মানবতাবিরোধী অপরাধ : পলাতক চারজনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন চূড়ান্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৫৩ পিএম, ১২ আগস্ট ২০২০

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত আটক, অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ ও কবিরহাট থানার বিভিন্ন এলাকার চারজনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। তবে আসামিরা পলাতক থাকায় গ্রেফতার করার স্বার্থে সংস্থার পক্ষ থেকে তাদের নাম ও ছবি প্রকাশ করেনি।

বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে ধানমন্ডিতে তদন্ত সংস্থার প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন চূড়ান্তের কথা জানান সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান খান ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এম সানাউল হক। এটি তদন্ত সংস্থার ৭৮তম প্রতিবেদন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর তদন্ত শুরু হয়ে আজ (১২ আগস্ট) শেষ হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন মো. শাহজাহান কবীর। তদন্তের সময় ৭০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৮ জনকে সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের ১১৪ পৃষ্ঠার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করাসহ ৪টি ভলিয়মে ২২২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। তবে, সব আসামি পলাতক থাকায় তাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেনি তদন্ত সংস্থা। পরিবেশ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তদন্ত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে জমা দেয়া হবে।

এর আগে মামলা-তদন্তের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এম. সানাউল হক সাংবাদিকদের বলেন, এ চার আসামির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর তদন্ত শুরু হয়। দুই বছর ৯ মাসে পর ১২ আগস্ট তদন্ত শেষ করা হয়।

আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে বলা হয়েছে, ওই ৪ আসামির মধ্যে একজন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নোয়াখালী জেলা ছাত্র সংঘের নেতৃত্বে ছিলেন। অপর ৩ আসামি থানা ছাত্র সংঘের নেতা হিসেবে রাজাকার বাহিনীতে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে ৩ জন আসামি জামায়েত ইসলামের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। আরেকজন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

পলাতক এসব আসামিদের বিরুদ্ধে আটক, অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা ও গণহত্যার ঘটনায় মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়।

অভিযোগগুলো হলো-

>> ১৯৭১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বেলা অনুমান ১টার সময় সালেহ আহমেদ মজুমদার, আমান উল্যাহ ফারুক, আব্দুর রব বাবু, আক্তারুজ্জামান লাতু, ইসমাঈল হোসেন, মোস্তফা কামাল ভুলুসহ ১৫/২০ জন মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানীগঞ্জ থানাধীন পাকিস্তান বাজারে (বর্তমানে বাংলা বাজার) অপারেশন শেষ করে বাঞ্ছারাম নামক স্থানে ১৫ নং সুইস গেইট সংলগ্ন এলাকায় এসে সহযোদ্ধাদের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এ সময় বসুরহাট ও চাপরাশির হাট রাজাকার ক্যাম্প থেকে আসামিদের নেতৃত্বে ১০০/১২০ জন সশস্ত্র রাজাকার ও পাকিস্তানি আর্মি তাদের ওপর অতর্কিত হামলায় চালায়। রাজাকারদের অতর্কিত হামলায় তারা গুরুতর আহত হয়ে সুইস গেইট সংলগ্ন টং ঘর ও ধানক্ষেতে আশ্রয় নেয়। রাজাকারেরা টং ঘর ও ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকা নিরস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বের করে গুলি করলে সালেহ আহমেদ মজুমদার, মোস্তাফা কামাল ভুলু, আমান উল্যাহ ফারুক, ইসমাঈল হোসেন, আক্তারুজ্জামান লাতু, আব্দুর রব বাবু ও পথচারী গোলাম মাওলাসহ অজ্ঞাত আরও দুজন মৃত্যুবরণ করেন। সকলের লাশ পাওয়া যায়।

>> ১৯৭১ সালের ৬ অক্টোবর বেলা অনুমান ১০ টার সময় আসামিরাসহ ২০/২৫ জন সশস্ত্র রাজাকার কোম্পানীগঞ্জ থানাধীন চরফকিরা গ্রামের ইউসুফ মিয়াকে তার বাড়ি থেকে অপহরণ করে চাপরাশির হাট রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ওইদিনে দুপুর অনুমান ২টার সময় একই আসামিরা চাপরাশির হাট দক্ষিণ বাজার থেকে হাবিবুর রহমানকেও অপহরণ করে রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। আসামিরা তাদের ক্যাম্পে আটক রেখে অমানুষিক নির্যাতন করেন।

পরের দিন ভোর রাতে আসামিরা ইউসুফ মিয়া ও হাবিবুর রহমানকে ১৯ নং সুইস গেইটে নিয়ে গুলি করেন। গুলির আঘাতে ইউসুফ মিয়া ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করলেও হাবিবুর রহমান গুলিবিদ্ধ অবস্থায় খালের পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন রক্ষা করেন। অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়ে তিনি দুদিন পর বাড়ি ফিরে আসেন। শহীদ ইউসুফ মিয়ার লাশ পাওয়া যায়নি।

>> ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর দুপুর অনুমান ২টার সময় আসামিদের নেতৃত্বে ১৫/২০ সশস্ত্র রাজাকার স্বনামধন্য চিকিৎসক রমেশচন্দ্র ভৌমিককে নোয়াখালী জেলার তৎকালীন সুধারাম (বর্তমানে কবিরহাট থানা) থানাধীন রামেশ্বরপুর গ্রামের নিজ বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে অপহরণ করে চাপরাশির হাট রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যায়। রাজাকারেরা ডাক্তার রমেশচন্দ্র ভৌমিককে ক্যাম্পে আটক রেখে অমানুষিক নির্যাতন করে। আসামিরা পরের দিন ভোর রাতে রমেশচন্দ্র ভৌমিককে কবিরহাট থানাধীন ১৯ নং সুইস গেইটে নিয়ে গুলি করে হত্যার পর লাশ খালের পানিতে ফেলে রাখেন। শহীদ রমেশচন্দ্র ভৌমিকের লাশ পাওয়া যায়।

এফএইচ/এসআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]