ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মোবাইল টাওয়ার নিয়ে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায়

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:৫৬ এএম, ১৭ অক্টোবর ২০১৯

ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকাসহ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্পর্শকাতর এলাকা থেকে দ্রুত মোবাইল টাওয়ার সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা সম্বলিত হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে।

রায়ে স্পর্শকাতর এলাকা বলতে ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা ছাড়াও হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসা ও স্কুলকে বোঝানো হয়েছে।
হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রায় প্রদানকারী বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর বৃহস্পতিবার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন।

এর আগে মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশনের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে মোবাইল ফোন কোম্পানির টাওয়ার থেকে নিঃসৃত ক্ষতিকর বিকিরণের (রেডিয়েশন) বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা চেয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) পক্ষে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

ওই রিটের শুনানি নিয়ে মোবাইল কোম্পানির টাওয়ার থেকে নিঃসৃত তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা এবং এর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানকে বিভিন্ন মোবাইল কোম্পানির কয়েকটি মোবাইল ফোনের টাওয়ার পরিদর্শন করে রেডিয়েশন বিষয়ে আদালতে একটি প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, আদালতের আদেশ অনুসারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গবেষণা করে জানায় দেশে ব্যবহৃত টাওয়ারে নিঃসৃত বিকিরণ আন্তর্জাতিক মাত্রার তুলনার বেশি। এরপর এ নিয়ে একটি গাইডলাইন করতে নির্দেশ হয়েছিল। সে অনুসারে একটি গাইডলাইন করে আদালতে দাখিল করেছিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আমাদের দাবির প্রেক্ষিতে অন্তত পাঁচবারের চেষ্টায় সে গাইডলাইন সংশোধন করা হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, এ মামলার শুনানিতে আমরা ভারতের দুইটি রায় আদালতে দাখিল করেছি। সেখানে আমরা বলেছি আমাদের দেশের টাওয়ারের রেডিয়েশনে যে মাত্র রয়েছে তা দশ ভাগের একভাগে কমিয়ে আনতে হবে।

এদিকে আদালতের আদেশ অনুসারে একটি প্রতিবেদনে মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে নিঃসৃত তেজস্ক্রিয়তা (রেডিয়েশন) খুবই উচ্চমাত্রার এবং তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মর্মে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সে প্রতিবেদনে সব মোবাইল অপরারেটর এবং বিটিআরসিকে এই তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা কমাতে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলেও প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়।

এছাড়া বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করতে স্বাস্থ্য সচিবকে নির্দেশ দেন আদালত। ওই কমিটিতে বিজ্ঞানী, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অধ্যাপক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং আণবিক শক্তি কমিশনের প্রতিনিধিদের রাখতে বলা হয়। এ কমিটিকে মোবাইল টাওয়ার থেকে মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও পরিবেশগত প্রভাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়।

পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত মোবাইল কোম্পানির টাওয়ারগুলো থেকে নিঃসৃত রেডিয়েশন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিবাদীদের কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

এরপর সে রুলের দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ২৫ এপ্রিল হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করেন রায়ে কয়েক দফা নির্দেশনা দেয়া হয়। একই সঙ্গে সমীক্ষা করে দেশের টাওয়ারগুলোর ক্ষতিকর রেডিয়েশনের বিষয়ে আদালতকে জানাতে নির্দেশ দেয়া হয়। সে সমীক্ষা প্রতিবেদন দেখে ক্ষতিকর রেডিয়েশন ছড়ানো মোবাইল টাওয়ার অপসারণের বিষয়ে আদেশ দিবেন বলেও মন্তব্য করেন আদালত। সেই সঙ্গে, বাংলাদেশের মোবাইল ফোন কোম্পানির টাওয়ার থেকে নিঃসৃত ক্ষতিকর বিকিরণের (রেডিয়েশন) বিষয়ে সমীক্ষা করে প্রতিবেদন দাখিলের পাশাপাশি ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছিলেন হাইকোর্ট।

১১ দফা নির্দেশনায় আদালত বলেন-

১. মোবাইল টাওয়ারের বিকিরন মাত্র নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ১ থেকে ১০ ভাগ করা

২. মোবাইল টাওয়ার বাসার ছাদ, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক, কারাগার, খেলার মাঠ, জনবসতি এলাকা, হেরিটেজ ও প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাসহ ইত্যাদি স্থানে না বসানো এবং যেগুলো বসানো হয়েছে তা অপসারণ

৩. বিকিরণের মাত্রা যেন বেশি না হয় তার ব্যাপারে অতিরিক্ত নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ

৪. টাওয়ার বসাতে জমি অধিগ্রহণে কোনো বাধা আছে কি-না বা বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ

৫. টাওয়ারের বিকিরণ মাত্রা বিটিআরসি এবং লাইসেন্সি দুইজনকেই স্বাধীনভাবে আইটিইউ এবং আইইসির মান অনুসারে পরিমাপ করা

৬. কোনো টাওয়ারের বিকিরণ মাত্রা বেশি হলে তা অপসারণ করে নতুন টাওয়ার বসানো

৭. টাওয়ার ভেরিফিকেশন মনিটর পরীক্ষার ক্ষেত্রে বিটিআরসির দায়-দায়িত্ব হবে বাধ্যতামূলক

৮. বিটিআরসি স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে মনিটরিং সেল গঠন করবে

৯. বিটিআরসিকে অন্যদেরকে নিয়ে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি কমিটি গঠন করবে। লাইসেন্সিকে প্রতি ৬ মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে

১০. মোবাইল ফোনে দৃশ্যমানভাবে এসএআর মান লিখতে হবে এবং

১১. সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সি প্রতিটি রিপোর্ট/রেকর্ড ৫ বছর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করবে। সংশ্লিষ্ট অথরিটিকে আদালতের আদেশ এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে আরও গবেষণা করে প্রতিবেদন দিতে হবে।

এফএইচ/এমএসএইচ/পিআর