নিখোঁজের ঘটনায় তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে বলেছে পিবিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৪১ এএম, ২২ জানুয়ারি ২০১৮
নিখোঁজের ঘটনায় তিন বিষয়ে গুরুত্ব দিতে বলেছে পিবিআই

সাতক্ষীরায় হোমিও চিকিৎসক মোকলেসুর রহমান জনির নিখোঁজের বিষয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেছে। রোববার হাইকোর্টের বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে এই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস বলেন, এ প্রতিবেদন রোববার আমরা দাখিল করেছি। এ বিষয়ে আদেশের জন্য ২৩ জানুয়ারি মঙ্গলবার পরবর্তী দিন ঠিক করা হয়েছে।

আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়, সাতক্ষীরার হোমিও চিকিৎসক মোকলেসুর রহমান জনির নিখোঁজ কিংবা অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো মামলা বা জিডি না নেয়ার মাধ্যমে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে চরম অদক্ষতা এবং অবহেলার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, যা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য মোটেই কাম্য নয়।

এতে বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক কাউকে গ্রেফতার করা হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কর্তব্য যথাসময়ে তাকে আদালতে উপস্থাপন করা। আর নিখোঁজের এ কাজটি কোনো অপরাধী চক্রের হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব আরো বেশি। ভিকটিম ও অপরাধী চক্র উভয়কে খুঁজে বের করে আদালতে উপস্থাপন করার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। মানুষ নিখোঁজের অভিযোগ অস্বীকার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার দায় এড়াতে পারে না।

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‌‘সার্বিক অনুসন্ধানে ও থানার রেকর্ডপত্রসহ (জিডি ও হাজত রেজিস্ট্রার) দালিলিক সাক্ষ্য এবং সাক্ষীদের জবানবন্দি পর্যালোচনায় গত ৪ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে জনি নামের কোনো ব্যক্তিকে সাতক্ষীরা থানা পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার পূর্বক আটক রাখা এবং পরবর্তীতে নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে এমন কোনো তথ্য বা সাক্ষ্য-প্রমাণাদি পাওয়া যায়নি। মৌখিক সাক্ষ্য অনুযায়ী ভিকটিমকে এসআই হিমেল কর্তৃক থানায় আনার বিষয়টি প্রকাশিত হলেও এ সব সাক্ষীরা হলো অভিযোগকারী কর্তৃক উপস্থাপিত সাক্ষী। কোনো নিরপেক্ষ সাক্ষী দ্বারা থানায় আনার বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি। থানায় রক্ষিত সব রেজিস্ট্রার পর্যালোচনাকালেও থানা হেফাজতে ভিকটিমকে রাখার বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায় না। ফলে ওই এসআই হিমেল কর্তৃক ভিকটিমকে গ্রেফতারপূর্বক থানা হেফাজতে রাখার বিষয়টি অস্পষ্ট।’

ফলে জনির নিখোঁজের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত না-কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কোনো অপরাধীচক্র এ ঘটনা ঘটিয়েছে তার প্রমাণ করা যায়নি। সদর থানার তৎকালীন ওসি মো. এমদাদুল হক শেখের পরবর্তী ওসি ফিরোজ হোসেন মোল্লা তার সময়কালে অভিযোগের বিষয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় নিখোঁজ জনির প্রকৃত অবস্থান জানার আরও একটি সুযোগ নষ্ট হয়েছে মর্মে কমিটির নিকট অনুমেয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য কর্ম (মামলা/জিডি/তদন্ত/অনুসন্ধানকরনসহ) যথাযথভাবে পালন না করায় আজ অবধি নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত ঘটনাটি যেমনিভাবে উদঘাটিত হয়নি তেমনিভাবে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।

ফলে এ ঘটনায় সদর থানা পুলিশের যেসব সদস্য দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে চরম অদক্ষতা এবং অবহেলা করেছে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, কোনো মানুষ নিখোঁজ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কোনো অপরাধী চক্র কর্তৃক আটক হবার অভিযোগ উত্থাপিত হলে সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে তিনটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন তা হলো: (১) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে কোনো অপরাধীচক্র অপরাধ সংঘটন করেছে কি না?

(২) অভিযোগটি বানোয়াট নাকি কাউকে ফাঁসানোর জন্য মিথ্যা ঘটনা

(৩) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্যের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না?

পিবিআই প্রতিবেদনে বলেছে, সাধারণত এ জাতীয় অভিযোগ উত্থাপিত হলে প্রথমে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ হতে তার দায় অস্বীকার করা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কেবল এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেই কি তার দায় এড়াতে পারে? উত্তর হলো-না।

তবে এ ধরনের নিখোঁজের অভিযোগ মিথ্যা কিংবা বানোয়াট হলে তা প্রমাণ করার দায়িত্বও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বর্তায়। তাই এ ধরনের (জনি) নিখোঁজ কিংবা অভিযোগের ক্ষেত্রে কোনো মামলা বা জিডি না নেয়ার মাধ্যমে সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে চরম অদক্ষতা এবং অবহেলার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য মোটেই কাম্য নয়।

এর আগে মোকলেসুর রহমান জনির খোঁজ না পেয়ে তার স্ত্রী জেসমিন নাহার হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস রিট আবেদন করেন। ওই রিটের শুনানিতে পুলিশ ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের পর পিবিআই তদন্ত করে। হাইকোর্টের নির্দেশে পুলিশের আইজির চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পিবিআইয়ের (খুলনা বিভাগ) বিশেষ পুলিশ সুপার নওরোজ হাসান তালুকদারকে প্রধান করে কমিটি করা হয়। সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার, সদর থানার ওসিসহ ৩৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে কমিটি।

এফএইচ/জেডএ