ধর্ষণের আলামতের রিপোর্ট ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেয়ার নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:৫৫ পিএম, ২৭ মে ২০১৮

ধর্ষণের ঘটনায় ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় দ্রুত মামলার পর আলামত পরীক্ষার শেষে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বাড্ডার গারো তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্টসহ পাঁচটি সংগঠনের করা এক রিট মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্টের বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই নির্দেশনা দিয়েছেন।

পূর্ণাঙ্গ রায়টি গত এপ্রিল মাসে প্রকাশ করা হলেও সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে, রিট সংশ্লিষ্ট আইনজীবী শারমিন আক্তার বিষয়টি আজ রোববার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

আইনজীবী জানান, ধর্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে কোনো থানায় মামলা করা যাবে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে মামলা দায়েরের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাতে হবে। এছাড়াও ধর্ষণের শিকার নারীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, ডিএনএ টেস্ট এবং কাউন্সেলিং সহায়তা প্রদানের জন্য প্রতি মেট্রোপলিটান এলাকায় একটি করে অফিস স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দেয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশ করা রায়ে ধর্ষণ মামলা ও তদন্তের বিষয়ে হাইকোর্ট ১৮ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন আইন না হওয়া পর্যন্ত এই নীতিমালা অনুসরণের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আদালতের নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে- ধর্ষণের অভিযোগ এবং অন্যান্য যৌন নিপীড়নের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্য যত দ্রুত সম্ভব সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিখে ফেলবেন। এ ধরনের তথ্য পাওয়ার পরপরই কর্তব্যরত পুলিশ অফিসারকে ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারকে জানাতে হবে।

রায়ে আরও বলা হয়েছে, এ ধরনের ঘটনার জন্য একটি আলাদা ওয়েবসাইট খুলতে হবে। যাতে অভিযোগকারী অনলাইনে তার অভিযোগ নিবন্ধন করতে সক্ষম হন। ধর্ষণের শিকার নারীদের সহায়তার জন্য সমাজকর্মীদের একটি তালিকা করতে হবে। ধর্ষণের শিকার প্রত্যেকের পরিচয় গোপন রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, ধর্ষণের শিকার নারীদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, ডিএনএ টেস্ট এবং কাউন্সেলিং সহায়তা প্রদানের জন্য প্রতি মেট্রোপলিটান এলাকায় একটি করে অফিস স্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

৪০ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত আরও বলেছেন, ‘সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া কোনো পুলিশ অফিসার যদি অভিযোগ গ্রহণে বিলম্ব করে তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুনির্দিষ্ট বিধান থাকতে হবে। প্রত্যেক থানায় কনস্টেবলের নিচে নয় এমন একজন নারী পুলিশ রাখতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর ডিউটি অফিসার একজন নারী কর্মকর্তার (দায়িত্বপ্রাপ্ত) মাধ্যমে ও ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য, শুভাকাঙ্ক্ষী, সমাজকর্মী বা আইনজীবীর উপস্থিতিতে অভিযোগ রেকর্ড করবেন।’

অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দেওয়া অধিকার সম্পর্কে ভুক্তভোগীকে সচেতন করতে হবে এবং সে চাইলে যেকোনো তথ্য প্রদান করতে হবে। ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার কোনও নারী বা মেয়ে করণীয় সম্পর্কে বুঝতে অক্ষম হলে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

নির্দেশে আরও বলা হয়, লিখিত তথ্য গ্রহণের পর কোনোপ্রকার বিলম্ব না করে তদন্তকারী কর্মকর্তা ভুক্তভোগীকে একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রেরণ করবেন। ভুক্তভোগীর দ্রুত সেরে উঠতে ভিক্টিম সাপোর্ট সেন্টারে সার্বক্ষণিক প্রয়োজনীয় সুবিধা থাকতে হবে।

ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নমূলক সকল ঘটনায় বাধ্যতামূলকভাবে ডিএনএ পরীক্ষা করাতে হবে। অভিযোগ প্রাপ্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ডিএনএসহ অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করে তা ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবে পাঠাতে হবে। যেকোনো রিপোর্ট সংগ্রহ বা স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থার যেকোনো ব্যর্থ শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে।

আদালত আরও বলেছেন, নারী ও শিশুদের উপর সংঘটিত অপরাধের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও ওয়েব সংবাদমাধ্যমে প্রচারণা চালাতে হবে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আইন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এই নীতিমালা মেনে চলতে হবে।

আদালতের রায়ের সুপারিশ, পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনার আলোকে নীতিমালা তৈরি করতে আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ মহাপরিদর্শককে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

২০১৫ সালের ২১ মে রাতে গণধর্ষণের শিকার হন এক গারো তরুণী। ওই ঘটনায় মামলা দায়ের করতে বেশ বেগ পেতে হয় তাকে। এ ঘটনায় পৃথক পাঁচটি মানবাধিকার সংগঠন বাদী হয়ে জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট করে। ওই রিটের শুনানি নিয়ে বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের বেঞ্চ রুল জারি করেন। পরে রুলের শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি রায় দেন আদালত।

এফএইচ/জেএইচ/এমএস