রাজারবাগ পীরসহ চারজনের বিদেশ গমনে বাধা দেওয়া যাবে: হাইকোর্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:০৪ পিএম, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১
ফাইল ছবি

অভিযোগ বিষয়ে তদন্তের স্বার্থে পুলিশের সিআইডি, কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজারবাগ দরবার শরীফের পীর দিল্লুর রহমানসহ তার সিন্ডিকেটভুক্ত ব্যক্তিদের বিদেশ যেতে বাধা দিতে পারবে বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।

এ বিষয়ে করা রিট আবেদনের শুনানিতে রোববার (৫ ডিসেম্বর) বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

এদিন আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও এমাদুল হক বশির।

গত বৃহস্পতিবার (২ ডিসেম্বর) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রাজধানীর শান্তিবাগের বাসিন্দা ব্যবসায়ী একরামুল আহসান কাঞ্চনের পক্ষে অ্যাডভোকেট এমাদুল হক বশির এ রিট আবেদন করেন। রিটে পীর দিল্লুর রহমানসহ চার জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়। পীর দিল্লুর ছাড়াও অপর তিনজন হলেন- শাকিরুল কবির, ফারুকুর রহমান ও মফিজুল ইসলাম।

এর আগে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, মানবপাচারসহ নানা অভিযোগে দেশের বিভিন্ন জেলায় ৪৯টি মামলা দায়ের হয়। এসব মামলায় তিনি ১ হাজার ৪৬৫ দিন জেলে খেটেছেন। কিন্তু একটি মামলারও বাদীকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ বিবেচনায় তিনি অনেক মামলাতে খালাস পেয়েছেন।

পরবর্তীতে এসব মামলার বিরুদ্ধে একরামুল আহসান কাঞ্চন ন্যায়বিচার পেতে এবং ঘটনার পেছনে দায়ীদের খুঁজতে তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন।

ওই রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিকে একরামুলের বিরুদ্ধে হওয়া ৪৯ মামলার তদন্ত করে ৬০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে রুলসহ আদেশ দেন।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সিআইডির প্রতিবেদনে কাঞ্চনের বিরুদ্ধে পীর সিন্ডিকেটের করা হয়রানিমূলক মামলার তথ্য উঠে আসে। পরে গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাজারবাগ দরবার শরীফের সব সম্পদের তথ্য খুঁজতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), তাদের জঙ্গি সম্পৃক্ততা আছে কি না তা তদন্ত করতে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এবং উচ্চ আদালতে রিটকারী আটজনের বিরুদ্ধে করা হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে তদন্ত করতে সিআইডিকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

এরই ধারাবাহিকতায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো পীর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে।

কাউন্টার টেরোরিজমের সহকারী পুলিশ সুপার শফিকুল ইসলাম সই করা প্রতিবেদনের মতামত কলামে বলা হয়েছে, রাজারবাগ দরবারের নিয়ন্ত্রণাধীন দৈনিক আল ইহসান ও মাসিক আল বাইনিয়নাত পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যা, তাদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত বিভিন্ন বই, ইতোপূর্বে তাদের কার্যক্রম এবং বিভিন্ন জেলায় তাদের অনুসারীদের কার্যক্রমের কারণে রুজুকৃত মামলা ও মামলা সমূহের তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা ইসলাম ধর্মের নামে এবং অনেক ক্ষেত্রে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের খণ্ডিত ব্যাখ্যার মাধ্যমে এদেশের ধর্মভীরু মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে। ধর্মের নামে মানুষ হত্যা, ও তথাকথিত জিহাদকে উস্কে দিচ্ছে। এদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলো যে উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের মতবাদ প্রচার করছে ও কার্যক্রম চালাচ্ছে রাজারবাগ দরবার শরীফের পীর, তার সহযোগী ও অনুসারীদের কার্যক্রম জঙ্গিদের কার্যক্রমের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

তদন্ত রিপোর্টের মতামতে আরও বলা হয়, ভিন্ন ধর্মের মানুষকে তাদের ভাষায় ‘মালাউনদের’ হত্যা করা ঈমানি দায়িত্ব উল্লেখ করে ফতোয়া দিয়েছে। এক্ষেত্রে কতল করার আদেশ দিয়েছে। যা মূলত বাংলাদেশের নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলামের মানুষকে হত্যা করার ফতোয়ার অনুরূপ। তাদের এ ধরনের বক্তব্য মানুষকে জঙ্গিদের দিকে ধাবিত করবে।

তাদের প্রচারণা ও অন্যান্য কার্যক্রমের মাধ্যমে মূলত তারা এদেশের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং গণতন্ত্রবিরোধী একটি শ্রেণি বা গোষ্ঠী তৈরি করতে চাচ্ছে। এছাড়া তারা ছোঁয়াচে রোগবিরোধী ও বাল্য বিয়ের পক্ষে বিভিন্ন বক্তব্য এবং ফতোয়া দিয়ে ধর্মভীরু ও সহজ-সরল সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে।

তদন্তে সার্বিক পর্যালোচনায় সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, তারা এখনও জঙ্গি সংগঠন হিসেবে কালো তালিকা ভুক্ত না হলেও তাদের বিভিন্ন প্রকাশনা, বক্তব্য, মুরিদ ও অনুসারীদের প্রতি তাদের নির্দেশনার ফলে ধর্মীয় উগ্রবাদী এবং জঙ্গিবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ রিপোর্ট দাখিলের পর আদালত উভয়পক্ষের শুনানি শেষে রাজারবাগ পীরের কর্মকাণ্ডের ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখতে কাউন্টার টেরোরিজমকে নির্দেশ দেন আদালত।

একই সঙ্গে সিআইডিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলা হয়েছে, তাদের প্রয়োজনে রাজারবাগ পীরসহ চারজনের বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারবে।

পাশাপাশি সিআইডির প্রতিবেদনের আলোকে ভুক্তভোগীরা চাইলে রাজারবাগের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবে বলে আদেশ দেন আদালত।

এফএইচ/এমকেআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]