নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে পার পেলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ডাক্তার-পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:১৭ এএম, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসীরনগরে ধর্ষণের অভিযোগে করা মামলায় প্রশ্নবিদ্ধ তদন্তের জন্য হাইকোর্টে এসে ‘ভুল স্বীকার’ করেছেন পুলিশ কর্মকর্তা। আর এ ঘটনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। পরে তাদেরকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত।

আদালতের তলবের নির্দেশে তারা বৃহস্পতিবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন ও বিচারপতি একেএম জাহিদ সারওয়ার কাজলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে সশরীরে উপস্থিত হয়ে ক্ষমা চাওয়ার পরে এ বিষয়ে আদেশ দেন আদালত।

আদালতে আজ রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন। তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মনিরুল ইসলাম, চিকিৎসদের পক্ষে আইনজীবী বাকির উদ্দিন ভূইয়া এবং আসামির পক্ষে হাইকোর্ট থেকে নিযুক্ত সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইডের আইনজীবী কুমার দেবুল দে।

অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, ‘ধর্ষণের শিকারের ঘটনায় ডাক্তারি পরীক্ষা এবং মামলার তদন্তে ভুল স্বীকার করে হাইকোর্টের কাছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন ও পুলিশ সুপারের পক্ষ থেকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া হয়েছে। আদালত তাদেরকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়ে ১১ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন রেখেছেন।’

এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে ৭ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ১১ বছরের (ডাক্তারি সনদ অনুযায়ী) আরেক শিশুর বিরুদ্ধে গত ১১ সেপ্টেম্বর থানায় মামলা করেন ভিকটিমের বাবা। তবে ওই মামলায় আসামির বয়স উল্লেখ করা হয় ১৫ বছর। একপর্যায়ে মামলার আসামি আগাম জামিন আবেদন করেন হাইকোর্টে।

সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট গত ৩ নভেম্বর আসামিকে ৬ সপ্তাহের আগাম জামিন দেন এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে এক মাসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করার নির্দেশ দেন। এছাড়া মামলার সিডি ও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্ত কর্মকর্তা ও নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাইকোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করেন।

এরপর গত ১৭ জানুয়ারি এক আসামির জামিন শুনানিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে শিশু ধর্ষণের এক ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর তিনটি মেডিকেল রিপোর্ট ও একটি ছাড়পত্রে অসামঞ্জস্যতার পরিপ্রেক্ষিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন, পুলিশ সুপারসহ ১২ জনকে তলব করেন আদালত।

তলবে উপস্থিত হয়ে নাসিরনগরে শিশু ধর্ষণের ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর তিনটি মেডিকেল রিপোর্ট ও একটি ছাড়পত্রে অসংগতির ঘটনায় ভুল স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন একরাম উল্লাহ।

তিনি আদালতকে বলেন, ‘আমাদের ফরমগুলোর মধ্যে ত্রুটি আছে। আমরা এগুলো সংশোধন করে নেব।’ এ সময় তিনি ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পরে আদালত তাদেরকে সতর্ক করে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেয়। তবে আদালত বলে দেয় যেকোনো সময় আদালত ডাকলে হাজির হতে বাধ্য থাকবেন।

এর আগে সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে শিশু ধর্ষণের এক ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুর তিনটি মেডিকেল রিপোর্ট ও একটি ছাড়পত্রে অসামঞ্জস্যতার ব্যাখ্যা দিতে হাইকোর্টে হাজির হন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সিভিল সার্জন, পুলিশ সুপারসহ ১২ জন। তারা হলেন সিভিল সার্জন ডা. একরাম উল্লাহ, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিছুর রহমান, নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এটিএম আরিচুল হক, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান, ব্রাক্ষণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. একরাম উল্লাহ রেজাসহ অন্যরা।

নথিপত্র থেকে জানা যায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টায় প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিশু (৭) ধর্ষণের শিকার হয়। প্রথমে শিশুটিকে নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা গত ১১ সেপ্টেম্বর নাসিরনগর থানায় এক শিশুর (১২) বিরুদ্ধে মামলা করেন। এই মামলায় শিশুটি হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করেন। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট গত নভেম্বর শিশুটিকে আট সপ্তাহের আগাম জামিন দেন। একই সঙ্গে তদন্তকাজ শেষে এক মাসের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে তদন্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন আদালত।

এর ধারাবাহিকতায় তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার সিডি (কেস ডকেট) আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। মেপিকেল রিপোর্ট ও তদন্ত রিপোর্টে এমন অসঙ্গতি দেখে আদালত এসব নির্দেশনা দেন।

শুনানিতে হাইকোর্ট অসামঞ্জস্যপূর্ণ ডাক্তারি পরীক্ষার রিপোর্ট, গুরুত্বপূর্ণ শব্দের বানান ভুল ও নারী-পুরুষের রিপোর্টের ফর্ম অভিন্ন করায় উপস্থিত চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘হাসপাতালে হাজিরা দেয়ার জন্য এসে আমাদের জীবন আপনাদের ক্লার্ক, পিয়নদের হাতে ছেড়ে দিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে ব্যস্ত হলে তো এমন হবেই। তবে আপনাদের কাছ থেকে এটা প্রত্যাশিত নয়। তখন এঘটনার জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চান সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। এরকম আর কখনো হবে না বলে তারা প্রতিশ্রুতি দেন।’

এফএইচ/ইএ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]