রফিক-উল হকের প্রথম মামলা, হাজার টাকার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদ বিক্রি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:৩০ পিএম, ২৫ অক্টোবর ২০২০

সদ্য প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের আইন পেশার প্রথম মামলা ছিল তার বন্ধুর শিক্ষক মামার। যাকে (বন্ধুর মামাকে) দেশ বিক্রির দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনি (বন্ধুর মামা) ছিলেন একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তার বিরুদ্ধে আনা মামলার অভিযোগ ছিল, এক হাজার টাকার বিনিময়ে কোনো এক পাকিস্তানির কাছে মুর্শিদাবাদ বিক্রি।

সেই মামলায় আসামিকে আদালত জামিন ও রুল দিয়েছিলেন। আদালতের শুনানিতে ছিলেন ব্যারিস্টার রফি-উল হক। তিনি আইন বিচার ও সংবিধান বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ)ম্যাগাজিনে লেখা জীবনীতে রফিক-উল হক এমন তথ্য দিয়েছিলেন।

এরপর পর্যায়েক্রমে তিনি হাজার হাজার মামলা পরিচালনা করেছেন আইনজীবী হিসেবে। এরই মধ্যে দেশে-বিদেশে সুদীর্ঘ ৬০ বছর ধরে আলো ছড়িয়েছেন আইন ও বিচারাঙ্গনে। বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করেছেন বর্ষীয়ান এই আইনজীবী।

এভাবে বিচারাঙ্গনে আলো ছড়ানো সেই প্রদীপ নিভে গেল গত শনিবার। আইনের বাতিঘর ব্যারিস্টার রফিক-উল হক রেখে গেলেন নানান স্মৃতি ও কর্ম।

অর্ধযুগ আগে ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম প্রকাশ করেছিল ‘সংবিধান ও বিচার বিভাগের ৪০ বছর’ শীর্ষক একটি স্যুভেনির। সেখানে এক প্রবন্ধে তিনি তার জীবনের কিছু অংশ নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছিলেন।

আইন পেশার শুরুর দিকের স্মৃতিচারণে তিনি বলেছিলেন, “কলকাতা থেকে এমএ ও এলএলবি পাস করার পর ১৯৬০ সালে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে প্র্যাকটিস শুরু করি। আমার প্রথম মামলাটি ছিল ইন্টারেস্টিং। মজা করে নাম দেওয়া যায় ‘মামার মামলা’।”

‘আমার এক বন্ধুর মামাকে দেশ বিক্রির দায়ে গ্রেফতার করেছিল সরকার। তিনি ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, এক হাজার টাকার বিনিময় কোনো এক পাকিস্তানির কাছে মুর্শিদাবাদ বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি। মামলা শুনে আদালত জামিন ও রুল দিলেন। বিচারক বললেন, ইফ মুর্শিদাবাদ ক্যান বি সোল্ড বাই ওয়ান ওয়ান থাউজেন্ড টাকা, লেট ইট বি সোল্ড। আমি বলেছিলাম- ইয়েস, মুর্শিদাবাদ ক্যান নট বি সোল্ড। ’

বিভিন্ন আইন প্রণয়নের বিষয়ে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, ‘সরকারের ব্যাংক সংক্রান্ত আইন থেকে শুরু করে নানা আইনি সহযোগিতা দিয়েছি অকুণ্ঠচিত্তে। কোনো সরকারকে আলাদা করে দেখিনি। রাষ্ট্র বা জনগণের কাজ বলে মনে করে আসছি। ’

শুধু দেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও আইন প্রণয়নে সহযোগিতা দিয়েছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। সে বিষয়ে তিনি লেখেন, ‘শুধু দেশেই নয়, বেশ কয়েকটি বিদেশি রাষ্ট্রকেও আইনি সহযোগিতা দেয়ার সুযোগ হয়েছে আইনজীবী জীবনে। যেমন মালদ্বীপের অনেক আইনই আমার হাতে করা।’

অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার বিষয়ে স্মৃতিচারণে তিনি বলেন, ‘বেশ কয়েকবার ফিরিয়ে দিয়েও ১৯৯০-এ অল্প দিনের জন্য রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তার দায়িত্ব নিতে হয়েছিল আমাকে। মাসিক এক টাকা টোকেন বেতনে সে দায়িত্ব নেই। অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়ার পরপরই একসঙ্গে প্রায় দুই হাজার ডিটেনশনকে (আটক ব্যক্তি) ছেড়ে দিলাম। আদালতে গিয়ে তালিকা দিতাম। বলতাম এগুলো ইললিগ্যাল অর্ডার। এগুলো ছেড়ে দিন। তখন ছিলেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান। তিনি বলতেন, আপনি কি করে দেখলেন? আমি বলতাম আমি দেখেছি। ১২ ও ১৭ নম্বর বাদে বাকি সবগুলো ছেড়ে দিন। সব ইললিগ্যাল অর্ডার। আমি বিশ্বাস করি, অ্যাটর্নি জেনারেল ইজ নট ফর দা পার্টি। হিজ ডিউটি টু এক্সপ্লেন দ্যা ল’ বিফোর দ্যা কোর্ট, অ্যান্ড নট টু ডিফেন্ড এনি এভরি অর্ডার পাসড বাই দ্যা গর্ভনমেন্ট। ’

‘আইন পেশার পাশাপাশি শুরু থেকেই সাধ্যমত কিছু সমাজসেবা করে আসছি। কিন্তু তার বিনিময় নিজের বা পরিবারের জন্য কখনও কিছু চাইনি প্রচারের জন্য কোন বাড়াবাড়ি করিনি’, বলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক।

সর্বোচ্চ আদালতের এ আইনজীবীর জন্ম ব্রিটিশ ভারতের কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর। বাবা মুমিন-উল হক পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। মা নূরজাহান বেগম।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে আটটার দিকে রাজধানীর মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

এফএইচ/এমএসএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]