জাপানে থাকা ছোট মেয়েকে হাজির চেয়ে বাবার রিট: শুনানি ২৮ অক্টোবর

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:১৬ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০২১
ফাইল ছবি

দুই শিশুকন্যাকে নিজের কাছে রাখতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া জাপানি নাগরিক মা নাকানো এরিকো এবং বাংলাদেশি বাবা ইমরান শরীফ দম্পতির তৃতীয় সন্তানকে জাপান থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে হাজির করার জন্য নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। এই রিট আবেদনসহ বিষয়টি নিয়ে করা অন্য সব আবেদনের শুনানির জন্য আগামী বৃহস্পতিবার (২৮ অক্টোবর) ঠিক করেছেন হাইকোর্ট।

এই সময়ের মধ্যে জাপানি নাগরিক মা নাকানো এরিকো এবং বাংলাদেশি বাবা ইমরান শরীফের আইনজীবীর যুক্তি-তর্ক লিখিত আকারে জমা দেওয়ার জন্যও বলেছেন আদালত।

একইসঙ্গে রাজধানীর গুলশানের ফ্ল্যাটে থাকা দুই শিশুর সঙ্গে জাপানি মা রাতসহ ২৪ ঘণ্টা থাকতে পারবেন এবং বাবা ইমরান শরীফ শুধু দিনে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন এ সংক্রান্ত আদেশের সংশোধনীর বিষয়েও ওই দিন শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া প্রবেশনারি অফিসারের কাছে থাকা প্রতিবেদনের কপি চেয়ে ইমরান শরীফের আইনজীবীর করা আবেদনের বিষয়েও ওইদিন শুনানি হবে। নাকানো এরিকোর আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বিষয়টি জানিয়েছেন।

শুনানির নির্ধারিত দিনে ইমরান শরীফের আইনজীবীর সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার (২১ অক্টোবর) হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চুয়াল বেঞ্চ এই আদেশে দেন। আদালতে আজ জাপানী নারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। অন্যদিকে ইমরান শরীফের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, অ্যাডভোকেট ফাউজিয়া করিম ফিরোজ। তাদের সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার কাজী মারুফুল আলম।

আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইমরান শরীফের আইনজীবী আজ আগের অর্ডার সংশোধনী চেয়েছেন, সেইসঙ্গে প্রবেশনারি অফিসারের প্রতিবেদন চেয়ে এবং দুইপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য জমা দেওয়ার জন্য বলেছেন আদালত।

দুই শিশুকন্যাকে নিজের কাছে রাখতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়া জাপানি নাগরিক মা নাকানো এরিকো এবং বাংলাদেশি বাবা ইমরান শরীফ দম্পতির তৃতীয় সন্তানকে জাপান থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে হাজির করার জন্য নির্দেশনা চেয়ে এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। এর পরে ওই রিটের বিষয়ে মূল রিটের সঙ্গে শুনানি করা হবে বলে আদালত গত ৩০ সেপ্টেম্বর আদেশ দেন। এর পরে আজ নির্ধারিত দিনে দুপুর ২টার পর এসব বিষয়ের ওপর শুনানি হয়। শুনানিতে ইমরান শরীফের আইনজীবীদের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানির পরবর্তী দিন ঠিক করে আদেশ দেন আদালত।

এ বিষয়ে ইমরান শরীফের আইনজীবী ব্যারিস্টার কাজী মারুফুল আলম বলেছেন, জাপানে থাকা কনিষ্ঠ কন্যাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে উপস্থাপন করার নির্দেশনা চেয়ে গত সেপ্টেম্বরর মাসে হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদন করা হয়।

ইমরান শরীফের আইনজীবী ব্যারিস্টার কাজী মারুফুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, জাপানি নাগরিক মা নাকানো এরিকো বাংলাদেশের আইনের আওতায় এসে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তিনি তার এক শিশুকে লুকিয়ে রেখেছেন। তাই আমরা তাকে হাইকোর্টে হাজির করার জন্য আবেদন জানিয়েছি।

তৃতীয় শিশু জাপানে আছে কি না, জানতে চাইলে এ আইনজীবী আরও বলেন, ওই শিশু কোথায় আছে আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি, শিশুটিকে লুকিয়ে রেখেছেন তার মা। তাই আমরা রিট আবেদনটি করেছি। যাতে ওই শিশুকে আদালতে উপস্থিত করা হয়।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ মর্মে আদেশে দেন যে, রাজধানীর গুলশানের ফ্ল্যাটে দুই শিশু জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনার সঙ্গে জাপানি নাগরিক মা নাকানো এরিকো রাতসহ ২৪ ঘণ্টা থাকবেন। বাবা ইমরান শরীফ শুধু দিনে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন। এই সময়ে ওই ফ্ল্যাটের ভাড়া শিশুদের বাবা-মাকে সমানভাবে বহন করতে হবে।

আদেশে আদালত বলেছিলেন, ২১ অক্টোবর পর্যন্ত এ আদেশ কার্যকর থাকবে। ওই দিন পরবর্তী আদেশ দেবেন হাইকোর্ট। এরই ধারাবাহিকতায় আজ এ বিষয়ে শুনানির হয়। এর আগে হাইকোর্টের নির্দেশনায় ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে গুলশানের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে দুই শিশুর সঙ্গে দিনে বাবা ও রাতে মা থাকছিলেন।

ওইদিন আদালত শিশুদের জন্য মঙ্গল হয় এবং দেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য উভয়পক্ষের আইনজীবীকে একটি সুন্দর সমাধান খুঁজতে বলেছিলেন।

গত ২৩ আগস্ট মায়ের সঙ্গে ঢাকা মহানগর পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে থাকা দুই শিশুকে উন্নত বাসায় রাখার প্রস্তাব করেছিলেন তাদের বাবা ইমরান শরীফ। ৩১ আগস্ট গুলশানের ভাড়া বাসায় থাকতে বাবা-মা সম্মতি দিলে তাদের আইনজীবীদের অনুমতি দিয়ে ১৫ দিন ভাড়া বাসায় থাকার আদেশ দেন আদালত।

দুই শিশুকন্যাকে ফিরে পেতে হাইকোর্টে শিশুদের হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে ঢাকায় এসে গত ১৯ আগস্ট রিট আবেদন করেন জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো, যিনি পেশায় চিকিৎসক। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওইদিনই হাইকোর্টের একই বেঞ্চ দুই শিশুকে ৩১ আগস্ট আদালতে হাজির করতে তাদের বাবা শরীফ ইমরান ও ফুফুকে নির্দেশ দেন।

শিশুদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গুলশান ও আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নির্দেশনা দিয়েছিলেন আদালত। একইসঙ্গে ১৯ আগস্ট দুই সন্তানকে নিয়ে তাদের বাবা যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য ৩০ দিনের নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়েছিল।

এরপর গত ৮ সেপ্টেম্বর দুই মেয়েকে নিয়ে বাধাহীনভাবে উন্মুক্ত পরিবেশে চলাচল ও রাতে তাদের সঙ্গে ঘুমানোর অনুমতি পান জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো। আর বাবা দুই শিশুর সঙ্গে দিনের বেলায় থাকতে পারবেন বলে আদেশ দেন হাইকোর্ট।

আদেশে আদালত বলেন, বাবা-মা দুজনই তাদের শিশুদের নিয়ে বাইরে যেতে ও কেনাকাটা করতে পারবেন। এছাড়াও ফ্ল্যাটের ভেতরে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরা অপসারণ করতে হবে। তবে বাসার বাইরে সিসি ক্যামেরা থাকতে পারে।

এর আগে ২৫ আগস্ট জাপানি দুই শিশুকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার থেকে সুবিধামতো রাজধানীর যেকোনো একটি উন্নতমানের হোটেলে রাখার নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন তাদের বাবা। শিশুদের বাবার পক্ষে আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরোজ এ আবেদন করেন।

গত ২২ আগস্ট ওই দুই শিশুকে হেফাজতে নেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তখন ওই দুই শিশুকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখা হয়।

২০০৮ সালে জাপানি চিকিৎসক নাকানো এরিকো ও বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক শরীফ ইমরান (৫৮) জাপানি আইন অনুযায়ী বিয়ে করে টোকিওতে বসবাস শুরু করেন। তাদের ১২ বছরের সংসারে তিন কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। তারা তিনজনই টোকিওর চফো সিটিতে অবস্থিত আমেরিকান স্কুল ইন জাপানের শিক্ষার্থী ছিলেন।

চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি শরীফ ইমরানের এরিকোর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। ২১ জানুয়ারি ইমরান আমেরিকান স্কুল ইন জাপান কর্তৃপক্ষের কাছে তার মেয়ে জেসমিন মালিকাকে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু এতে এরিকোর সম্মতি না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ ইমরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরপর একদিন জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনা স্কুলবাসে বাড়ি ফেরার পথে বাসস্টপ থেকে ইমরান তাদের অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান।

গত ২৫ জানুয়ারি শরীফ ইমরান তার আইনজীবীর মাধ্যমে এরিকোর কাছ থেকে মেয়েদের পাসপোর্ট হস্তান্তরের আবেদন করেন। কিন্তু এরিকো ওই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে মেয়েদের নিজ জিম্মায় পেতে আদেশ চেয়ে গত ২৮ জানুয়ারি টোকিওর পারিবারিক আদালতে মামলা করেন। আদালত ৭, ১১ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি মেয়েদের সঙ্গে এরিকোর সাক্ষাতের অনুমতি দিয়ে আদেশ দেন।

কিন্তু ইমরান আদালতের আদেশ ভঙ্গ করে মাত্র একবার মায়ের সঙ্গে দুই মেয়েকে সাক্ষাতের সুযোগ দেন। এরপর গত ৯ ফেব্রুয়ারি ‘মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে’ ইমরান তার মেয়েদের জন্য নতুন পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে নিয়ে তিনি দুবাই হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন।

এরপর গত ৩১ মে টোকিওর পারিবারিক আদালত জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে তাদের মা এরিকোর জিম্মায় হস্তান্তরের আদেশ দেন। তবে দুই মেয়ে বাংলাদেশে থাকায় বিষয়টি নিয়ে তিনি বাংলাদেশের একজন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। গত ১৮ জুলাই তিনি শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে আসেন।

এফএইচ/এমআরআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]