নির্বাচনী বছরে নরেন্দ্র মোদীর বাজেট ভাবনা কী?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:১৩ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২২
ছবি: সংগৃহীত

কিছুদিন পরেই ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করতে চলেছে ভারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, মোদী সরকারের এই বাজেট শুধু মাসখানেক পরে অনুষ্ঠিতব্য উত্তর প্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনেই নয়, সরাসরি প্রভাব ফেলবে ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও। তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে জনগণের মন জেতার জন্য শেষবারের মতো অর্থ খরচের সুযোগ এবারের বাজেটেই পাবেন নরেন্দ্র মোদী। কারণ, আগামী অর্থবছরে যে বাজেট পাস হবে, তার কার্যকরী প্রভাব পড়ার আগেই নির্বাচনের অগ্নিপরীক্ষা চলে আসবে বিজেপি সরকারের সামনে।

দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন সামনে রেখে এ বছর মোদী সরকারের বাজেট কেমন হতে পারে অথবা কোন কোন বিষয়ে নজর রাখতে হবে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্রে তা নিয়ে বিশ্লেষণী প্রতিবেদন করেছে দ্য ইকোনমিক টাইমস। জাগো নিউজের পাঠকদের জন্য এর সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো-

নির্বাচনী বাজেট কী?
এর একটি অর্থ, সরকার ট্যাক্স নিয়ে টানাহেঁচড়া না করে জনকল্যাণ খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করবে। এছাড়া, সরকার অবকাঠামো খাতে ব্যয় বাড়ানো বা বাড়তি অবকাঠামো ব্যয় সামঞ্জস্যের চেষ্টা করবে। এটি ব্যবসার পথ সহজ করতে সাহায্য করে।

২০২০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তথ্য বলছে, মহাসড়ক, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ভারতে ১ হাজার ৬৮০টি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ২০ শতাংশ খরচ বাড়ায় বিলম্বের মুখে পড়েছে।

তৃতীয়ত, নির্বাচনী বাজেটে নতুন চাকরির বিষয়টি নজরে থাকে। সুতরাং, এবারের বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার জন্য বিশেষ স্কিম চালু করতে পারে মোদী সরকার। কারণ, এগুলো বিজেপির অন্যতম ভোটব্যাংক।

চাকরি ব্যবস্থাপনা
স্বাধীন থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির (সিএমআইই) তথ্যমতে, ভারতে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি নতুন চাকরিপ্রত্যাশী যোগ হয়। গত ডিসেম্বরে দেশটিতে বেকারত্বের হার আট শতাংশ ছুঁয়েছে। ২০২০ সাল এবং ২০২১ সালের বেশিরভাগ সময়জুড়ে এর হার সাত শতাংশের কাছাকাছি ছিল।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বিবিসি’কে বলেছেন, গত তিন দশকে ভারতে এমন কিছু দেখা যায়নি। এমনকি, ১৯৯১ সালের বিশাল অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও নয় (ওই বছর মন্দার সময় ভারত সরকারের হাতে আমদানি ব্যয় মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত ডলারও ছিল না)।

তার কথায়, ২০২০ সালে বেশিরভাগ দেশেই বেকারত্ব বেড়েছে। কিন্তু ভারতে বেকারত্বের হার বাংলাদেশ (৫ দশমিক ৩ শতাংশ). মেক্সিকো (৪ দশমিক ৭ শতাংশ) ও ভিয়েতনামের (২ দশমিক ৩ শতাংশ) মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চাকরির নতুন ক্ষেত্র তৈরিতে প্রস্তুতকারক ও নির্মাণ শিল্প বড় ভূমিকা রাখে। এ কারণে নির্বাচনী বাজেটে এসব খাতে বিশেষ নজর থাকতে পারে বিজেপির।

আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাকিনসলের ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, ভারতে ৫০ কোটি ডলারের বেশি আয় করা বড় কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ৬০০টি। দেশটিতে অন্তত এক হাজার মধ্যম-আকারের প্রতিষ্ঠান বড় হওয়া এবং এক লাখ ছোট প্রতিষ্ঠান মধ্যম-আকারে পৌঁছানো দরকার ছিল বলে মনে করে ম্যাকিনসলে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অনুপস্থিত এই মধ্যম শ্রেণি হলো অর্থনীতির সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও গতিশীল অংশ, যা উদ্ভাবনে উত্সাহিত করে। এদের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সহজে অর্থায়ন ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

এবারের বাজেটে প্রস্তুতকারক খাতে যে কর্মসূচিই ঘোষণা হোক না কেন, তা উত্পাদন-সম্পর্কিত প্রণোদনা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ মহামারির মধ্যে ভারতের অর্থনীতি এমনিতেই সংকুচিত হয়েছে। ফলে, দ্রুত বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে মোদী সরকারের ওপর কিছুটা চাপ থাকবে।

সরকারি ব্যয়
সম্প্রসারণমূলক বাজেটের সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। ভারতীয় বাজার বিশ্লেষক অজয় বাগ্গা বলেন, যদি বিজ্ঞ পরামর্শ প্রাধান্য পায়, তবে এ বছর তাদের বড় সম্প্রসারণমূলক বাজেট থাকা উচিত, যেখানে ভোটার রয়েছে- তা সে সাশ্রয়ী আবাসন, গ্রামীণ অর্থনীতি, অবকাঠামো বা কর্মসংস্থান সৃষ্টি যা-ই হোক না কেন।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, মোদী সরকার কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার উদ্যোগ নিতে পারে। সাশ্রয়ী আবাসন ও সবার জন্য নিরাপদ পানির দিকেও নজর থাকবে।

ট্যাক্স
চিন্তার বিষয় হচ্ছে, সরকার যদি ট্যাক্স না বাড়ায়, তাহলে বাড়তি অর্থ আসবে কোথা থেকে? বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খবর অনুসারে, ভারতে সরকারি ঋণের বোঝা বাড়তে বাড়তে জিডিপির ৯০ শতাংশে পৌঁছাতে চলেছে। মহামারির আগে এর হার ৭০ শতাংশেরও নিচে ছিল।

এর অর্থ, বাড়তি সুদের বোঝা সরকারি ব্যয় বাড়ানোর পথে বাধা। প্রায় সমান আশঙ্কা, সরকারের আয় যথেষ্ট না হওয়াও।

বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বলছে, ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিগুলোতে সাধারণত জিডিপির একটি বড় অংশ রাজস্ব হিসেবে সরকারের কাছে যায়, যা থেকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কল্যাণমূলক কর্মসূচির পাশাপাশি অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষায় অর্থায়ন করা হয়। ভারতের ক্ষেত্রে জিডিপিতে কেন্দ্রীয় মোট রাজস্ব সংগ্রহের হার বহু বছর ধরে কার্যত অপরিবর্তিত। এক দশক আগেও এর হার ১০ দশমিক ২ শতাংশ ছিল, চলতি অর্থবছরে তা ৯ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এসবের মানে, খরচ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভারত সরকারের হাতে সুযোগ বেশ কম। জিডিপির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আয় ও মোট ব্যয় না বাড়ার মানে, কিছু কর্মসূচিতে যদি বেশি অর্থ যায়, তবে এটি স্পষ্ট যে, অন্যগুলো কম পাচ্ছে।

কেএএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]