প্রথমদিন দুই মেয়ের সঙ্গে জাপানি মা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:১৫ পিএম, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১

জাপানি মা নাকানো এরিকো ও বাবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক শরীফ ইমরানকে দুই মেয়ের সঙ্গে একদিন একদিন করে থাকার অনুমতি দিয়েছেন হাইকোর্ট। সেই হিসেবে শুক্রবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুই মেয়ের সঙ্গে ওই বাসায় অবস্থান করছেন মা।

শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে দুই শিশুর সঙ্গে তাদের মা রয়েছেন বলে দুপুরে জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেছেন মায়ের পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তিনি বলেন, আগামীকাল শনিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টা থেকে দুই শিশুর সঙ্গে থাকবেন তাদের বাবা।

ইমরান শরীফ ও নাকানো এরিকোর আবেদনের শুনানি নিয়ে বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এ অনুমতি দেন। এ ছাড়া সমঝোতার জন্য জাপানি মা ও বাংলাদেশি বাবার আইনজীবীসহ উভয়পক্ষকে আরও ১২ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর পরবর্তী আদেশ দেওয়া হবে।

এ সময় পর্যন্ত উভয়পক্ষের (বাব-মার) মধ্যে সমঝোতার জন্য সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদকে দায়িত্ব দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে ওইদিন পর্যন্ত জাপানি মা নাকানো এরিকোর করা রিট আবেদনের ওপর শুনানি মুলতবি করা হয়েছে।

আদালত বলেছেন, আমরা আশা করি বাচ্চাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একটি সুন্দর সমাধান হবে। এতে বহির্বিশ্বের কাছে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে।

দুই কন্যাশিশুকে নিয়ে জাপানে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে বৃহস্পতিবার (১৬ সেপ্টেম্বর) আবেদন করেন মা নাকানো এরিকো। আবেদনে বলা হয়, এই অনুমতি পেলে গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে মেয়েদের নিয়ে বাংলাদেশে আসবেন মা। মেয়েরা বাবার সঙ্গে সময় কাটাবে। আর বাবা ইমরান শরীফের জাপানে যে ঋণ আছে তা মা দেবে এবং তার বিরুদ্ধে জাপানে যে মামলা রয়েছে তা তুলে নিতে পদক্ষেপ নেবে মা।

তাতেও যদি রাজি না হন, তাহলে তৃতীয় কোনো দেশে বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন বাবা। সেখানে যাবতীয় খরচ মা বহন করবেন। আইনজীবী শিশির মনির এ আবেদন উপস্থাপন করেন। এছাড়া তিনি মা ও বাবার জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করে দেওয়ার নিবেদন জানান।

তবে ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ এর বিরোধিতা করে বলেন, শিশু দুটিকে একবার জাপানে নিয়ে যেতে পারলে আর তাদের বাংলাদেশে আনা যাবে না। আমাদের আদালতের আদেশ তারা মানবেন না। তিনি বলেন, বাচ্চারা বাংলাদেশেই থাকুক। মা যখন খুশি এসে দেখা-সাক্ষাৎ করতে পারবেন। মা যখন বাংলাদেশে আসবেন তখন প্রয়োজন হলে বাবা প্লেনের টিকিট কেটে দেবেন। সব ব্যবস্থাই বাবা করবেন।

তিনি মা-বাবার জন্য আলাদা সময় নির্ধারণের আবেদনের বিরোধিতা করে বলেন, সমঝোতার স্বার্থে এখন যে অবস্থা আছে সে অবস্থায়ই রাখা হোক। উভয়পক্ষের শুনানিকালে আদালত বলেন, মা-বাবার কারণে আজ বাচ্চা দুটি সমস্যার মধ্যে রয়েছে। তারাই মূল ভিকটিম। তাই এর একটি সমাধান হওয়া দরকার।

এর আগে হাইকোর্টের একই বেঞ্চ গত ৮ সেপ্টেম্বর এক আদেশে ৯, ১১, ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর চারদিন দিনগত রাতে মেয়েদের সঙ্গে মাকে এবং অন্য সময় মা ও বাবা উভয়েই থাকার অনুমতি দেন। কন্যাশিশু দুটিকে নিয়ে বাইরে ঘোরাঘুরিরও অনুমতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া মেয়ে দুটির মা ও বাবাকে নিয়ে বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে প্রচারিত সব ভিডিও অপসারণে পদক্ষেপ নিতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি এসব ভিডিও নির্মাতা এবং আপলোডকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

জাপান থেকে দুই কন্যাশিশুকে নিয়ে গত ২১ ফেব্রুয়ারি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে আসেন বাবা ইমরান শরীফ। দেশে ফিরে দুই মেয়েকে ঢাকায় কানাডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। এ অবস্থায় গত ১৮ জুলাই মা এরিকো শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে আসেন। এরপর বাংলাদেশের হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন তিনি। এ আবেদনে হাইকোর্টের আদেশের পর গত ২২ আগস্ট রাতে দুই শিশুকে বাবার বাসা নিয়ে তেজগাঁও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখে সিআইডি পুলিশ।

এ অবস্থায় গত ৩১ আগস্ট একই হাইকোর্ট বেঞ্চ সেই দুই কন্যাশিশুকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাপানি মা ও বাংলাদেশি বাবার সঙ্গেই গুলশান এক নম্বরে চার কক্ষের একটি ভাড়া বাসায় থাকার নির্দেশনা দেন। এরপর শিশু দুটিকে তেজগাঁও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার থেকে ওই বাসাতে স্থানান্তর করা হয়। এখন পর্যন্ত ওই বাসাতেই তারা আছেন। শিশু দুটির মা জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকোর করা এক রিট আবেদনের পরিপেক্ষিতে এসব আদেশ দিচ্ছেন হাইকোর্ট।

২০০৮ সালে জাপানি চিকিৎসক নাকানো এরিকো ও বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক শরীফ ইমরান জাপানি আইন অনুযায়ী বিয়ে করে টোকিওতে বসবাস শুরু করেন। তাদের ১২ বছরের সংসারে তিন কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। তারা তিনজনই টোকিওর চফো সিটিতে অবস্থিত আমেরিকান স্কুল ইন জাপানের শিক্ষার্থী ছিল।

চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি শরীফ ইমরানের এরিকোর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ২১ জানুয়ারি ইমরান আমেরিকান স্কুল ইন জাপান কর্তৃপক্ষের কাছে তার মেয়ে জেসমিন মালিকাকে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু এতে এরিকোর সম্মতি না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ ইমরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরপর একদিন জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা স্কুলবাসে বাড়ি ফেরার পথে বাসস্টপ থেকে ইমরান তাদের অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান।

গত ২৫ জানুয়ারি শরীফ ইমরান তার আইনজীবীর মাধ্যমে এরিকোর কাছ থেকে মেয়েদের পাসপোর্ট হস্তান্তরের আবেদন করেন। কিন্তু এরিকো ওই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে মেয়েদের নিজ জিম্মায় পেতে আদেশ চেয়ে গত ২৮ জানুয়ারি টোকিওর পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। আদালত ৭, ১১ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি মেয়েদের সঙ্গে এরিকোর সাক্ষাতের অনুমতি দিয়ে আদেশ দেন।

কিন্তু ইমরান আদালতের আদেশ ভঙ্গ করে মাত্র একবার মায়ের সঙ্গে দুই মেয়েকে সাক্ষাতের সুযোগ দেন। এরপর গত ৯ ফেব্রুয়ারি ‘মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে’ ইমরান তার মেয়েদের জন্য নতুন পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে নিয়ে তিনি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন।

এরপর গত ৩১ মে টোকিওর পারিবারিক আদালত জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে তাদের মা এরিকোর জিম্মায় হস্তান্তরের আদেশ দেন। তবে দুই মেয়ে বাংলাদেশে থাকায় বিষয়টি নিয়ে তিনি বাংলাদেশের একজন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। গত ১৮ জুলাই তিনি শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে আসেন।

এফএইচ/বিএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]