ধরেই নিয়েছে পুলিশ অপরাধ করলে কিছু হয় না

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৫১ পিএম, ০২ ডিসেম্বর ২০১৯

দুই ব্যাংকারকে অবৈধভাবে আটক করে টাকা দাবি এবং টাকা না দিলে ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দেয়ায় রাজধানীর উত্তরা পূর্ব থানার এএসআই মোস্তাফিজুর রহমানসহ তিন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আদালত এএসআই মোস্তাফিজের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট বলেছেন, কতিপয় পুলিশ সদস্য দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা বানিয়ে নিচ্ছে। এদের সংখ্যা কোনোভাবেই ৫ শতাংশের বেশি হবে না। ওইসব পুলিশ সদস্য মনে করে তারা দুর্নীতি করলে তাদের কিছু হবে না। ৫ শতাংশ পুলিশের অপকর্ম ও দুর্নীতির কারণে পুরো বাহিনীর বদনাম হচ্ছে।

রিটের শুনানিতে আদালত পুলিশ বাহিনীকে উদ্দেশ করে বলেন, দেশের পাঁচ শতাংশ পুলিশ সদস্যের অনৈতিক কাজের জন্য পুরো বাহিনীর ইমেজ সংকটে পড়ছে। এই সংকট উত্তরণে পুলিশের কর্তৃপক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। পাঁচ শতাংশ পুলিশের জন্য পুরো বাহিনীর বদনাম হবে, তা মেনে নেয়া যায় না।

পুলিশের হয়রানি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ভুক্তভোগী সোনালী ব্যাংক মতিঝিল শাখার কর্মী ইব্রাহিম খলিল ও তার এক নারী সহকর্মীর করা আবেদনের শুনানিতে সোমবার হাইকোর্টের বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এমন মন্তব্য করে আদেশ দেন।

আদালতে আজ রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাডভোকেট আবুল কালাম ও ইসমাইল হোসেন ভূঁইয়া। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুল আলম।

পরে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার সাংবাদিকদের বলেন, কিছুসংখ্যক পুলিশ সদস্যের অন্যায় ও অপরাধের কারণে পুরো বাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। বাহিনীর ইমেজ সংকট দূর করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন আদালত।

আদালতের বরাত দিয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, পুলিশ অপরাধ করলে কিছু হয় না। ৫ শতাংশ পুলিশের জন্য পুরো বাহিনীর বদনাম হচ্ছে। এদের সংখ্যা ৫ শতাংশের বেশি নয়।

ব্যারিস্টার এবিএম আব্দুল্লাহ বাশার বলেন, “সম্প্রতি ‘এক ব্যাংকারকে সন্দেহজনকভাবে পুলিশের এএসআই মোস্তাফিজুর রহমানসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আটক করে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে তাদের কাছে টাকা দাবি করা হয়। এমনকি সেখানে যে নারী সদস্য ছিলেন, তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে সময় চাওয়া হয়। যদি তিনি সময় দেন, তবে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে।’ যেটা সম্পূর্ণ বেআইনি ও ফৌজধারী অপরাধ। পুলিশের কাছে এটা কাম্য নয়।”

তিনি বলেন, ‘তাদের অভিযোগ পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজি) কাছে দেয়া হয়। এই আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া তারা হাইকোর্টে আবেদন করেন। পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে করা আবেদনটি ১৫ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির জন্য নির্দেশ দেন এবং রুল জারি করা হয়েছে। রুলে ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।’

গত ২৭ জুন রাত ১১টায় মতিঝিল শাখার সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার ইব্রাহিম খলিল তার এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে উত্তরার ভূতের আড্ডা রেস্টুরেন্ট থেকে রাতের খাবার শেষে বাড়ি ফিরছিলেন। এমন সময় নেমপ্লেটহীন এক পুলিশ কনস্টেবল ইব্রাহিম খলিলকে উত্তরা পূর্ব থানার এএসআই মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে নিয়ে যান। ওই পুলিশ কর্মকর্তা ইব্রাহিমকে টেনে-হিঁচড়ে থানায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করায় ইব্রাহিম আঘাতপ্রাপ্ত হন।

পরে এএসআই মোস্তাফিজ ব্যাংক কর্মকর্তা ইব্রাহিমের কাছে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। তবে আহত অবস্থায় ইব্রাহিম ৬ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়া পান। পরে তাকে বাকি ১৪ হাজার টাকা পরিশোধ করবে বলে কুর্মিটোলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেন ইব্রাহিম। এর কিছুদিন পর পুলিশের ওই এএসআই ইব্রাহিমের নারী কলিগকে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতে বলেন এবং দেখা করলে অবশিষ্ট ১৪ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে না বলে জানান।

এরপর এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ডিএমপি কমিশনার ও পুলিশের আইজি বরাবর অভিযোগ করেন ইব্রাহিম। একই সঙ্গে নারী কলিগের সঙ্গে পুলিশ কর্মকর্তার কলরেকর্ডিং, মেডিকেল সার্টিফিকেটও দাখিল করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় গত ২৫ জুলাই ইব্রাহিম হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত জড়িত পুলিশদের বিরুদ্ধে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেন।

এফএইচ/জেএইচ/এমএস