পানির তীব্র সংকটে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে কম্বোডিয়ায়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:৪০ পিএম, ১৪ জানুয়ারি ২০২২
ছবি: সংগৃহীত

বর্ষা এলেই মেকং নদীর অববাহিকায় অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ার চিত্র বদলে যায়। ধানচাষি স্যাম ভংসের বাড়ির উঠোন বর্ষার পানি আর প্লাস্টিকের আবর্জনায় ভরে যায়। কেননা আশপাশের নদীর পানি এসে ভরাট হয় মেকং এবং তা ‘তনলে মেকং’ হৃদে প্রবাহিত হয়ে পানি উপচে সৃষ্টি করে বন্যার। এতে ডুবে যায় বহু ঘরবাড়ি, ফসলি জমিসহ নানা স্থাপনা।

কিন্তু বছরের অর্ধেক সময় বিশেষ করে ডিসেম্বর মাস থেকে মে মাস পর্যন্ত এই অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুম থাকে। এ সময় ভংসে রাজধানী নমপেনের উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ২২০ কিলোমিটার (১৩৭ মাইল) দূরে অবস্থিত তার চোং খনিয়াসের বাড়ি থেকে চাষাবাদে এক ফোটা পানির জন্য মরিয়ে হয়ে ওঠেন।

নমপেন শহর সংলগ্ন পূর্ব-দক্ষিণে তনলে স্যাপ, তনলে মেকং ও তনলে বাসাকের মিলনস্থল। এখান থেকেই মূলত মেকং ডেলটার সূচনা, যার সমাপ্তি ঘটেছে হোচিমিন বা সায়গন শহরের দক্ষিণে দক্ষিণ চীন সাগরে। কম্বোডিয়ার সিয়েম রিপ প্রদেশ থেকে সৃষ্ট তনলে স্যাপ বা গ্রেট লেক মেকং নদীর প্রবাহে পানি সংযোগের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস। ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত এই নদীর প্রবাহের পানি দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ধাবিত হয়ে নমপেন শরের অদূরে মেকংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়। কিন্তু জুন থেকে কয়েক মাসের জন্য মেকংয়ের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় তনলে স্যাপ নদীর প্রবাহ বিপরীতমুখী হয়ে যায়।

চল্লিশ বছর বয়সী এই অঞ্চলের কৃষক ভংসে বলেন, তার জমি থেকে দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত হৃদ থেকে সেচ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই। নেই প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। তাছাড়া পানিপ্রবাহের গতিপথ বদলে যাওয়াও এর পেছনে বড় কারণ। এই কৃষক আরও বলেন, তাছাড়া পানি ভাটিতে আসার জন্য পর্যাপ্ত নয়, কারণ উজানের অন্য কৃষকরাও পানি আটকে দেয়।

jagonews24

পূর্বে ভংসে এবং তার পরিবার দুই মৌসুমে ধান চাষ করতে পারতেন। কয়েক বছর ধরে অসময়ে বৃষ্টি ও পানিপ্রবাহের পরিকাঠামো বদলে যাওয়ায় বছরে এক ফসল উৎপাদনই কঠিন হয়ে পড়েছে। ভংসে বলেন, তিনি তার ফসলের বৈচিত্র্য আনতে গত বছর মরিচ চাষ করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু গাছগুলো পানির অভাবে শুকিয়ে যায় এবং মরে যায়।

তিনি বলেন, আমাদের চাষাবাদের জন্য পর্যাপ্ত পানি নেই। যদি থাকতো তাহলে আমরা বছরে শুধু ধান নয়, পাশাপাশি আমরা অন্যান্য শাকসবজি তিন থেকে চারবার উৎপাদন করতে পারতাম।

তার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির হ্রদের পাশাপাশি বহু কৃষক তাদের জীবিকার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকির সম্মুখীন হচ্ছেন। এর কারণ হচ্ছে জমির ক্রমবর্ধমান চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী খরা এবং জলবিদ্যুৎ উন্নয়নে মূল্যবান পানির সরবরাহ হ্রাস ঘটা।

২০১৮ সাল থেকে তনলে স্যাপ হৃদের আয়তন অনেক নিচের স্তরে নেমে গেছে। মেকং রিভার কমিশনের (এমআরসি) একটি প্রতিবেদন বলছে, ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে গত বছরের মে মাসের মধ্যে পানির স্তর পরীক্ষা করে এমন ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। মেকং নদীর সম্পদের পরিচালনা ও সমন্বয়সাধনে ১৯৯৫ সালে লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম মেকং রিভার কমিশন (এমআরসি) গঠন করে। এরপর ১৯৯৬ সালে চীন ও মিয়ানমার যুক্ত হয়।

২০১৯ সালে একটি মারাত্মক খরার সম্মুখীন হয় এই অঞ্চল, যার পুরোটাই মেকং নদী ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে হ্রদের আয়তন ছিল প্রায় ছয় হাজার মিলিয়ন ঘনমিটার, যা তার গড় শুষ্ক-মৌসুমের আয়তনের এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি।

ভংসের মতো আরেক কৃষক বলেন, ২০১৯ সালের পর থেকে খরার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। পানি অভাবে আমরা বছরে দুবার ফসল ফলাতে পারছি না।

jagonews24

জানা যাচ্ছে, জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাপ পড়ছে কৃষিনির্ভর জমির ওপর। বননিধন করে বাড়িনির্মাণ ও চাষাবাদের জমি তৈরির ফলেও তৈরি হচ্ছে সংকট। মেকং নদীকেন্দ্রিক নানা সংকট তৈরি হওয়ার পেছনে চীনের বাঁধ নির্মাণও বড় কারণ বলছেন বিশ্লেষকরা। মেকংয়ের ওপর পাঁচটি বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। যেমন নুওজাডু, ঝিয়াওওয়ান-২, মানোয়ান, ডাচেসান ও ঝিংহং। থাইল্যান্ডে উবোল রাথানা বাঁধ মেকংয়ের জন্য একটি বড় বাধা। এছাড়া চীন, মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া ভবিষ্যতে আরও ১২টি বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

যখন কৃষকরা তাদের জীবিকার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ অনুভব করে, তখন তনলে স্যাপ হৃদের মৎস্যশিল্প, যা বছরে আনুমানিক পাঁচ লাখ টন মাছ উৎপাদন করে সেটিরও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। লাস্ট ডেজ অব দ্য মাইটি মেকং বইয়ের লেখক ব্রায়ান আইলার বলেন, মেকংয়ে জলবিদ্যুৎ বাঁধের পাশাপাশি কৃষকদের চাহিদা মেটানোর জন্য তৈরি করা ছোট জলাধারগুলো সরকারি অনুমোদন ছাড়াই তৈরি করা হচ্ছে, ফলে হৃদের ওপর একধরনের চাপ পড়ছে। এটি মৎস্য আহরণের ওপরই ব্যাপক প্রভাব ফেলছে।

ইউএস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের ওয়ান্ডারস অব দ্য মেকং প্রকল্পের গবেষক চেয়া সিলা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বনউজাড় ও অবকাঠামো উন্নয়নের সম্মিলিত প্রভাব হৃদের ওপর পড়ছে, যেটি কর্তৃপক্ষের সূক্ষ্ম প্রকৃতি সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এটি একটির সঙ্গে অন্যটির আন্তঃসম্পর্কিত। মানুষ যখন সংরক্ষণ না করে পানি বেশি ব্যবহার করে, পর্যাপ্ত ভূগর্ভস্থ পানির অভাব আরও ঘনীভূত হয়। ভবিষ্যতেও সারা বছর একই পরিমাণ পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

এসএনআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]