এক জমি একাধিকবার বিক্রি, রুবেল বললেন ‘কাউকে ঠকাইনি’

জাহাঙ্গীর আলম
জাহাঙ্গীর আলম জাহাঙ্গীর আলম , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:১৮ পিএম, ১৪ মার্চ ২০২১
চিত্রনায়ক মাসুম পারভেজ রুবেল

সাভারের আশুলিয়ায় ‘খান জাহান আলী মডেল টাউন’ নামে একটি হাউজিং প্রকল্পের জমি বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয় বিভিন্ন মাধ্যমে। সেই বিজ্ঞপ্তি দেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীসহ ২৪ জন জমিটি ক্রয় করেন। জমিতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করায় তা গুঁড়িয়ে তাদের প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়। আবার সেই জমি মেসার্স ডংলিয়ান ফ্যাশনস বিডি লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে তাদের মালিকানা বুঝিয়ে দেয়া হয়।

একই জমি এভাবে একাধিকবার বিক্রির অভিযোগে চিত্রনায়ক মাসুম পারভেজ রুবেলসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী আবুল হোসেনের করা এ মামলার তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, একই জমি বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার মাধ্যমে একাধিকবার ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে। তদন্তে সাক্ষ্য-প্রমাণে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। যদিও মামলায় জামিনে থাকা রুবেলের দাবি, তিনি পরিস্থিতির শিকার, তিনি কাউকে ঠকাননি।

তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করা হয় মামলাটি। এতে মাসুম পারভেজ রুবেল (৫০) ছাড়াও আসামি হন তার কথিত ছাত্র বুলবুল ইসলাম (৩৬), রেজাউল ইসলাম ওরফে রিয়া (৩৫), মর্তুজা আলী (৮৫), হাসিবুল কবির মঞ্জু (৫২), মহিনুল ইসলাম ওরফে মনু (৪২), রবিউল কবির (৫৪), আতিকুল কবির মিয়া ওরফে টিটু (৪৩), আলমগীর হোসাইন (৫০), রানু মণ্ডল (৩৮), কোহিনুর দেওয়ান (৫১), সিরাজুল ইসলাম (৪৬), রেন ওয়েডং, হুমায়ূন কবির ও আল-মামুন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, বিবাদী রুবেল, বুলবুল, রেজাউল, মর্তুজা, হাসিবুল, মহিনুল, রবিউল, আতিকুল, আলমগীর, রানু, কোহিনুর, সিরাজুল, রেন, হুমায়ূন ও আল-মামুন প্রতারক জাল-জালিয়াত চক্রের সদস্য।

২০১১ সালের ৪ এপ্রিল মামলার বিবাদী মর্তুজার কাছ থেকে আম-মোক্তারনামা পেয়ে রুবেল, বুলবুল ও রেজাউল আশুলিয়া থানাধীন বাইপাইল মৌজায় ১৭৪ শতাংশ ভূমিতে খান জাহান মডেল টাউন নামীয় হাউজিং প্রকল্প করে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেন। বিজ্ঞাপন দেখে মামলার বাদী ও সাক্ষীরা জমি পরিদর্শন করেন। এরপর ৮৪.৭৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন বাদী ও সাক্ষীরা। তারা জমির দখল বুঝে পেয়ে প্লটের চারদিকে সীমানা দেয়াল নির্মাণ করে ভোগদখল করতে থাকেন। রুবেল ও বুলবুল বাদীসহ অন্যদের জমির নামজারি করার জন্য তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে নামজারি না করে সব টাকা আত্মসাৎ করেন।

jagonews24

বাদী-সাক্ষীদের অজ্ঞাতসারে রুবেল, বুলবুল ও রেজাউল গং বিবাদীদের প্ররোচনায় মর্তুজা আলী সেই জমির মালিক না হয়েও ২০১৪ সালের ২৬ এপ্রিল জাল দলিল করেন। এরপর বিবাদীরা বিক্রয় হস্তান্তরের মাধ্যমে অবৈধ ও অনৈতিক আর্থিক সুবিধা লাভের জন্য রানুকে ২০১৫ সালের ১৫ জুন আম-মোক্তারনামা দলিল নিযুক্ত করেন। রানু বাদী ও সাক্ষীদের দখলীয় জমি ১৪ নং বিবাদীর সঙ্গে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে রেজিস্ট্রি বায়না করেন। ১৪ নং বিবাদীর বায়না দলিলমূলে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট বাদী ও সাক্ষীদের দখলীয় জমিতে দেয়াল ও ইমারত নির্মাণের চেষ্টা করেন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেন। পরে বাদী ও সাক্ষীদের দখলীয় জমিতে জোর করে প্রবেশ করে সীমানা দেয়াল নির্মাণ ও ইমারত নির্মাণ অব্যাহত রাখেন।

পিবিআইয়ের তদন্তে অভিযুক্ত তিনজন, নারাজি বাদীর

আদালতের নির্দেশে মামলার অভিযোগ তদন্ত করে ২০১৮ সালের ৫ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুব আলম আসামি বুলবুলসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন।

প্রতিবেদনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, বাদীর আনীত অভিযোগ বিবাদী বুলবুল ইসলাম ও মর্তুজা আলীর বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৪-৬/৪২০/৪৬৭/৪৭১ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। অন্যান্য আসামির বিরুদ্ধে বাদীর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

পিবিআইয়ের ওই প্রতিবেদনের ওপর নারাজি দেন মামলার বাদী। নারাজিতে তিনি উল্লেখ করেন, মামলাটি সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়নি। মামলার মূল অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছে।

পরে ওই বছরের ১৮ জুলাই বাদীর দেয়া নারাজি গ্রহণ করে সিআইডি পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর চিত্রনায়ক রুবেলসহ আট আসামি আদালত থেকে জামিন নেন। বাকি আসামি বুলবুল, রেজাউল, মর্তুজা, আলমগীর ও রানু পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা রয়। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের জন্য ৬ এপ্রিল দিন ধার্য রয়েছে। মামলার পরবর্তী শুনানির দিনও ধার্য রয়েছে ওই তারিখে।

সিআইডির তদন্তে অভিযুক্ত রুবেলসহ ১৩ জন

আদালতের নির্দেশে তদন্তের পর ২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি চিত্রনায়ক রুবেলসহ ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করেন সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার রেজাউল হক।

jagonews24

প্রতিবেদনে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বাদীর অভিযোগে বর্ণিত কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকা জেলার আশুলিয়া থানাধীন বাইপাইল মৌজার এসএ-২, এসএ-৩৫২ দাগে মোট ১৭৪ শতাংশ জমির মধ্যে ১৩২ শতাংশের মালিক টেনু মণ্ডল। বিবাদী মর্তুজা আলী ১৯৬৭ সালের ৩ জানুয়ারি হরিরামপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সাবকবলা ১৭৪ শতাংশ জমি ক্রয় করে নিজ দখলে রাখেন। ২০০৯ সালের ৩০ এপ্রিল তিনি তার দলিল বিবাদী রুবেল, বুলবুল ও রেজাউল বরাবর সাভার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আম-মোক্তারনামা মূলে হস্তান্তর করেন। এরপর বিবাদীরা খান জাহান মডেল টাউন লিমিটেড নামে হাউজিং প্রকল্প তৈরি করেন।

খান জাহান মডেল টাউন প্রকল্পে বিবাদীরা ৪১টি প্লট করে সেগুলো বিক্রির জন্য স্থায়ীভাবে পোস্টারিং ও প্রচারণা চালান। মামলার বাদী ও অধিকাংশ সাক্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী (পিয়ন ও নাইটগার্ড)। তারা বিজ্ঞাপন দেখে প্লটগুলো পরিদর্শন করেন এবং ক্রয়ের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ওই সময় বাদী ও সাক্ষীরা বিবাদী রুবেল, বুলবুল ও রেজাউলদের সঙ্গে আলোচনা করে দরদাম ঠিক করেন। বাদী ও সাক্ষীরা ৮৪.৭৫ শতাংশ জমির মূল্য ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বিবাদীদের দেন। তাছাড়া জমির খাজনা বাবদ বিবাদীদের আরও তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা দেন। মোট ৫৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা বিবাদীদের দেন তারা।

জমির মূল মালিক মর্তুজা আলী প্রতারণার মাধ্যমে আগের দেয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল বাতিল করে ২০১৪ সালের ২৮ মে পুনরায় সাব-কবলা দলিল নং-৭৫১৫/১৪ মূলে রুবেল, হাসিবুল, মহিনুল, রেজাউল, রবিউল, রানু, আতিকুল, কোহিনুর, আলমগীরের কাছে ১৭৪ শতাংশ জমি ৪৯ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। এরপর বিবাদীরা ২০১৫ সালের ১২ অক্টোবর মেসার্স ডংলিয়ান ফ্যাশনস বিডি লিমিটেডের পক্ষে কোম্পানির চেয়ারম্যান রেন ওয়েডংয়ের কাছে তা বিক্রি করেন। বর্তমানে ক্রয়ের পর মেসার্স ডংলিয়ান ফ্যাশনস বিডি লিমিটেড ওই জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণ করে ভোগদখলে আছে।

মামলার তদন্তে বাদী ও সাক্ষীদের কাছ থেকে আরও জানা যায়, ২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট বিবাদীরা স্থানীয় উশৃঙ্খল লোকদের সহায়তায় বাদী ও সাক্ষীদের সীমানা চিহ্নিত প্লটগুলোর সীমানা ভেঙে সব জমি দখল করে নেয়। বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণার মাধ্যমে জমি একাধিকবার ক্রয়-বিক্রয় হয়েছে।

তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণে বিবাদী মাসুম পারভেজ রুবেল, বুলবুল ইসলাম, রেজাউল ইসলাম ওরফে রিয়া, মর্তুজা আলী, হাসিবুল কবির মঞ্জু, মহিনুল ইসলাম ওরফে মনু, রবিউল কবির, আতিকুল কবির মিয়া ওরফে টিটু, আলমগীর হোসাইন, রানু মণ্ডল, কোহিনুর দেওয়ান, সিরাজুল ইসলাম ও রেন ওয়েডংয়ের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ৪৪৭/৪২৭/৪০৬/৪২০ ধারার অপরাধ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রতীয়মান হয়। বিবাদী হুমায়ূন কবির ও আল-মামুনের বিরুদ্ধে বাদীর আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।

যা বলছেন বাদী ও বিবাদীরা

এ বিষয়ে মামলার বাদী আবুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি করেছি। পেনশনের টাকা দিয়ে আমি নায়ক রুবেলের কাছ থেকে জমি কিনেছি। কিন্তু রুবেলসহ অন্যরা দুই জায়গায় জমি বিক্রি করেছেন। তারা আমাদের সর্বস্বান্ত করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘রুবেলসহ অন্যরা খান জাহান আলী মডেল টাউন প্রকল্প চালু করে বিক্রির জন্য বিজ্ঞপ্তি দেন। আমরা বিজ্ঞপ্তি দেখে জমি ক্রয় করি। রুবেল আমাদের পাঁচটি দলিল রেজিস্ট্রি করে দিয়েছিলেন। বাকিগুলো বুলবুল দিয়েছেন। এরপর তারা আবারও মেসার্স ডংলিয়ান ফ্যাশনস বিডি লিমিটেডের কাছে জমি বিক্রি করে তাদের মালিকানা বুঝিয়ে দেন। আমরা ২৪ জন মিলে এ জমি কিনেছিলাম। আজ আমরা সর্বস্বান্ত। আমরা এর বিচার চাই।’

এ ব্যাপারে মামলার এক নম্বর আসামি চিত্রনায়ক মাসুম পারভেজ রুবেল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি পরিস্থিতির শিকার। আমার ছাত্র বুলবুল আমাকে বুঝিয়ে এ ব্যবসায় আনে। তাকে বিশ্বাস করা আমার বড় ভুল হয়েছে। আমি জমি কোথায় সেটাও জানি না। আমি কোনো অন্যায় করিনি। কাউকে ঠকাইনি।’

জেএ/এমএসএইচ/এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]