জামিন কেন হচ্ছে না খালেদার, যা বলছেন দুই আইনজীবী

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫৬ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন অভিযোগ করে বলেছেন, “বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে সরকার বলে, ‘জামিন দেয়া, না দেয়া সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। এখানে আমাদের কোনো আপত্তি নাই।’ কিন্তু যখনই আমরা জামিনের দরখাস্ত করি তখনই অ্যাটর্নি জেনারেল গিয়ে হাজির হয়ে যান এবং জামিনের বিরোধিতা করেন।”

বুধবার সুপ্রিম কোর্টে খন্দকার মাহবুব হোসেনের নিজ কার্যালয়ে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এমন মন্তব্য করেন।

খন্দকার মাহবুব হোসেনের এমন বক্তব্যের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকরা। জবাবে তিনি বলেন, ‘কোর্টে গিয়ে কি বলব, জামিন দেয়া হোক? তাদের (খালেদা জিয়ার আইনজীবী) তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আদালতের সামনে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি জামিন পাওয়ার অধিকারী। সেখানে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা, আর দোষ চাপাচ্ছেন অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের ওপর। সম্পূর্ণ হাস্যকর বিষয়!’

এর আগে দুপুরে আদালতের আদেশ অনুযায়ী খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টে পাঠায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) শুনানির জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

স্বাস্থ্যগত প্রতিবেদন আসার পরপরই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আইনজীবী হিসেবে আমাদের দাবি, সরকারের উচিত হবে ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) অসুস্থ, এ নিয়ে কারও দ্বিমত নাই, তিনি তার ইচ্ছা মতো যাতে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পান। সবকিছুর ঊর্ধ্বে আপিল বিভাগ বা হাইকোর্ট বিভাগ, তাকে সে সুযোগটা দেবেন, এটাই আমরা প্রত্যাশা করি। আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য তার সুচিকিৎসা, তাকে বাঁচিয়ে রাখা। আমরা আশা করি, সরকার এ ব্যাপারে কোনো বাঁধা দেবে না। তাকে সুচিকিৎসার সুযোগ দেবেন।’

তিনি আরও বলেন, আমরা মনে করি, অসুস্থ খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে সরকার দ্বিমুখী আচরণ করছে। একদিকে সরকার বলছে, জামিন দেয়া সম্পূর্ণ আদালতের ব্যাপার, অপরদিকে সরকারের পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল এসে জামিনের বিরোধিতা করছেন।’

খালেদা জিয়ার জামিনের বিষয়ে সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘তারা (খালেদা জিয়ার আইনজীবী) যদি মনে করে যে প্যারোল চাই, চিকিৎসার বন্দোবস্ত চাই, আইনেই বিধান আছে। সে বিধান মতো তারা দরখাস্ত কোনো সময় করছেন না। করলে হয়তো সরকার বিবেচনায় নেবে এবং তথ্য-উপাত্ত দিয়ে যদি প্রমাণ করতে পারে, সত্যিই তার বিদেশে যাওয়া দরকার…। কিন্তু এখানে সর্বোচ্চ চিকিৎসালয়ের প্রায় ছয়জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেছেন, তার চিকিৎসা এখানেই সম্ভব। কিন্তু তিনি সম্মতি দিচ্ছেন না। এখন বিএনপির নেতৃবৃন্দ যারা বাইরে এত কথাবার্তা বলছেন, আমাদের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন, তাদের তো উচিত তাদের নেত্রীকে রাজি করানো।’

zia

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সম্মতি দিয়েছেন কি-না, সম্মতি দিলে চিকিৎসা শুরু হয়েছে কি-না এবং শুরু হলে কী অবস্থা— তা জানাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্যকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

বুধবারের (২৬ ফেব্রুয়ারি) মধ্যে এ প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়। এ বিষয়ে আদেশের জন্য বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দিন ধার্য করা হয়।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জামিন আবেদনের ওপর শুনানির পর হাইকোর্টের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হকের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি আবেদনটি উপস্থাপনের পর আদালত ২৩ ফেব্রুয়ারি শুনানির দিন ধার্য করেন। ওইদিন আদালতে আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি আবেদনটি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় দায়ের করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী সগীর হোসেন লিয়ন। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর এ মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন পর্যবেক্ষণসহ খারিজ করে দেন আপিল বিভাগ। তবে আবেদনকারী (খালেদা জিয়া) যদি সম্মতি দেন তাহলে বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী তার অ্যাডভান্স ট্রিটমেন্টের পদক্ষেপ নিতে বলা হয়।

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের কারাদণ্ড পেয়ে বন্দি রয়েছেন খালেদা জিয়া। আপিলের পর হাইকোর্টে যা বেড়ে ১০ বছর হয়। ২০১৮ সালের ১৮ নভেম্বর খালাস চেয়ে আপিল বিভাগে খালেদা জিয়া জামিন আবেদন করেন। তবে সেই আবেদন এখনও আদালতে উপস্থাপন করেননি তার আইনজীবীরা।

২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের সাত নম্বর কক্ষে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক মো. আখতারুজ্জামান (বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি) জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই সাজা হয় মামলার অপর তিন আসামিরও।

ওই বছরের ১৮ নভেম্বর হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এর বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। গত বছরের ৩০ এপ্রিল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাত বছরের দণ্ডের বিরুদ্ধে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অর্থদণ্ড স্থগিত ও সম্পত্তি জব্দ করার ওপর স্থিতাবস্থা দিয়ে দুই মাসের মধ্যে ওই মামলার নথি তলব করেন। ২০ জুন বিচারিক আদালত থেকে মামলার নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়। ৩১ জুলাই বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ তার জামিন আবেদন খারিজ করে দেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে জামিন চান খালেদা জিয়া। এ আবেদনের শুনানির পর ১২ ডিসেম্বরও সেটি খারিজ হয়ে যায়।

২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা করা হয়। ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে মামলাটি করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

তদন্ত শেষে ২০১২ সালে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ খালেদাসহ চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শেষ হলে দুদকের পক্ষে এ মামলায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণা করা হয়।

এফএইচ/এমএআর/জেআইএম