পাক আর্মিদের সঙ্গে সাদা শার্ট ও জামা পরে থাকতেন কায়সার

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:২৭ এএম, ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯

মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হত্যা, গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক কৃষি প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে করা আপিলের ওপর রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্কে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাক্ষীদের বরাত দিয়ে বলেন, পাক আর্মি ও রাজাকারদের সঙ্গে সৈয়দ কায়সার সাদা পায়জামা ও শার্ট পরে থাকতেন।

জবানবন্দিতে সাক্ষীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের কেউ কেউ কায়সারকে চিনতেন। আবার অনেক সাক্ষী তাকে প্রথমে চেনেননি। কিন্তু পরে এলাকাবাসী অন্যান্যদের কাছে বর্ণনা দেয়ার সময় যখন বলতেন- একজন ব্যক্তি সাদা শার্ট ও পায়জামা পরা থাকতেন তিনিই কায়সার। কায়সারের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা ও অন্যান্য মানুষের ওপর নিযার্তন চলত।

তিনি আরও বলেন, আসামি সৈয়দ কায়সারের কারণে ধর্ষণ, হত্যা, গণহত্যা ও মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এটা প্রতিটি সাক্ষীর জবানবন্দি ও বর্ণনায় ফুটে উঠেছে। আর সে সময় সৈয়দ কায়সার সাদা পায়জামা ও শার্ট পরতেন সেটাও বলেছে সকল সাক্ষী।

সোমবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বিভাগের বেঞ্চে এই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে মামলার কার্যক্রম মঙ্গলবার (৩ ডিসেম্বর) পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন আদালত।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ। তাদের সহযোগিতা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক, সাঈদা খাতুন ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল তাহমিনা পলি। উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মুরাদ রেজা ও মো. মোমতাজ উদ্দিন ফকির।

অন্যদিকে কায়সারের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, আইনজীবী এস এম মো. শাহজাহান, শিশির মোহাম্মদ মনির ও ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমিন। এছাড়াও সৈয়দ কায়সারের দুই ভাই সৈয়দ সেলিম কায়সার ও সৈয়দ শাহজাহান কায়সার।

এর আগে গত ২৫ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম মামলার পেপারবুক থেকে পাঠ শুরু করেন। পরদিন অভিযোগের মধ্য থেকে তিনটি বিষয়ে যুক্তিতর্ক শেষে মামলার কাজ ২৭ নভেম্বর ও ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুলতবি করা হয়। তারও আগে গত ৩০ অক্টোবর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা কায়সারের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন।

২০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় সৈয়দ কায়সারের মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস চেয়ে আপিল আবেদন করা হয়। সৈয়দ কায়সারের পক্ষে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন তুহিন আপিল আবেদনটি করেন। আপিলে খালাসের আরজিতে ৫৬টি যুক্তি তুলে ধরা হয়। ৫০ পৃষ্ঠার মূল আপিলের সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করা হয়।

২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর তৎকালীন ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কায়সারকে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজের নামে ‘কায়সার বাহিনী’ গঠন করে অপরাধ সংঘটিত করেন হবিগঞ্জ মহকুমার রাজাকার কমান্ডার ও শান্তি কমিটির সদস্য সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার।

২০১৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর তাকে সর্বোচ্চ সাজাসহ ২২ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে একাত্তরে ১৫২ জনকে হত্যা-গণহত্যা, দুই নারীকে ধর্ষণ, পাঁচজনকে আটক, অপহরণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায় এবং দুই শতাধিক বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও ষড়যন্ত্রের ১৬টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়।

এসব অভিযোগের মধ্যে ১৪টিই প্রমাণিত হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মধ্যে প্রথমবারের মতো অন্য অপরাধের পাশাপাশি ধর্ষণের দায়ে ফাঁসির দণ্ড পান কায়সার। সাঁওতাল নারী হীরামনি ও অপর নারী মাজেদাকে ধর্ষণের অপরাধ দুটি প্রমাণিত হয়।

এফএইচ/বিএ