সমালোচকদের ঠিক প্রমাণ করতে মরিয়া কংগ্রেস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬:২৬ পিএম, ০৭ অক্টোবর ২০২২
‘ভারত জোড়ো যাত্রা’য় সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধী। ছবি সংগৃহীত

একদিক থেকে মনে হয়, এটি যেন ঠিক সেই প্রাচীন রূপকথার নায়কের অগ্নিপরীক্ষার মতো। গত ২ অক্টোবর ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী কর্ণাটকে যখন তার দেশবাসীকে ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা দিচ্ছিলেন, তখনই হঠাৎ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামে। সেসময় ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’র ২৫তম দিনে ছিলেন তিনি। দলকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টায় ৫৫ দিনে ভারতজুড়ে ৩ হাজার ৫৭০ কিলোমিটার পথ পায়ে হাঁটার এই কর্মসূচি শুরু করেছেন রাহুল। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, ঝড়, বৃষ্টি, রোদ- কোনো কিছুই এই যাত্রাকে থামাতে পারবে না।

কিন্তু দুর্ভাগ্য! তার ঐক্যের বার্তা নিজ দলের সদস্যদের কাছেই ঠিকমতো পৌঁছায়নি। রাহুল যখন কর্ণাটকে বৃষ্টিতে ভিজে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন দিল্লিতে চলছিল ভারতের প্রাচীনতম দলের নেতৃত্ব নিয়ে নাটকীয়তা।

jagonews24বৃষ্টিতে ভিজে বক্তব্য দিচ্ছেন রাহুল গান্ধী। ছবি সংগৃহীত

ভারতীয় কংগ্রেসে যা নিয়ে সবশেষ উত্তেজনা, সেই আইডিয়া অবশ্য খারাপ ছিল না। গত আগস্টে কংগ্রেস ঘোষণা দেয়, দুই দশকেরও বেশি সময় পরে প্রথমবারের মতো গান্ধী পরিবারের বাইরের কাউকে দলীয় সভাপতি হিসেবে বেছে নিতে নির্বাচন করা হবে। আশা করা হয়, নামের শেষে গান্ধী নেই এমন কোনো প্রতিভাবান রাজনীতিবিদ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা স্বজনপ্রীতি ও অযোগ্যতার অপবাদ মুছে দলের ভাবমূর্তি মেরামত করতে সক্ষম হবেন।

অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, ২০১৪ সালে বিজেপির উত্থানের পর থেকে ভারতের জাতীয় নির্বাচনে ৯০ শতাংশ আসন হারিয়েছে কংগ্রেস।

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে আঞ্চলিক পর্যায়ে শক্তিশালী অনেক দল রয়েছে। এরা রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিকে প্রায়ই হেসেখেলে হারিয়ে দেয়। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাব বা সাংগঠনিক শক্তি খুবই কম।

ভারতে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আর দুই বছরও বাকি নেই। এ অবস্থায় বিজেপির বিরুদ্ধে একটি বিশ্বাসযোগ্য জোটের নেতৃত্ব দিতে হলে কংগ্রেসের ক্ষমতাশালী হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ নাটকীয়তাগুলো বাদ দিলে এই মুহূর্তে দেশটিতে জাতীয় পর্যায়ে প্রভাবসম্পন্ন একমাত্র বিকল্প দল কংগ্রেস।

jagonews24মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর শশী থারুর। ছবি সংগৃহীত

শশী থারুর গান্ধী পরিবারের খুব একটা ঘনিষ্ঠ না হলেও বেশ ক্যারিশম্যাটিক নেতা, সংসদ সদস্য ও সাবেক কূটনীতিক। কংগ্রেসের সভাপতি পদে লড়তে সম্প্রতি প্রার্থীতা ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দলীয় শীর্ষপদের জন্য রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটকে চান কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী।

দলীয় নিয়ম অনুসারে, কংগ্রেস সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার আগে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হতো গেহলটকে। কিন্তু এতে তীব্র আপত্তি জানান তার রাজ্যের আইনসভার সদস্যরা। শেষপর্যন্ত গত ২৯ সেপ্টেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন গেহলট। গান্ধীদের চারপাশে বসগিরি করার পরিবর্তে নিজের বর্তমান কাজ ধরে রাখাকেই বেছে নেন তিনি।

jagonews24সোনিয়া গান্ধী ও অশোক গেহলট। ছবি সংগৃহীত

প্রতিযোগিতা থেকে অশোক গেহলটের আকস্মিক প্রস্থানে শীর্ষপদের উত্তরাধিকার কে হচ্ছেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়ে যায়। যদিও কংগ্রেস থেকে জোর দিয়ে বলা হচ্ছে, দলের নেতৃত্ব কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন করে না। তবে কয়েকজনের সন্দেহ, গান্ধীদের কাছের লোক ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ নেতা মল্লিকার্জুন খারগে আগামী ১৭ অক্টোবর শশী থারুরের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং সম্ভবত জিতবেনও।

রাহুল গান্ধী নিজে দলের নেতৃত্বের ভার কাঁধে তুলে নিতে নারাজ। ২০১৯ সালে নিজের আসনে হেরে যাওয়ার পর তিনি কংগ্রেস সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং এই দায়িত্ব আবারও মা সোনিয়া গান্ধীর হাতে ফিরিয়ে দেন। তবে এরপর থেকে রাজনৈতিক প্রতিভা লালনপালন করা বা একটি কার্যকর দলীয় ব্যবস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছেন রাহুল। এমনকি, প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দলীয় সভাপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতেও নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করেননি তিনি।

jagonews24রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খারগে। ছবি সংগৃহীত

গত ২ অক্টোবর মল্লিকার্জুন খারগে শশী থারুরের উদ্দেশ্যে বলেছেন, দলে একজন ‘ঐকমত্যের প্রার্থী’ খুঁজে পাওয়াটাই হবে সবচেয়ে ভালো। এর মাধ্যমে তিনি মূলত শশীকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। গান্ধীদের কেউ তার এ কথার বিরোধিতা করেননি। পরের দিন কংগ্রেসের এক জ্যেষ্ঠ নেতা অনলাইন সংবাদমাধ্যম ওয়্যারকে বলেছেন, বিজয়ী যেই হোন না কেন, তিনি রাহুল গান্ধীর তুলনায় ‘কম নেতা’ হবেন।

কংগ্রেসের এই প্রহসন আরও কয়েকদিন চলবে। নরেন্দ্র মোদী ও তার সমর্থকরা অন্তত এ থেকে হাসির খোরাক পাবেন। তবে ভারতের যেসব মানুষ একটি কার্যকর বিরোধী দল দেখতে চান, তাদের জন্য হয়তো এটি কংগ্রেসে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ট্র্যাজেডির আরেকটি অংশ হতে চলেছে মাত্র।

সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট
কেএএ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।