রায়ে বিশাল বোঝা থেকে হালকা হলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৪৪ পিএম, ২৭ জুন ২০১৯

রণদা প্রসাদ সাহার নাতি ও হত্যার শিকার ভবানী প্রসাদ সাহার ছেলে রাজিব প্রসাদ সাহা বলেছেন, ‘ঠাকুরদা আরপি সাহা ও বাবা ভবানী প্রসাদ সাহা এ দেশ ও জাতির জন্য বিশাল ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন। আমরা তাদের ত্যাগের বিশাল বোঝা বহন করে চলছিলাম। এ রায়ের মধ্য দিয়ে বোঝা থেকে হালকা হওয়ার সুযোগ পেলাম। যারা দেশের জন্য কাজ করেছেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন তিনি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা, তার ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহাকে হত্যাসহ গণহত্যার অভিযোগে টাঙ্গাইলের মাহবুবুর রহমানের (৭০) মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে রায় দেন ট্রাইব্যুনাল।

বৃহস্পতিবার মামলার একমাত্র আসামির উপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ রায় ঘোষণা করেন।

মামলার ২৩৫ পৃষ্ঠার রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

অপহরণ, আটকে রেখে নির্যাতন, হত্যা- গণহত্যার তিন অভিযোগেই মাহবুবুরকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন আদালত। ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে বলা হয়েছে রায়ে।

এ সময় রণদা প্রসাদ সাহার পুত্রবধূ স্মৃতি সাহা ও নাতি রাজিব সাহাসহ কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের বেশ কয়েকজন আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

রায় ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় রণদা প্রসাদ সাহার নাতি ও হত্যার শিকার ভবানী প্রসাদ সাহার ছেলে রাজিব প্রসাদ সাহা বলেন, ‘ঠাকুরদা আরপি সাহা ও বাবা ভবানী প্রসাদ সাহা এ দেশ ও জাতির জন্য বিশাল ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন। আমরা তাদের ত্যাগের বিশাল বোঝা বহন করে চলছিলাম। এ রায়ের মধ্য দিয়ে বোঝা থেকে হালকা হওয়ার সুযোগ পেলাম।’

রাজিব সাহা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আসলে এটা শুধু আমাদের পরিবারের না, পুরো দেশের মাথার ওপর থেকে বোঝা গেছে। এতদিন নিঃস্ব অবস্থায় ছিলাম। জানতে পারছিলাম না, বুঝতে পারছিলাম না যে কী হবে, কোথায় যাব। আজকে একটা বিশাল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলো।’

তিনি বলেন, ‘আমার ঠাকুর দাদা ও বাবার ত্যাগ বুকে ধরে আমরা একটা বোঝা নিয়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনা করছিলাম। হাঁটছিলাম, চলছিলাম, নরমাল মানুষের মতো। কিন্তু ভেতরে একটা বিশাল বেদনা নিয়ে ছিলাম। আজকে মনে হচ্ছে, আমরা অনেক হালকা ফিল করছি।’

তিনি বলেন, ‘শুধু তাই না, মনে হচ্ছে উনারা যা করেছেন এ দেশের জন্য, জাতির জন্য, আমরা একাত্তর সাল থেকে যা করে যাচ্ছি এটার একটা প্রকৃত স্বীকৃতি সবার কাজ থেকে, এ দেশের মাটির কাছ থেকে আমরা পেয়েছি এ রায়ের মধ্যে দিয়ে।’

তিনি বলেন, ‘একাত্তরে মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যারা এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন তারা যদি বেঁচে থাকতো তাহলে আজকের এ রায়ে তাদেরও অবশ্যই একটা কিছু হতো। তবে যা হয়েছে, যে রায় হয়েছে তা শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করছি।’

এ রায়ের পর রণদা প্রসাদ সাহার রেখে যাওয়া কর্মকাণ্ডকে কীভাবে সামনের দিকে নিয়ে যেতে চান-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে রাজিব প্রসাদ সাহা বলেন, ‘বড়দের কাছ থেকে আমার ঠাকুর দাদার সম্পর্কে শুনেছি যে, তিনি বলতেন- উনার জন্মদিন বা মৃত্যুর পর মৃত্যুদিনেও যেন হাসপাতালে রোগীদের সেবা প্রদান এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ না হয়, ছুটি যেন না দেয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী কলেজ, এ রকম প্রতিষ্ঠান এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ রাখতে দেব না। আমাদের কাজ আরও বেশি করতে হবে। এটাই আমাদের স্পিরিট, তা ভবিষতেও থাকবে।’

ভবানী প্রসাদ সাহার স্ত্রী শ্রীমতি সাহা বলেন, ‘আমাদের দেশের ওপর, আমাদের ফ্যামিলির ওপর এত অন্যায় এত অবিচার হয়ে গেল তা এ রায়ের মাধ্যমে স্বীকার করা হয়েছে। ৪৮ বছর পর হলেও তাদের বিচার হয়েছে। এ বিচারের কথা যেন সবাই জানে যে অপরাধের একদিন বিচার হয়। এ ভয়টা যেন তাদের থাকে। ন্যায়-অন্যায়ের ফলাফল কী হয় তা যেন সবার মধ্যে থাকে। আমরা সব সময় ত্যাগের মধ্যে দিয়ে দিন চালিয়ে যাচ্ছি। এ রায় আমরা মাথা পেতে নিলাম। আমরা শান্তি পেয়েছি। উনাদের আত্মার শান্তি হোক।’

রায়ের পর ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাস গুপ্ত বলেন, ‘রায়ে বলা হয়েছে, আসামি মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগই প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। রণদা প্রসাদ সাহা সারাজীবন মানবতার পক্ষে কাজ করেছেন। তাকে হত্যা করা, অপহরণ করা, তার ছেলেকে তুলে নিয়ে যাওয়া এবং হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় গণহত্যা চালিয়েছে পাকিস্তানের সেনাদের সহযোগিতায়। এ অপরাধে সঙ্গে ছিলেন মাহবুবুরের বাবা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল ওয়াদুদ ও বড় ভাই মান্নান। এ দুজনই মারা গেছেন। ট্রাইব্যুনাল বলেছেন, তারা যে অপরাধ করেছেন তা গুরুতর।’

রায়ে সন্তুষ্ট কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রসিকিউশনের দায়িত্ব মামলার অভিযোগ প্রমাণ করা। আমরা অভিযোগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছি। প্রসিকিউশন সততা, আন্তরিকতা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছে।’

রানা দাস আরও বলেন, ‘আসামি মাহবুবুর একাত্তরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর শান্তি কমিটির সভাপতি বৈরাটিয়া পাড়ার আব্দুল ওয়াদুদের ছেলে। মাহবুবুর ও তার ভাই আব্দুল মান্নান সে সময় রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে যে সব মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা উঠে এসেছে এ মামলার বিচারে।’

এফএইচ/এনডিএস/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :