তাবলিগ কেন আইনের গাইডলাইন নিয়ে চলবে : হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:১৫ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০১৯

তাবলিগ জামাত সম্পর্কে হাইকোর্ট বলেছেন, ইসলামের প্রচার এবং প্রসার করা (তাবলিগ) একটি মহৎ কাজ। আপনাদের কেন আইনের গাইডলাইন নিয়ে চলতে হবে?

আদালত আরও বলেন, আপনারা তো আল্লাহর ভয়ে একনিষ্ঠ হয়ে থাকার কথা। আপনারা মারামারি করলে সাধারণ মানুষ কী ভাববে? দেশের মসজিদে মসজিদে তো থাকতে দেবে না। মানুষের কাছে কী জবাব দেবেন। আপনারা আরও শুদ্ধ হোন। নিজেদের মধ্যে মারামারির পর বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে আদালত পর্যন্ত আসা কী ঠিক বলেও মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।

এরপর তাবলিগ জামাত নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে প্রচলিত সমস্যার সমাধান করে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে সকলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান হাইকোর্ট।

ইজতেমা আয়োজনে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে দায়ের করা রিটের শুনানিতে মঙ্গলবার বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এমন মন্তব্য করেন। পরে আদালত এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ২৭ জানুয়ারি দিন ঠিক করেন। এর মধ্যে তাবলিগের নেতৃত্ব নিয়ে দুই পন্থীদের আলোচনায় কী সিদ্ধান্ত হয় সেটি দেখবেন বলেও জানান আদালত।

রিটের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী মো. ইউনুস মোল্লা ও অ্যাডভোকেট শাহ মো. নুরুল আমিন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।

মঙ্গলবার বেলা ২টা ৩০ মিনিটের দিকে এই রিটের শুনানি শুরু হলে আদালত রিটকারী আইনজীবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তাবলিগ জামাতের কাজ কর্মে এখন কোন বাধা আছে কি-না?

আদালতকে তখন আইনজীবী শাহ মো. নুরুল আমিন বলেন, গত ২৪ সেপ্টেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে যে পরিপত্র জারি করেছে তাতে বাধা আছে।

এ সময় আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি বলেন, ইসলামের প্রচার এবং প্রসার করা (তাবলিগ) একটি মহৎ কাজ। আপনাদের (তাবলিগকারীদের) কেন আইনের গাইডলাইন নিয়ে চলতে হবে?

আদালত আরও বলেন, আপনারা তো আল্লাহর ভয়ে একনিষ্ঠ হয়ে থাকার কথা। আপনারা মারামারি করলে সাধারণ মানুষ কী ভাববে? দেশের মসজিদে মসজিদে গিয়ে তো থাকতে দেবে না। মানুষের কাছে কী জবাব দেবেন? আপনারা আরও শুদ্ধ হন।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর মতামত জানতে চাইলে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু আদালতকে বলেন, তাবলিগের মধ্যে দুইটা গ্রুপ আছে। আলোচনায় একটা গ্রুপ আসলে আরেক গ্রুপ আসে না। আগামীকালও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আশা করছি দুইপক্ষ একমত হলে আগের মতো ইজতেমা করতে পারবে। আর একমত না হলে পূর্বের নোটিশ অনুযায়ী পৃথক পৃথকভাবে তাবলিগের কাজকর্ম পালন করবেন।

এ সময় আদালত রিটকারী আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা তো চান সবাই এক সঙ্গে ইজতেমা পালন করতে।

তখন রিটকারী আইনজীবী ইউনুস মোল্লা বলেন, গত ১৮ সেপ্টেম্বরের পরিপত্র অনুযায়ী আলাদা আলাদা কাজ কর্ম হলে সমস্যা নাই। তাতে শৃঙ্খলাও থাকবে।

তিনি বলেন, ‘মাওলানা সাদ তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ধর্মীয় শিক্ষা বা ধর্মীয় প্রচারণা অর্থের বিনিময়ে করা উচিত নয়। মিলাদ বা ওয়াজ মাহফিলের মতো কর্মকাণ্ডও এর মধ্যে পড়ে। মাওলানা সাদের এ বক্তব্য ভুল ব্যাখ্যা করে একটা গ্রুপ মাদরাসা ছাত্রদের উত্তেজিত করেছে। তারা সা’দ কে মানেও না, এমনকি কাউকে মানতেও দেয় না।’

এ সময় আদালত বলেন, নিজেদের মধ্যে বিভ্রান্তি থাকলে ভালো হবে না। কীভাবে থাকলে ভালো হবে সেটা আপনারাও জানেন।

রিটকারী আইনজীবী বলেন, তাবলিগ জামাতে কোনো কমিটি নেই। ১১ জন শুরা সদস্য নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ৬ জন একদিকে আর ৫ জন আরেকদিকে।

তখন আদালত বলেন, মন নরম করে আলোচনা করেন, শক্ত মন নিয়ে আলোচনা করে ফলপ্রসূ হবে না। আল্লাহর ভয়ে মন নরম করে একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নেন। একসঙ্গে বসে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সকলে মিলে ইজতেমা করেন। এতে সবার ও দেশের ভাবমূর্তিও রক্ষা পাবে।

টঙ্গীর ময়দানে তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে ২১ জানুয়ারি হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন আইনজীবী ইউনুছ মোল্লা। আজ ওই রিটের আংশিক শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।

রিটে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, উপ-সচিব, সিনিয়র সহকারী সচিবসহ তিনজনকে বিবাদী করা হয়েছে।

পরে রিটকারী জানিয়েছেন, তাবলিগ জামাতের ভেতর দুটি পক্ষের দ্বন্দ্ব চলছে বেশ কিছু দিন ধরে। এ দ্বন্দ্ব সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। এ কারণে গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করে বাংলাদেশ দাওয়াতে তবলিগের কার্যক্রম সুষ্ঠু, সুন্দর ও সুশৃঙ্খলরূপে পরিচালনার জন্য কিছু নির্দেশনা দেন। কিন্তু এ পরিপত্র জারির ছয় দিন পরই আরেকটি পরিপত্র জারি করে প্রথম পত্রের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। যা সম্পূর্ণ বেআইনি উল্লেখ করে এ রিট দায়ের করা হয়েছে বলে জানান আইনজীবী।

প্রসঙ্গত তাবলিগ জামাতের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রথম প্রকাশ্য রূপ পায় ২০১৭ সালে। এরপর গত বছর এই দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে। যার ফলে এ বছর বিশ্ব ইজতেমাও বন্ধ রাখা হয়েছে।

এফএইচ/এসএইচএস/এমএস/এসজি