কাঁদলেন বিচারপতি

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৪ পিএম, ১৯ মে ২০১৯

মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির বয়স নিরূপণ সংক্রান্ত্র বিষয়ে সরকারের কয়েকটি পরিপত্র ও গেজেট অবৈধ ও বেআইনি ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সাড়ে ১২ বছর বয়স নির্ধারণ সংবিধানের প্রস্তাবনা ও সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে স্থান পাওয়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এছাড়া রায়ে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট আইন- ২০১৮ এর ২ এর ১১ ধারা অনুযায়ী, বয়সসীমা বেঁধে দেয়ার মাধ্যমে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার’ সংজ্ঞায়িত-কে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন আদালত।

আরও পড়ুন >> মুক্তিযোদ্ধাদের বয়সের ফ্রেমে বাঁধা যায় না : হাইকোর্ট

রায়ে বলা হয়, শহীদুল ইসলাম লালু একজন বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১০ বছর। তার ছবি রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। কিন্তু বয়স নির্ধারণ করে দেয়ায় তার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়। ফলে, তাকে যে অবজ্ঞার শিকার হতে হয়েছে, এটা মেনে নেয়া যায় না।

আদালত বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স সাড়ে ১২ বছর বয়স নির্ধারণ সংবিধানের প্রস্তাবনা ও সংবিধানের পঞ্চম তফসিলে স্থান পাওয়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

রোববার সকাল সোয়া ১১টার দিকে রায় ঘোষণা শুরু হয়ে চলে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা। রায় ঘোষণার একপর্যায়ে এসে রায় ঘোষণাকারী হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ কেঁদে ফেলেন। রায়ের শেষের অংশ পাঠ করছিলে তিনি।

ঘড়ির কাটায় তখন দুপুর ১২টা ১৫ মিনিট। রায়ের এ অংশে তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাটি পড়ছিলেন। পড়ার মাঝে হঠাৎ একটু থেমে যান এ বিচারপতি। তারপর বলেন, ‘আমি একটু ইমোশনাল হয়ে গেছি। আমার মনে হয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৬ মার্চ ভোর বেলায় দেয়া স্বাধীনতার ঘোষণাটি পড়লে যে কেউই আবেগপ্রবণ হয়ে যাবেন।’

এ সময় অশ্রুশিক্ত চোখ মুছতে দেখা যায় বিচারপতি শেখ হাসান আরিফকে। উপস্থিত রিটকারী, রাষ্ট্রপক্ষ ও অন্যান্য আইনজীবীদের মধ্যে তখন পিনপতন নীরবতা।

রোববার হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন এ বি এম আলতাফ হোসেন, ওমর সাদাত, তার সঙ্গে সেলিনা আকতার ও আয়েশা আকতার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মুখলেছুর রহমান।

highcort-2

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোলে বীর কিশোর মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম লালু

রায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে জারি করা সরকারের গেজেট এবং এ সংক্রান্ত আইনের ধারা অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে, আবেদনকারী মুক্তিযোদ্ধাদের বকেয়াসহ বন্ধ থাকা ভাতা পরিশোধ বা চালু করার জন্য বলেন আদালত। রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে এ আদেশ কার্যকরেরও নির্দেশনা দেয়া হয়।

আরও পড়ুন >> মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়স নিয়ে জারি করা পরিপত্র অবৈধ : হাইকোর্ট

‘বয়সের সীমা দিয়ে নয়, ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে’ রায়ে উল্লেখ করা হয় বলে জানান রিটের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর সাদাত। তিনি সাংবাদিকদের আরও জানান, এ রায়ের ফলে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বয়সের ফ্রেম দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা নির্ধারণ করা যাবে না।

রায়ে আদালতে আরও বলেন, ‘শহীদুল ইসলাম লালু একজন বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১০ বছর। তার ছবি রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। সেখানে সরকার কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির জন্য ১২ বা ১৩ বছর বয়স নির্ধারণ করে গেজেট করেন?’

‘বয়স নির্ধারণ করে দেয়ায় মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে তার (লালু) নাম বাদ দেয়া হয়। ফলে তাকে যে অবজ্ঞার শিকার হতে হয়েছে- এটা মেনে নেয়া যায় না।’ এ সময় বিচারপতির চোখে পানি চলে আসে বলে জাগো নিউজকে জানান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মোখলেসুর রহমান।

এর আগে ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময় এ-সংক্রান্ত রিটের শুনানি নিয়ে আদালত ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের বয়স ন্যূনতম সাড়ে ১২ বছর নির্ধারণ করে সংশোধিত পরিপত্র কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না— মর্মে রুল জারি করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, মন্ত্রণালয়ের সচিব, যুগ্ম সচিব, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থসচিব, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের (জামুকা) মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের মহাপরিচালককে এ রুলের জবাব দিতে বলা হয়।

মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ করে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তিনটি গেজেট প্রকাশ করে সরকার। ২০১৮ সালের ১৭ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক পরিপত্রের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ন্যূনতম বয়স ১৩ বছরের স্থলে সাড়ে ১২ বছর নির্ধারণ করা হয়।

আরও পড়ুন >> মুক্তিযোদ্ধা শব্দের আগে ‘ভুয়া’ বলা যাবে না : হাইকোর্ট

২০১৬ সালে প্রথমে গেজেট প্রকাশ করে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধার ন্যূনতম বয়স হতে হবে ১৩ বছর। সর্বশেষ গেজেটে ১২ বছর ৬ মাস বয়স নির্ধারণ করা হয়। পরে এসব গেজেটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরের পরিচালক মাহমুদ হাসানসহ অন্যান্যরা। এ-সংক্রান্ত পৃথক ১৫টি রিট দায়ের করা হয়। ওইসব রিটের ওপর শুনানি শেষে জারি করা রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে হাইকোর্ট রোববার রায় ঘোষণা করেন।

এফএইচ/এমএআর/পিআর