একতার সর্বজনীন ভাবনা প্রসারে ভারতের জি-২০ সভাপতিত্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৩৬ এএম, ০১ ডিসেম্বর ২০২২
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ফাইল ছবি

জি২০–র আগের ১৭টি সভাপতিত্বের সময়কাল অন্য ফলাফলগুলোর মধ্যে ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, যুক্তিগ্রাহ্য আতর্জাতিক কর ব্যবস্থা, দেশগুলোর ওপর থেকে করের বোঝা কমানো সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ফল দিয়েছে। এসব অর্জিত ফলাফল থেকে আমরা লাভবান হবো এবং এগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের আরও এগিয়ে নেবো।

যাই হোক না কেন, ভারত যেহেতু এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছে, আমি নিজেকে জিজ্ঞাসা করেছি- এখনো কি জি২০-র আরও অগ্রগতি হতে পারে? গোটা মানবজাতির কল্যাণে আমাদের মানসিকতার পরিবর্তনকে এমন একটি পর্যায়ে উন্নীত করতে পারি না, যা অনুঘটকের ভূমিকা পালন করবে? আমি বিশ্বাস করি, আমরা পারি।

আমাদের পরিস্থিতি দিয়েই আমাদের মানসিকতা তৈরি হয়। ইতিহাসজুড়ে মানবসভ্যতাকে অভাবের মধ্যে বাস করতে হয়েছে। আমরা সীমিত সংস্থানের জন্য লড়াই করেছিলাম। কারণ আমাদের বেঁচে থাকা নির্ভর করতো অন্যদের সেই সংস্থানের অধিকারকে অস্বীকারের মাধ্যমে। ভাবনা, আদর্শ ও ব্যক্তি পরিচয়ের মধ্যে সংঘাত এবং প্রতিযোগিতা আদর্শ হয়ে উঠেছিল।

দুর্ভাগ্যবশতঃ আজও আমরা সেই একই শূন্য মানসিকতার ফাঁদে আটকে রয়েছি। দেশগুলো ভূখণ্ড ও সম্পদ নিয়ে লড়াই করতে দেখছি। অস্ত্র দেখিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যসামগ্রী। কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও মুষ্টিমেয় কয়েকজন প্রতিষেধক মজুতদার হয়ে ওঠার সময় আমরা এটি দেখতে পারি।

কেউ কেউ এর বিরোধিতা করতে পারেন এই বলে যে, সংঘাত ও লোভ মানুষের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। আমি এর সঙ্গে একমত নই। মানুষ যদি সহজাতভাবেই স্বার্থপর হতো, তাহলে আমাদের মৌলিক এককত্বের প্রচারে এই বিপুল সংখ্যক পারলৌকিক ঐতিহ্যের যে দীর্ঘস্থায়ী আবেদন, সেটার ব্যাখ্যা কী?

পঞ্চতত্ত্ব- ভারতে জনপ্রিয় এমনই একটি মতবাদ যা বিশ্বাস করে, সব জীবিত সত্তা এমনকি সব নির্জীব পদার্থও মৃত্তিকা (পৃথিবী), জল, আগুন, বায়ু ও স্থান (স্পেইস)– এই পাঁচটি মৌলিক উপাদানে নির্মিত। আমাদের শারীরিক, সামাজিক ও পরিবেশগত মঙ্গলের জন্য প্রত্যেকের ভেতরে এই উপাদানগুলোর সমন্বয় অপরিহার্য।

ভারতের জি-২০ সভাপতিত্ব এই বিশ্ব একতার ভাবনাকে প্রচার করার জন্য কাজ করবে। এ কারণে আমাদের মূলভাব হলো- ‘এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক ভবিষ্যৎ’। এটি শুধু একটি বুলি বা স্লোগান নয়। যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বর্তমানে মানবজাতি এগিয়ে চলেছে, সাম্প্রতিককালে তার কিছু কিছু পরিবর্তন অবশ্যই ঘটেছে যা আমরা সার্বিকভাবে অনুভব বা উপলব্ধি করতে পারিনি।

আজ আমাদের কাছে পৃথিবীর সব মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদনের সংস্থান রয়েছে। আমাদের টিকে থাকার জন্য লড়াই করার দরকার নেই। আমাদের যুগে যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। অবশ্যই কোনো যুদ্ধের প্রয়োজন নেই।

আজ আমরা সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তা হলো জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ ও মহামারি। পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে এই চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলায় আমরা সফল হতে পারবো না। ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাওয়ার মধ্য দিয়েই এগুলোর সমাধান সম্ভব।

সৌভাগ্যবশত, আজকের প্রযুক্তি আমাদের বিস্তৃত আকারে মানবজাতির সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার পথও প্রদর্শন করে। আমরা আজ যে বিশাল ভার্চুয়াল বিশ্বে বসবাস করি তা ডিজিটাল প্রযুক্তির বিন্যাসকে প্রদর্শন করে। মানবজাতির ছয় ভঅগের এক ভাগেরবাসভূমি হলো ভারত। ভাষা, ধর্ম, রীতি-নীতি ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের ক্ষেত্রে এখানে বৈচিত্র্যের অভাব নেই। তাই, ভারতকে একটি ছোটখাটো বিশ্বসংসার বললেও অত্যুক্তি হয় না।

সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার এক প্রাচীনতম ঐতিহ্যের দেশ হল ভারত। সেই অর্থে গণতান্ত্রিক মতাদর্শের ডিএনএ-র সন্ধান পাওয়া যাবে ভারতেই। ‘গণতন্ত্রের জননী’ হিসেবে ভারতের জাতীয় সচেতনতা কঠোর নির্দেশে চালিত নয়. বরং একই সুরে লাখ-লাখ স্বাধীন কণ্ঠের সমন্বয়ের মাধ্যমে চালিত।

ভারত আজ দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি দেশ। দেশের প্রান্তিক নাগরিকদের অভাব, অভিযোগ ও প্রয়োজনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা। একই সঙ্গে, তরুণ প্রজন্মের মেধা ও প্রতিভাকে উৎসাহিত করে তাঁদের সৃজনশীলতার আবেগকে আমরা কাজে লাগিয়েছি।

আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য শুরু হয় নাগরিকদের জন-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সাধারণ নাগরিকদের কল্যাণকেই আমরা অগ্রাধিকার বলে মনে করি। সাধারণের স্বার্থে প্রযুক্তিকে সম্বল করে আমরা এমন কিছু ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি যা একাধারে মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। সামাজিক সুরক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ইলেক্ট্রনিক ব্যবস্থায় লেনদেনের ক্ষেত্রে তা এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। এসব কারণে সম্ভাব্য বৈশ্বিক সমস্যাগুলো সমাধানের পথ দেখাতে পারে ভারতের অভিজ্ঞতা।

জি-২০-র সভাপতিত্বকালে ভারতের শিক্ষা, অভিজ্ঞতা ওউন্নয়নের মডেলগুলোকে আমরা অন্যদের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করবো। বিশেষত, উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাছে তা অনুসরণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।

জি-২০-র সভাপতিত্বকালে অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলো আমরা চিহ্নিত করবো শুধু জি-২০ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমেই নয়, সেইসঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিতে যারা সফর করতে আসবেন, তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেও। কারণ, এ দেশ সফরে আসা পর্যটকদের কথা অনেক সময়েই আমাদের কানে এসে পৌঁছায় না।

তবে, এক ‘অভিন্ন পৃথিবী’ গড়ে তোলাই যে আমাদের অগ্রাধিকারের একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠতে চলেছে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এক ‘অভিন্ন পরিবার’-এর সঙ্গে সম্প্রীতির সম্পর্ক সৃষ্টি করাই হবে আমাদের লক্ষ্য। তবেই এক ‘অভিন্ন ভবিষ্যৎ’-এর আশার বাণী আমরা পৌঁছে দিতে পারব সকলের কাছে।

আমাদের গ্রহের নিরাময়ের জন্য আমরা প্রকৃতির প্রতি বিশ্বস্ততার জন্য ভারতের ঐতিহ্যর ওপর ভিত্তি করে স্থিতিশীল ও পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রাকে উৎসাহ জোগাবো। মানবজাতির মধ্যে সম্প্রীতির প্রসারে বিশ্বের সবখানে খাদ্য, সার ও চিকিৎসার সাজ-সরঞ্জামের জোগানকে রাজনীতির কবল থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাবো। ভূ-রাজনৈতিক দ্বিধা-দ্বন্দ ও টানাপোড়েন যেন কখনোই মানবজাতির কাছে সংকটজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি না করতে পারে, তা নিশ্চিত করাই হবে আমাদের লক্ষ্য। কোনও একটি পরিবারে যার বা যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, স্বাভাবিকভাবেই আমরা সেদিকেই প্রথমে নজর দেই।

আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মগুলোর মধ্যে আশাকে আরও সজীব করে তুলতে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আমরা খোলামেলা আলোচনাকে উৎসাহ দিয়ে যাবো। অস্ত্রের যথেচ্ছ ব্যবহার যেন কমিয়ে আনা যায় এবং বিশ্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেই লক্ষ্যে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবো।

জি-২০-র সভাপতিত্বকালে আমাদের সব কয়টি কর্মসূচিই হয়ে উঠবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, অন্তর্ভুক্তিমূলক, কর্মপ্রচেষ্টা-কেন্দ্রিক এবং সুনির্দিষ্ট।
আসুন, আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করি ভারতের জি-২০-র সভাপতিত্বের সময়কালকে সার্বিক কল্যাণ, সম্প্রীতি ও আশার এক বিশেষ সময়কালরূপে তুলে ধরার।

লেখা: নরেন্দ্র মোদী, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী

এসএএইচ/কেএএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।