যায়নের কার্যক্রম পরিচালনা করেনি এবং কিছু ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের তথ্য সরবরাহ করার বিষয়ে সেই দেশ থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের সম্মতি পেতে ব্যর্থ হয়েছে।

২০১৮ সাল থেকে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে নিবন্ধন করেছে এবং বাংলাদেশ সরকার তাদের পরিচয়পত্র প্রদান করেছে যা প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরিষেবার জন্য আবশ্যক ছিল।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারের কাছে শরণার্থী সম্পর্কিত তথ্য জমা দেওয়ার জন্য অ্যানালগ বা অনুরূপ স্থির ছবি, বৃদ্ধা আঙ্গুলের ছাপ এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করেছে।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য সংগ্রহে যেসব মাধ্যম কাজ করেছে তারা সংস্থাটির নিজস্ব নীতিমালার পরিপন্থী ছিল এবং শরণার্থীদের আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর সংকট ও সংঘাত বিষয়ক পরিচালক লামা ফাকিহ উল্লেখ করেছেন।

অংশগ্রহণকারীদের কাছ থেকে নিয়ম অনুযায়ী স্বাধীনভাবে এবং অবহিতমূলক সম্মতি পেলেই কেবল ইউএনএইচসিআর সংগৃহীত তথ্যের অনুমোদন দিতে পারে এবং সম্পৃক্ত দেশগুলোর কাছে প্রকাশ করার অধিকার রাখে। কিন্তু এক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম ঘটেছে।

২০১৬ সাল থেকে ৮ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার থেকে বের করে দেয়া হয়েছে অথবা মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মত ঘটনা ঘটেছে। ফলে বাঁচার জন্য তারা সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।

অপরদিকে মিয়ানমারে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বর্ণবাদ, নির্যাতন ও মানবতাবিরোধী অপরাধ এখনও চালিয়ে যাচ্ছে দেশটির সরকার। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআর-এর সাথে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধণের অভিজ্ঞতার বিষয়ে ২৪ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে এবং ২০ জন মানবিক সহায়তা কর্মী, বিশ্লেষক, স্থানীয় অধিকার কর্মী, সাংবাদিক এবং যারা রোহিঙ্গা নিবন্ধনে পর্যবেক্ষণ করেছেন বা অংশ নিয়েছেন তাদের সাথে কথা বলেছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত ফেব্রুয়ারি এবং এপ্রিলে ইউএনএইচসিআরের কাছে বিস্তারিত প্রশ্ন এবং এর গবেষণার ফলাফল প্রেরণ করে এবং গত ১০ মে ইউএনএইচসিআর এর কাছ থেকে এর প্রতিক্রিয়া পায়। ইউএনএইচসিআর কোনও রকম ভুল বা নীতি লঙ্ঘনের বিষয়টি অস্বীকার করে জানিয়েছে যে, এটি তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রমের সকল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছে এবং এ বিষয়ে সম্মতির ভিত্তিতেই কাজ করেছে।

সংস্থাটি বলছে যে, তথ্য সংগ্রহের প্রচেষ্টার লক্ষ্য ছিল শরণার্থীদের জন্য দীর্ঘকালীন সমাধান খুঁজে বের করা এবং কোনও রোহিঙ্গা যেন ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার ইউএনএইচসিআর-এর সাথে একটি যৌথ নিবন্ধণ কার্যক্রম শুরু করে পূর্ববর্তী নিবন্ধনের সঙ্গে পরিপূরক করতে চেয়েছিল।

সরকার শরণার্থীদের জন্য ‌‌‘স্মার্ট কার্ড’ নামে পরিচিত একটি পরিচয়পত্র সরবরাহ করার লক্ষ্য ঠিক করেছিল। শরণার্থীদের সহায়তা এবং পরিষেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই কার্ডের প্রয়োজন রয়েছে। সরকার ইউএনএইচসিআর-এর সংগৃহীত ব্যক্তিগত তথ্য মিয়ানমারের কাছে জমা দিয়ে প্রত্যাবাসনে রোহিঙ্গাদের যোগ্যতার মূল্যায়নের জন্য ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

ইউএনএইচসিআর জানিয়েছিল যে, এটি শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের অধিকার রক্ষা করতে সহায়তা করবে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাথে জানুয়ারির একটি বৈঠকে ইউএনএইচসিআর বলেছিল যে, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যোগ্যতার মূল্যায়নের জন্য তাদের তথ্য শেয়ার করার অনুমতি চেয়েছিলেন এবং ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন যে এখানে যারা সম্মত হননি তাদেরকেও একটি স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে।

তবে নিবন্ধকরণ কার্যক্রমের সময় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গা কমিউনিটি রেডিও শো এবং ২০১৮ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে দেওয়া মন্তব্যসহ ইউএনএইচসিআর কর্মীরা প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে তথ্য সংগ্রহ প্রত্যাবাসনের সাথে যুক্ত ছিল না।

জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনকে সহজতর করার জন্য তথ্য সংগ্রহের ব্যবহার করা হবে আংশিকভাবে এই উদ্বেগের কারণে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সেই মাসে ক্যাম্প গুলোতে বিক্ষোভ করেছিল। ইউএনএইচসিআর-এর কর্মীরা জানুয়ারির সভায় যা তুলে ধরেছিল তা থেকে শরণার্থীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাক্ষাৎকারে ভিন্ন মতামত দিয়েছিল।

২৪ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে একজন ছাড়া সবাই বলেছিল, ইউএনএইচসিআর-এর কর্মীরা তাদের বলেছিল যে, তাদের সহায়তার সুযোগ পেতে স্মার্ট কার্ডের জন্য তাদের রেজিস্ট্রেশন করতে হবে এবং তারা মিয়ানমারের সাথে তথ্য শেয়ার করে নেওয়ার বা এটিকে প্রত্যাবাসন যোগ্যতার মূল্যায়নের সাথে সংযুক্ত করার বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করেনি।

তিনজন বলেছিলেন যে, তথ্য দেওয়ার পরে তাদের বলা হয়েছিল যে এটি প্রত্যাবাসনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হতে পারে। একজন বলেছিলেন যে, তিনি রেজিস্ট্রেশন কেন্দ্র ছেড়ে যাওয়ার পরে লক্ষ্য করেছেন যে, মিয়ানমারের কাছে তথ্য সরবরাহ করার ঘরটি ‘হ্যাঁ’ বোধক চিহ্ন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তাকে কখনও এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়নি।

সাক্ষাৎকার নেয়া শরণার্থীদের মধ্যে যারা ইংরেজি পড়তে পারেন এমন তিনজনের মধ্যে তিনি ছিলেন একজন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কেবল ইংরেজি রসিদ দেখেছিল যা ইউএনএইচসিআর নিবন্ধণের পর রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এগুলো দিয়েছিল।

এতে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বোধক চিহ্ন উল্লেখ করে একটি ঘর ছিল যেখানে বলা হয়েছে যে, মিয়ানমার সরকারের কাছে তথ্য সরবরাহ করা যাবে কিনা। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২১ জন শরণার্থীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিল যাদের নাম প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার দ্বারা যাচাই করা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

২০১৯ সালের প্রত্যাবাসন যোগ্যতা মূল্যায়নের তালিকায় ২১ জনের মধ্যে ১২ জনকে যুক্ত করা হয়েছিল-যা ইউএনএইচসিআর-এর গৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তালিকা করে তৈরি করা হয়েছিল। ২১ জন বলেছিলেন, নিবন্ধভুক্ত হওয়ার পরে তারা জানতে পারেন যে তাদের তথ্য মিয়ানমারের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে এবং তাদের নাম প্রত্যাবর্তনের জন্য যাচাই করা লোকদের তালিকায় রয়েছে।

তারা সবাই অন্য ক্যাম্পে লুকিয়ে গিয়েছিলেন কারণ তারা জোর করে ফিরে যেতে বাধ্য করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন। যদিও এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থিত ক্যাম্পগুলোর কোনও রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়নি।

সাক্ষাৎকার নেয়া ২৪ জন শরণার্থীর মধ্যে একজন বলেছেন, ইউএনএইচসিআর-এর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা তাকে নিবন্ধণের সময় জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তিনি মিয়ানমার সরকারের কাছে তার তথ্য প্রকাশ করতে রাজি ছিলেন কিনা। তিনি বলেন, ‌‌‘আমার স্মার্ট কার্ডের প্রয়োজন ছিল বলে আমি না বলতে পারিনি এবং আমি মনে করি না যে আমি তথ্য প্রকাশ করার প্রশ্নে না বোধক উত্তর দিতে পারতাম এবং এরপরেও কার্ডটি পেতে পারতাম।’

ইউএনএইচসিআর স্বাধীনভাবে এবং শরণার্থীদের আগে থেকে অবহিত করে সম্মতি চায়নি। এক্ষেত্রে শরণার্থীদের মিয়ানমারের কাছে তাদের এবং তাদের পরিবারের তথ্য সরবরাহ করার ঝুঁকিগুলো জানতে এবং বুঝতে পারার নিশ্চয়তা দরকার ছিল। তাদের মধ্যে অন্ধবিশ্বাস ছাড়াই অংশগ্রহণ করা থেকে সরে আসার সক্ষমতা থাকতে পারত এবং তারা সম্মত না হলেও যে তারা স্মার্ট কার্ড পাবে সে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন ছিল।

টিটিএন/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]