খালেদার মুক্তি : আদালতের অনুমতির বিষয়ে আইন যা বলে

মুহাম্মদ ফজলুল হক
মুহাম্মদ ফজলুল হক মুহাম্মদ ফজলুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৩৭ পিএম, ২৪ মার্চ ২০২০
ফাইল ছবি

সরকারের দেয়া শর্তের ভিত্তিতে মুক্তি পেতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। দণ্ডাদেশ স্থগিত করে বিএনপি নেত্রীর মুক্তিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু খালেদার মুক্তির ক্ষেত্রে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন আছে কি না- সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তবে সেটা নিয়ে রয়েছে আইনি যুক্তি।

যেহেতু খালেদা জিয়ার সাজা বিষয়ক দুটি মামলা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে চলমান তাই তার মুক্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমতির প্রয়োজন কি না?

এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও বিএনপির আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের দাবি, আদালতের অনুমতির প্রয়োজন নেই। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবীর যুক্তি, কোর্টে সাজার মামলা পেন্ডিং থাকলে আদালতের অনুমতির প্রয়োজন আছে।

এ বিষয়ে দুদকের আইনজীবী খুরশিদ আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধি ৪০১ ধারার ২ উপধারা মতে, সাজাপ্রাপ্ত কাউকে মুক্তি দিতে হলে, যে কোর্টে সাজার মামলা পেন্ডিং রয়েছে, সেই কোর্ট থেকে অনুমতি নিতে হয়। এখানে যেহেতু সরকার ফৌজদারি কার্যবিধি ৪০১ ধারার ১ উপধারা মতে ৬ মাসের জন্য তার সাজা স্থগিত করে তাকে মুক্তির বিষয়ে মতামত দিয়েছে সেক্ষেত্রে অনুমতির প্রয়োজন নেই।’

দুদকের আইনজীবী আরও জানান, বিদেশ না যাওয়ার শর্তে তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে।

তবে, এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানান, আদালতের অনুমতির প্রয়োজন নেই।

এ দিকে, খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আদালতের অনুমতির প্রয়োজন নেই। যেহেতু সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্ট থেকে খালেদার জামিন মেলেনি, সেহেতু প্রশাসনিক ক্ষমতার বলে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিয়েছে সরকার।’ অসুস্থ খালেদার চিকিৎসার জন্য মুক্তির ঘোষণা দেয়া-ই সরকারের প্রধানসহ সকলকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

এ দিকে বলা হচ্ছে, দুই শর্তে খালেদাকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২৪ মার্চ এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘ফৌজদারি কার্যবিধি ৪০১ ধারার ১ উপধারা মতে ৬ মাসের জন্য তার সাজা স্থগিত করে তাকে মুক্তি বিষয়ে মতামত দিয়েছি। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে মানবিক দিক বিবেচনায় সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

তিনি জানান, খালেদা জিয়া বাসায় থেকে চিকিৎসা নেবেন এবং বিদেশ যেতে পারবেন না, এমন শর্তে তাকে মুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ বিষয়ে প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

বাসায় অসুস্থ হলে তিনি কীভাবে চিকিৎসা নেবেন?

সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘চিকিৎসার যদি দরকার হয়, তিনি বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে মানসম্মত হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) আছেন। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে। আর ভবিষ্যতে এ বিষয়টি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বোঝা যাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে বিদেশে পাঠানো মানে ‘সুইসাইডের’ মুখে ফেলা।’

খালেদার মুক্তির সিদ্ধান্তে সরকারকে ধন্যবাদ জানালো বিএনপির নেতাকর্মীরা। এ দিকে, দীর্ঘদিন কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তার বোন সেলিমা ইসলাম। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) খালেদা জিয়ার সাজা ছয়মাসের জন্য স্থগিত রেখে তাকে মুক্তি দেয়ায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান।

তিনি জানান, এখনও সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।

প্রসঙ্গত, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর খালেদা জিয়াকে সাত বছর কারাদণ্ড দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন খালেদা জিয়া। সেই আপিল হাইকোর্টে বিচারাধীন। তবে তার জামিনের আবেদন গত বছর ৩১ জুলাই হাইকোর্ট এবং গত বছরের ১২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ খারিজ করেন। এ অবস্থায় নতুন করে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করার উদ্যোগ নিয়েছেন খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা।

এছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় নিম্ন আদালত ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। সেদিনই তাকে কারাগারে নেয়া হয়। সেই থেকে তিনি কারাবন্দি। যদিও এ মামলায় হাইকোর্ট ওই বছরের ১২ মার্চ খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দিয়েছিলেন। আপিল বিভাগ জামিন বহাল রাখেন। তবে অন্য মামলায় জামিন না পাওয়ায় তিনি মুক্তি পাননি। এ মামলায় হাইকোর্ট ২০১৮ সালের ৩০ অক্টোবর এক রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করেছেন। হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল আপিল বিভাগে বিচারাধীন। এই মামলায় খালেদা জিয়ার করা জামিনের আবেদনও আপিল বিভাগে বিচারাধীন।

এফএইচ/এফআর/পিআর