আগে নিজের ঘরের আগুন নেভান: ফায়ারম্যানকে আপিল বিভাগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:২৯ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০২১

রাজশাহীর এক ফায়ারম্যানের বিরুদ্ধে যৌতুক না দেওয়ায় নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেছিলেন স্ত্রী। চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়াসহ বেশ কয়েক দফা কারাভোগ করেন ফায়ার সার্ভিসের ওই কর্মী। সেই মামলা চূড়ান্ত ধাপে এসে মঙ্গলবার (২৬ অক্টোবর) আপিল বিভাগে শুনানির জন্য ওঠে।

ওই শুনানিতে আপোষের জন্য আবেদন করেন স্বামী। তিনি গত ২২ সেপ্টেম্বর দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে হাজির হয়ে অঙ্গীকার করেছিলেন স্ত্রীকে আর নির্যাতন করবেন না। তবে ভবিষ্যতে স্ত্রীকে আর নির্যাতন করবেন না বলে সর্বোচ্চ আদালতের কাছে অঙ্গীকার করলেও আদালত স্ত্রীর নামে একটু জমি লিখে দিতে বলেছিলেন তাকে। আদালতের অভিপ্রায় অনুসারে তিনি তার স্ত্রীর নামে লিখে দেন আট শতক জমি।

আজ জমাজমি সংক্রান্ত ওই কাগজপত্রও দাখিল করেন আপিল আদালতে। পাশাপাশি আদালতে হাজির হয়ে সুখী দাম্পত্য জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় এখন চাকরি ফেরত পেতে যাচ্ছেন সেই ফায়ারম্যান স্বামী।

আর সেই আপোষ আবেদন ও জমি লিখে দেওয়ার বিষয়টি উপস্থাপনের পর আজ শুনানি নিয়ে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বিচারপতির বেঞ্চ মামলা নিষ্পত্তি করে রায় দেন।

এদিন আদালতে স্বামীর পক্ষে শুনানি ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ।

শুনানির সময় আপিল আদালত ফায়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, চাকরি ফিরে পেলে আবার বিয়ে করতে যাবেন না তো? নাকি চাকরি পাওয়ার পরে টাকা হাতে টাকা-পয়সা হলে মনে করবেন আবার একটা বিয়ে করি। জবাবে ফায়ার সার্ভির্সের ওই কর্মী বলেন, ‌‘জিনা স্যার আর বিয়ে করবো না।’

এ পর্যায়ে দেশের প্রধান বিচারপতি আবার তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আর কখনো স্ত্রীকে মারবেন? সর্বোচ্চ আদালতে যুক্ত ফায়ারম্যান জবাবে বলেন, ‘জিনা মাই লর্ড, আর কখনো এমনটা হবে না।’

এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরা চাই আপনারা দুইজন (স্বামী-স্ত্রী) ভালোভাবে থাকুন। আপনাদের একটি সন্তান আছে। এতে সবচেয়ে লাভ হবে তার। সে বাবা ও মা দুজনকেই একসঙ্গে কাছে পাবে। সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে। অন্তত শিশুসন্তানের দিকে তাকিয়ে আপনারা আর কখনো ঝগড়া করবেন না।আমরা কর্তৃপক্ষকে বলে দেবো আপনার চাকরি আবার ফিরিয়ে দিতে।

এ পর্যায়ে রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, সুযোগ-সুবিধার কথা বলে দিন স্যার। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ আইনজীবী কাজলকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা।

শেষ পর্যায়ে এসে আপিল বিভাগের অপর বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ফায়ার সার্ভিস কর্মীর উদ্দেশ্যে বলেন, আপনি তো ফায়ার ব্রিগেডে কাজ করেন, ফায়ার ব্রিগেডের আগুন নেভানোর আগে নিজের ঘরের আগুন নেভান। এরপর সিরিয়ালে থাকা অন্য মামলার শুনানি শুরু হয় আদালতে।

গত ২২ সেপ্টেম্বর ভবিষ্যতে স্ত্রীকে আর নির্যাতন করবেন না বলে সর্বোচ্চ আদালতের কাছে অঙ্গীকার করলে আদালত স্ত্রীর নামে একটু জমি লিখে দিতে বলেছিলেন স্বামীকে। এক মাসের মধ্যে স্বামী যদি আদালতের এ আদেশ বাস্তবায়ন করেন, তবে তার বরখাস্ত হওয়া চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ারও আশ্বাস দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ।

মামলার বিবরণে জানা যায়, অর্থ দাবি করে নির্যাতন করায় ফায়ারম্যান স্বামীর বিরুদ্ধে যৌতুকের অভিযোগে মামলা করেন স্ত্রী। পরে রাজশাহীর নারী-শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রায়ে স্বামীর সাজা হয় এবং তিনি চাকরি থেকে বরখাস্ত হন। তবে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল মঞ্জুর করে হাইকোর্ট ওই স্বামীকে খালাস দেন।

হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল বিভাগে আবেদন করেন। অন্যদিকে স্বামী মামলা খারিজ চেয়ে আপিল বিভাগে একটি ‘সমঝোতার আবেদন’ করেন। এ নিয়ে শুনানির আগে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আবারও ঝগড়া ও মারামারি হয় বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী জানান।

একপর্যায়ে নির্যাতনের শিকার স্ত্রী গত ২১ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগে উপস্থিত হয়ে তার ওপর নির্যাতনের কথা আদালতকে বর্ণনা করেন। তবে এ বিষয়ে শুনানি মুলতবি হলে পরের দিন ২২ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত দিনে আবার ওই দম্পতি আপিল বিভাগে হাজির হন। ওই দিন স্বামী-স্ত্রী দুজনই হাজির হয়ে আপিল বিভাগে তাদের স্ব স্ব বক্তব্য পেশ করেন।

এসময় শুনানিতে আদালত স্বামীকে বলেন, আপস মীমাংসার কথা বলছেন, কিন্তু এখান থেকে গিয়ে আবার যে মারপিট করবেন না, তার কী গ্যারান্টি আছে? জবাবে স্বামী বলেন, আমি আর নির্যাতন করবো না। তবে স্যার, একহাতে তো আর তালি বাজে না।

এ পর্যায়ে আদালত স্ত্রীর কথা শুনতে চাইলে তিনি বলেন, আমার একটা সন্তান আছে, আমি চেয়েছিলাম আমার স্বামী কোনো কাজ না করলেও অন্তত আমার সঙ্গে ভালো আচরণটা করুক। কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করতেন। এখন যেহেতু বলেছেন এবারের মতো মাফ করতে, আর ওরকম আচরণ করবেন না, তাই সন্তানের কথা চিন্তা করে এ (আপসের) সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি।

এসময় আদালত ওই স্ত্রীকে প্রশ্ন করেন, এ মামলা যদি খারিজ বা নিষ্পত্তি হয়ে যায় আর তারপর যদি তার স্বামী দুর্ব্যবহার করে, তখন তিনি কী করবেন?

জবাবে তিনি বলেন, সেটা হলে তো নসিব, এক্ষেত্রে বিশ্বাস করা ছাড়া আমার আর কিছুই করার নেই। আমি আমার ছেলের বাবাকে নিয়েই থাকতে চাই, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

এরপর আদালত ওই স্বামীকে বলেন, আপনার স্ত্রী যেহেতু শিক্ষিত এবং আইনে পড়া, তাই উনি যদি চাকরি করতে চান বা ওকালতি করতে চান, তা করতে দেবেন তো? ‘জ্বি, দেবো’- আদালতকে বলেন স্বামী। এসময় আদালত বলেন, ওনাকে (স্ত্রীকে) দুর্বল মনে করবেন না। আমরা চাই, আপনাদের সংসারটা টিকুক। আপনারা দুজন দুজনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন। একজন আজ আদালতে বলছেন, এক হাতে তালি বাজে না। আমরা চাই, আগামীতে যেন কোনো হাতেই আর তালি না বাজে।

সবশেষ সর্বোচ্চ আদালত ওই স্বামীকে বলেন, আপনি একটু জায়গা আপনার স্ত্রীর নামে লিখে দিয়ে আসুন। আগামী এক মাসের মধ্যে যদি জমিটা দিয়ে আসেন, আমরা আপনার চাকরি ফিরিয়ে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বলে দেবো। এরপর আদালত শর্ত দিয়ে ২৬ অক্টোবর পরবর্তী আদেশের জন্য দিন ঠিক করেন। তারই ধারাবাহিকতায় আজ শুনানি হয়। এদিন আদালতে স্বামী ও স্ত্রী দুইজনেই হাজির ছিলেন।

এফএইচ/ইএ

 

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]