২ হাজার টাকার টিউব লাখ টাকায় কেনার ঘটনা অনুসন্ধানে লিগ্যাল নোটিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৫২ পিএম, ২৯ জুলাই ২০২১
ফাইল ছবি

সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মেডিকেল সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতির ভয়ঙ্কর চিত্র উঠে আসার পেছনে দায়ীদের খুঁজে বের করতে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানের দাবিতে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

নোটিশে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি), দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকৌশলী ও সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিন্সিপালসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে।

এর আগে গত ১১ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে জনস্বার্থে আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আনিচুর রহমানের পক্ষে বুধবার (২৮ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের অপর আইনজীবী অ্যাডভোকেট চঞ্চল কুমার বিশ্বাস এ লিগ্যাল নোটিশ পাঠান। নোটিশ পাঠানোর বিষয়টি বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) অ্যাডভোকেট চঞ্চল কুমার বিশ্বাস জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন।

অ্যাডভোকেট মো. আনিচুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘নোটিশ হাতে পাওয়ার সাতদিনের মধ্যে এসব কেনাকাটার সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করতে এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় অনুসন্ধানের জন্য বলা হয়েছে। তা না হলে আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হবে।’

এর আগে গত ১১ জুলাই “২ হাজার টাকার ‘টিউব’ ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায়” শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রক্ত পরীক্ষায় ব্যবহৃত ছোট্ট একটি টিউবের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দুই হাজার টাকা। এ হিসাবে ৫০টি টিউব কিনতে লাগার কথা ১ লাখ টাকা। কিন্তু সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যার হাসপাতাল তা কিনেছে ৬৭ লাখ ৪০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি টিউবের পেছনে প্রতিষ্ঠানটি ব্যয় দেখিয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। অথচ বাজারে এ ধরনের টিউব ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়।

মেডিকেল সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতির এমন ভয়ঙ্কর চিত্র উঠে এসেছে খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অডিট আপত্তিতে। শুধু তা-ই নয়, বাজারে যে ডিসেক্টিং টেবিল ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দরে পাওয়া যায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একই ধরনের দুটি টেবিল কিনেছে প্রায় ৬৯ লাখ ৯০ হাজার টাকায়। অর্থাৎ একটি টেবিলের দাম পড়েছে ৩৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। অথচ বাজারে এ ধরনের টেবিল ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায় অহরহ পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ডা. কৃষ্ণ কুমার পাল জানান, অডিট আপত্তির বিষয়ে তারা তাদের জবাব দিয়েছেন। বাড়তি অর্থ ব্যয়ের যে বিষয় বলা হয়েছে, তা চালানের মাধ্যমে ফেরত দেয়া হয়েছে। টাকা ফেরতের পক্ষে সঠিক কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের (আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অডিট অনুবিভাগের) অতিরিক্ত সচিব শাহাদাত হোসেন জানান, ২০২০ সালে তাদের করা অডিট এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। আপত্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে জবাব চাওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোলে ২০১৪ সালে জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এম মনসুর আলীর নামে হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর ২০১৯ সালে এটির যন্ত্রপাতি ও আসবাব কেনাকাটায় প্রায় ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এরপর তদন্তে নেমে দুর্নীতির সত্যতা পেয়ে হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ডা. কৃষ্ণ কুমার পালসহ দুজনের বিরুদ্ধে গত বছর ৯ আগস্ট মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পাবনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়।

মামলায় তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ৩০ কোটি ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৯০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। ডলার ও ইউরো করে এসব অর্থ হংকং পাঠানোর দায়ে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দুদকের এ মামলায় এখনো অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি। ওই দুর্নীতির রেশ কাটতে না কাটতেই ফের অস্বাভাবিক দামে সরঞ্জাম কেনার অভিযাগ ওঠে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অডিট আপত্তিতেও।

শহীদ এম মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতি পিস আরবিসি কাউন্টার কিনেছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮০০ টাকায়। কিন্তু স্বয়ং স্বাস্থ্যের অডিট আপত্তিতে বলা হয়েছে, বাজারে আরবিসি কাউন্টারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য দুই হাজার টাকা। আরবিসি কাউন্টারের মূল্য জানতে ঢাকায় চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রির সর্ববৃহৎ পাইকারি মার্কেট বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে গিয়ে এ প্রতিবেদক দামে বিস্তর ফাঁরাক পান।

অডিট বলছে, দুটি ডিসেক্টিং ও একটি অটোপসি টেবিল কিনতে হাসপাতাল ৯৪ লাখ ১৩ হাজার টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করেছে। সরকারি মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগে ব্যবহৃত এ ধরনের অটোপসি টেবিলের সর্বোচ্চ দাম ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। বাজারে যাচাই করে দেখা যায়, ১০ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে ভালো মানের অটোপসি টেবিল পাওয়া যায়।

এফএইচ/এমআরআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]