মানবতাবিরোধী অপরাধ : পিরোজপুরের ৭ জনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন চূড়ান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:১৫ পিএম, ০৬ নভেম্বর ২০১৮

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠিত মানবতাবিরোধী আপরাধের অভিযোগে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার আব্দুল মান্নান ওরফে মান্নানসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে প্রকাশ করেছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মঙ্গলবারই এই প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে জমা দেয়া হবে।

তদন্ত প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে ৪টি অভিযোগ আনা হয়েছে। তার মধ্যে ২৪ জনকে হত্যা এবং একজনকে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল এসব অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়ে সোমবার (৫ অক্টোব ‘২০১৮) প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার আব্দুল মান্নান হাওলাদার ওরফে আব্দুল মান্নান ডিলার ওরফে মান্নান (৭৫) ছাড়া বাকি আসামি হলেন- আজাহার আলী হাওলাদার ওরফে আজু মুন্সী (৮৮), আশ্রাব আলী ওরফে আশরাফ আলী হাওলাদার (৬৭) এবং মো. মহারাজ হাওলাদার ওরফে হাতকাটা মহারাজ (৬৮)। তবে এ মামলার আরও ২ আসামি এখনও পলাতক থাকায় তাদের নাম প্রকাশ করেনি তদন্ত সংস্থা।

এছড়াও একই এলাকার মো. ফজলুল হক হাওলাদার (৭৫) কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক থাকাবস্থায় গত ৩০ অক্টোবর মারা যান।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে তদন্ত সংস্থার কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল (এমএ) হান্নান খান সাংবাদিকদের এই তথ্য জানান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এম সানাউল হক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) মো. বদরুল আলম।

আব্দুল হান্নান খান বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার ৭ আসামির বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের ১২ এপ্রিল থেকে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তা মো. বদরুল আলম তদন্ত শুরু করেন।

এরপর আজ (৬ নভেম্বর) এ মামলার তদন্ত শেষ হয়। তদন্তে ৩৩ জনকে সাক্ষি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধ আটক, নির্যাতন, অপহরণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, হত্যা ও গণহত্যার মোট ৪টি অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগগুলো হলো-

প্রথম অভিযোগ- ১৯৭১ সালের ৪ জুন পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থানার ৩নং ধাওয়া ইউনিয়নের পূর্ব পশারিবুনিয়া গ্রামে পাকহানাদার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে আসামিরা হামলা চালিয়ে হিন্দু সম্প্রদায় ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিরীহ, নিরস্ত্র মুকুন্দু বিহারী মল্লিক ওরফে ধূলাইড্যা, চিত্ত রঞ্জন বেপারী, সতিশ চন্দ্র বেপারী, শরৎ চন্দ্র মাঝি, রসিক ঘরামী, উপেন্দ্র নাথ মিস্ত্রি এবং অনন্ত চাষীকে অবৈধভাবে আটক ও অপহরণ পূর্বক গুলি করে হত্যা এবং আনুমানিক ৪০/৪৫টি বাড়ির মালামাল লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়।

দ্বিতীয় অভিযোগ- ১৯৭১ সালের ১৬ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমর্থক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের হিন্দু সম্প্রদায়কে ধ্বংস করার লক্ষ্যে চরখালী গ্রামে হামলা চালিয়ে অমূল্য রতন হাওলাদারের বাড়ি থেকে স্বর্ণ, গহনা ও মূল্যবান মালামাল লুট। একই সঙ্গে রতন হাওলাদারকে আটক করে ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এছাড়াও আসামিরা সুরেন হাওলাদারের বাড়িতে লুটপাট ও তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে।

তৃতীয় অভিযোগ- ১৯৭১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর শিয়ালকাঠী ইউনিয়নের চরখালী গ্রামে মনোরঞ্জন মিস্ত্রীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে ও তার বড় ভাই চন্দ্র কান্ত মিস্ত্রীকে আটক, নির্যাতন ও অপহরণ পূর্বক হত্যার উদ্দেশে গুলি করার সময় ২০০টাকার বিনিময়ে আসামিরা তাদের মুক্তি দেন।

চতুর্থ অভিযোগ- ১৯৭১ সালের ২৭ অক্টোবর সশস্ত্র রাজাকারসহ পিরোজপুর জেলা সদরের সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে সে সময়ে স্থাপিত আর্মি ক্যাম্পে থেকে স্থানীয় হিন্দুদের ধ্বংস করার লক্ষ্যে ভান্ডারিয়া থানার মিয়ালকাঠী ইউনিয়নের তিনটি গ্রামে ধারাবাহিকভাবে হামলা করা হয়। সে সময় সত্যরঞ্জন হালদারসহ হিন্দু সম্প্রদায়ের ১৭ জনকে অবৈধভাবে আটক, অপহরণ ও গুলি করে হত্যা করে। এর মধ্যে গুনমনি মিস্ত্রি নামে একজনকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। আসামিদের গুলিতে ৩ জন শরীরে এবং এক নারী স্তনে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তাদের মধ্যে দুই ব্যক্তি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। সে সময় আসামিরা শতাধিক বাড়ির মালামাল লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে।

এসব আসামির প্রত্যেকেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় কনভেনশন মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন। বর্তমানে তারা জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থক।

এমএইচএম/এসএইচ/এমএমজেড/এমএস/জেআইএম