সোনারগাঁ রিসোর্টের মাটি ভরাটকে হাইকোর্টের অবৈধ ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৩৭ পিএম, ০২ ডিসেম্বর ২০২০
ফাইল ছবি

মেঘনা নদীর অংশবিশেষে এক হাজার ৮৬৮ বিঘা জমিতে ৬টি মৌজায় সোনারগাঁ প্রপার্টি রিসোর্ট সিটি ও তথাকথিত সোনারগাঁ ইকোনোমিক জোন কর্তৃক মাটি ভরাটকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ের বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) আইনজীবী সাঈদ আহমেদ কবির। ওই রিসোর্টের মালিকানায় রয়েছেন মো. নূর আলী নামক এক ব্যক্তি।

আদালত শিল্পপতি মো. নুর আলীর মালিকানাধীন এই দুটি প্রতিষ্ঠানসহ ওই এলাকায় আর যেসব প্রতিষ্ঠান কৃষি, নদীর জলাভূমি ও নিচুভূমি ভরাট করেছে তাদের মাটি সরিয়ে ৬ মাসের মধ্যে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ ধার্য করে তা মাটি ভরাটকারীর কাছ থেকে আদায় করে দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

জমির হিসাবের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, সেখানে প্রায় একশত ২০ একর জমি রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার ৬টি মৌজায় (পিরোজপুর, জৈনপুর, ছয়হিস্যা, চরভবনাথপুর, বাটিবন্ধ এবং রতনপুর) অবস্থিত কৃষিজমি, নিচুভূমি, জলাভূমি, মেঘনা নদীর অংশবিশেষ।

সোনারগাঁয়ের ৬টি মৌজায় কৃষিজমি, নিচুজমি ভরাট করে ইউনিক গ্রুপের ইউনিক প্রপার্টিজ ‘সোনারগাঁ রিসোর্ট সিটি’ নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়ে বেলার আবেদনের শুনানি শেষে বুধবার (২ ডিসেম্বর) হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি রাজীক আল জালীলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এই রায় দেন।

আদালতে আজ বেলার পক্ষে আইনজীবী ছিলেন- ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল, অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মিনহাজুল হক চৌধুরী, আলী মুস্তফা খান ও সাঈদ আহমেদ কবীর। অপরদিকে ছিলেন- মুরাদ রেজা, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম, আবু তালেব প্রমুখ।

আদালত বলেছেন, ইকোনমিক জোন করতে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করার আগে নদী রক্ষা কমিশন থেকে অনাপত্তি এবং পরিবেশ অধিদফতর থেকে ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হবে।

আইনজীবীরা জানান, নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার ৬টি মৌজার কৃষিজমি, জলাভূমি ও মেঘনা নদীর অংশ ভরাট করে ‘সোনারগাঁও রিসোর্ট সিটি’ এবং ‘সোনারগাঁও ইকোনমিক জোন’ নির্মাণ কার্যক্রমকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এ বিষয়ে সোনারগাঁও রিসোর্ট সিটি ও সোনারগাঁও ইকোনমিক জোন কর্তৃপক্ষের আইনজীবী আহসানুল করিম সাংবাদিকদের বলেন, হাইকোর্ট তার রায়ে বলেছেন, সোনারগাঁও রিসোর্ট সিটি ও সোনারগাঁও ইকোনমিক জোনের কোনো অংশ যদি অবৈধভাবে ভরাট করা হয়ে থাকে, অবৈধভাবে কোনো কৃষকের জমি বা খাস জমি দখল করে থাকে এবং সেই জমি ভরাট করার কারণে যদি কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে তদন্তসাপেক্ষে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

এর প্রেক্ষিতে আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম আদালতকে বলেন, ওই জোনের অধীনে বরাদ্দকৃত জমির মধ্যে কখনওই অবৈধভাবে কোনো মাটি ভরাট করা হয়নি, কখনওই কোনো কৃষকের জমি, খাস ও ফসলের জমি ভরাট করা হয়নি, দখলও করা হয়নি। তবে এক্ষেত্রে যদি কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে জোন কর্তৃপক্ষ তার দায় গ্রহণ করবে।

এ বিষয়ে আদালত বলেছেন, যদি সোনারগাঁও ইকোনমিক জোন লিমিটেড কর্তৃপক্ষ দালিলিকভাবে লাইসেন্সের অনুমতি পান, তাহলে পরিবেশ অধিদফতরের যথাযথ অনুমতি নিয়ে এই ভূখণ্ডের উপরই তার ইকোনমিক জোনের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবেন।

ইউনিক প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁ উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের পিরোজপুর, জৈনপুর, ছয়হিস্যা, চরভবনাথপুর, বাটিবান্ধা এবং রতনপুর মৌজার কৃষিজমি, জলাভূমি, মেঘনা নদীর অংশ ভরাট করে সোনারগাঁ রিসোর্ট সিটি প্রকল্প নির্মাণ করছিল। এই নির্মাণ কার্যক্রম অবৈধ ঘোষণার জন্য বেলা ২০১৪ সালে রিট আবেদন করে। এ আবেদনে ওই বছরের ২ মার্চ হাইকোর্ট প্রকল্প এলাকার মাটি বা বালি ভরাটের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ইতোমধ্যে ভরাটকৃত ভূমি হতে মাটি/বালি অপসারণের নির্দেশ দেন। পাশাপাশি রুল জারি করেন।

এই আদেশের পর কিছু এলাকা থেকে মাটি ও বালি সরিয়ে জমি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু আদেশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে একই কোম্পানি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। ওই এলাকায় সরকার মাটি ভরাটের অনুমতি দিয়েছে দাবি করে আগের আদেশ অকার্যকর ঘোষণা চেয়ে হাইকোর্টে ২০১৬ সালে আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট লি.। এ আবেদনে হাইকোর্ট ওই বছরের ২৫ অক্টোবর মাটি ভরাট কার্যক্রম পরিচালনার আদেশ দেন।

এ আদেশের বিরুদ্ধে বেলা আপিল করলে আপিল বিভাগ ওই বছরের ৩ নভেম্বর এক আদেশে হাইকোর্টের পূর্বের আদেশ (২০১৬ সালের ২৫ অক্টোবরের আদেশ) স্থগিত করেন। এরপরও ওই এলাকায় মাটি ভরাট কাজ অব্যাহত রাখা হলে বেলা ২০১৯ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালত অবমাননার মামলা করে। নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক হাইকোর্টে হাজির হয়ে অঙ্গীকার করেন যে মাটি ভরাট প্রতিহত করবেন।

এরপর বন্ধ হয়ে যায় মাটি ভরাট। এরপর আবারও ইউনিক প্রপার্টিজ মাটি ভরাট কাজ শুরু করলে ফের আদালত অবমাননার মামলা করা হয়। এরপরও সেখানে মাটি ভরাট অব্যাহত থাকলে বেলা ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই হাইকোর্টে আবেদন করে। হাইকোর্ট আবেদনটি নথিভুক্ত করার আদেশ দিলে তার বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে বেলা। এ আবেদনে আপিল বিভাগ ২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট এক আদেশে মাটি ভরাট কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন।

এ আদেশ প্রতিপালন হয়েছে কি না- সে বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হয়। জেলা প্রশাসক ওই বছরের ৮ নভেম্বর আপিল বিভাগে হাজির হয়ে জানান, সংশ্লিষ্ট এলাকায় মাটি ভরাট কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

তার বক্তব্যের সমর্থনে তিনি কিছু ছবি দেখান। এ প্রেক্ষাপটে ওই বছরের ১৫ নভেম্বর আপিল বিভাগ বিষয়টি হাইকোর্টে দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন। এ অবস্থায় হাইকোর্টে রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে রায় দেওয়া হলো আজ।

এফএইচ/এফআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]