জমিদারের নাতি পরিচয়ে প্রতারণা : ৬ মাসে মামলা নিষ্পত্তির নির্দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০৭ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯
ফাইল ছবি

প্রতারণা করে জমিদার দ্বিজেশচন্দ্র রায় চৌধুরীর নাতি দাবি জানিয়ে জামিদার বাড়ি দখলের অভিযোগে রতন চন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে করা মামলা ৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

অভিযোগ গঠনের আদেশ বাতিল চেয়ে রতন চন্দ্রের করা রিভিশন আবেদন খারিজ করে বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ রায় দেন।

আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এএম আমিন উদ্দিন। অন্যদিকে মামলার বাদী ‘লেসি সমবায় সমিতি’র সাধারণ সম্পাদক আবদুল জব্বার তালুকদারের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এসআরএম লুৎফর রহমান আকন্দ।

পরে আইনজীবী লুৎফর রহমান আকন্দ সাংবাদিকদের বলেন, ওই বাড়ির মালিক জমিদার দ্বিজেশচন্দ্র রায় চৌধুরীর ভুয়া নাতি সেজে রতনচন্দ্র রায় গং ওয়ারিশ হিসেবে সরকারি বাড়িটি দখলে নেয়ার জন্য প্রতারণার আশ্রয় নেন। পরে এ ঘটনায় ২০০৫ সালে অভিযুক্তদের আসামি করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।

মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, জমিদার বাড়িটি ঢাকার সূত্রাপুর থানাধীন পুরান ঢাকার বাংলাবাজারের নর্থব্রুক হল রোডে ৩৮ নম্বর হোল্ডিংধারী। এ বাড়িতে এক সময়ে বসবাস করতেন মানিকগঞ্জের ধানকোড়া এস্টেটের জমিদার দ্বিজেশচন্দ্র রায় চৌধুরী। একাত্তরে স্বাধীনতার সময় মুক্তিযুদ্ধের আগেই তিনি সপরিবারে ভারত চলে যান। সরকার ১৯৬৬ সালে তার সমস্ত সম্পত্তি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে অধিগ্রহণ করে। পরে বাড়িটি সেনাবাহিনী ও লেসি সমবায় সমিতির কাছে লিজ দেয়া হয়।

তবে এরই মধ্যে শ্যামপুরের পশ্চিম ধোলাইরপাড়ের বাসিন্দা রতনচন্দ্র রায় চৌধুরী ওই জমিদারের নাতি পরিচয়ে জমিটির মালিকানা দাবি করেন। তিনি নিজেকে জমিদার দ্বিজেশচন্দ্র রায় চৌধুরীর একমাত্র কন্যা কদমিনির পুত্র বলে দাবি করে ওয়ারিশসূত্রে জমিটি আত্মসাতের অপচেষ্টা করছেন উল্লেখ করে, লেসি সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল জব্বার তালুকদার সিআইডিতে (অপরাধ তদন্ত বিভাগে) অভিযোগ দাখিল করেন। তদন্তে এ অভিযোগের সত্যতা পায় সিআইডি।

সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, সূত্রাপুর মৌজার এস.এ ৪৩৪০ নং খতিয়ানে ৬৯৯৩ ও ৬৯৯৪ নং দাগের জমি দ্বিজেশচন্দ্র রায় পিতা দ্বিনেশচন্দ্র রায়, ৩৮ নর্থব্রুক হল রোডের নামে এস.এ রেজিস্ট্রি হয়। এই জমিটি অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ তালিকার ৬৫০ নম্বর ক্রমিকে এবং ভিপি (ভ্যাস্টেড প্রপার্টি) প্রত্যর্পণ তালিকার ২ নং পাতার ৮ নম্বর ক্রমিকে ১০১/৬৮ নং ভিপি কেসের অন্তভুক্ত সম্পত্তি হিসেবে লিপিবদ্ধ আছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মামলাটি ব্যাপকভাবে তদন্তকালে দেখা যায়, মামলার আসামি রতনচন্দ্র গংয়ের পিতা বিশ্বম্ভরচন্দ্র রায়। তার দাদা রাধিকা মোহন রায় নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের বসুলিয়া গ্রামের ডাকাতি মন্ডলের মেয়ে কদমিনিকে বিয়ে করেন। কদমিনির গর্ভে বিশ্বম্ভরের জন্ম হয়। এই বিশ্বম্ভরের ৪ ছেলে ও ২ মেয়ে। তাদের পরিচয় গোপন করে জমিদার দ্বিজেশচন্দ্র রায় চৌধুরীর মেয়ে কদমিনি তার দাদি এই ভুয়া পরিচয় দিয়ে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে কাগজপত্র তৈরি করে বিভিন্ন অফিস-আদালতে দাখিল করে মামলার পক্ষভুক্ত হয়েছেন। কদমিনি নামে জমিদার দ্বিজেশচন্দ্র রায় চৌধুরীর কোনো মেয়ে ছিল না। এছাড়া দুটি দলিলের মাধ্যমে ৩৭ ও ৩৮ নম্বর হোল্ডিংয়ের জমির প্রায় ১০ কাঠা বিক্রি করেছেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়। এক্ষেত্রে জালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণের প্রমাণ পায় সিআইডি।

পরে জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে ২০০৫ সালে করা মামলায় রতনচন্দ্র রায়সহ মোট ৯ জনকে আসামি করা হয়। তবে মামলাটিতে অভিযোগ গঠন করলে তা বাতিল চেয়ে রতন চন্দ্র ২০১০ সালে হাইকোর্টে আবেদন করেন। এরপর সে আবেদনের কয়েক দফা শুনানি শেষে রতন তার আবেদন হাইকোর্ট থেকে তুলে নেন। এরপর পুনরায় হাইকোর্ট থেকে ২০১০ সালে আবেদন তুলে নেয়ার তথ্য গোপন করে তিনি ২০১২ সালে হাইকোর্টের আরেকটি বেঞ্চে তার মামলা বাতিল চেয়ে আবেদন জানান। সে আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট মামলাটির কার্যক্রম স্থগিত করে রুল জারি করেন। দীর্ঘদিন পর ওই হাইকোর্টের নতুন এক বেঞ্চে ওই রুলের শুনানি শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করলেন।

এফএইচ/এমএসএইচ/পিআর