ব্যক্তিগত আয়কর নথি অডিটে পড়ার কারণ ও করণীয় (পর্ব-২)

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪:৪১ পিএম, ১৫ জানুয়ারি ২০২২

অডিট আয়কর আইনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একটি আয়কর নথি বিভিন্ন কারণে অডিটে পড়তে পারে। সাধারণত আয়-ব্যয়, সম্পদের ধারাবাহিকতা বা অসামাঞ্জস্যতাই অডিটের পড়ার প্রধান কারণ। আমরা বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে সমগ্র অডিটের পড়ার কারণ নিয়ে তিন পর্বে আলোচনা করবো। আজ থাকছে দ্বিতীয় পর্ব।

প্রথম পর্বে বোঝার স্বার্থে আমরা কয়েকটি উদাহরণের অবতারণা করেছিলাম। উদাহরণগুলো যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে সহজেই বোধগম্য হবে, পরিপূর্ণ দলিলাদি দাখিলের অভাবেই একটি আয়কর নথির অডিট আপত্তি হতে পারে। যদি অডিট আপত্তি হয়েই যায় তাহলে আতঙ্কিত না হয়ে অডিট আপত্তির মোকাবিলা করতে হবে।

একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, যখন অডিটের নোটিশ আসে তখন সেই নোটিশে আয়কর নথি অডিটে পড়ার কারণ উল্লেখ থাকে। একজন করদাতার প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে কারণগুলোর যথাযথ অনুসন্ধান করা। অর্থাৎ, কারণগুলোর জবাব খুঁজে বের করা।
প্রত্যেকটি কারণের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়াও যেসব নথিপত্র তলব করা হয়েছে যতটুকু সম্ভব সেসব নথিপত্র দাখিল করতে হবে। ধরুন, মোকলেস সাহেবের বেতনের ব্যাংক বিবরণী তলব করা হয়েছে। তাহলে মোকলেসকে অডিটের জবাবের সঙ্গে ব্যাংক বিবরণী দাখিল করতে হবে। মোদ্দাকথা, দলিলাদি বা ডকুমেন্টের কোনো বিকল্প নেই।

ইংরেজিতে একটি কথা প্রচলিত আছে, ‘Prevention is better than cure’ অর্থাৎ রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করাই উত্তম। তাই আয়কর নথি দাখিল করার সময় আয় ও সম্পদের ধরন অনুযায়ী একটা চেকলিস্ট তৈরি করে নেওয়া যেতে পারে। নিচে আয়ের ধরন অনুযায়ী চেকলিস্টের উদাহরণ দেওয়া হলো:
• চাকরিজীবী (সরকারি/বেসরকারি)
• বেতন বিবরণী /Salary Certificate
• কর কর্তন সার্টিফিকেট (Tax Certificte/ বেতন থেকে যে ট্যাক্স কেটে রাখা হয়েছে সেই ট্যাক্স কর্তনের সনদ বা সার্টিফিকেট। যেমন ধরুন, মকবুল সাহেবের বেতন থেকে অফিস ১০ হাজার টাকা ট্যাক্স কর্তন করেছে। সেক্ষেত্রে মকবুলের অফিস থেকে এই ১০ হাজার টাকা কর্তনের পক্ষে একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করবে। সংশ্লিষ্ট সার্টিফিকেটে এই ১০ হাজার টাকা যে চালানে জমা দিয়েছেন সেই চালানের নম্বর ও তারিখ উল্লেখ থাকবে। সম্ভব হলে সেই ট্যাক্সের টাকা জমা দেওয়ার ব্যাংকের চালানের ফটোকপি।
• ব্যাংক বিবরণী /Bank Statement (বেতনের টাকা ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের এক বছরের বিবরণী
• কোনো ব্যক্তি যদি একই অর্থবছরে দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে যেমন, জাকারিয়া সাহেব একই অর্থবছরে ছয় মাস একটি প্রতিষ্ঠানে এবং বাকি ছয় মাস আরেকটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তাহলে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে উপরোক্ত তথ্যাদি সংগ্রহ করতে হবে।
• স্বীকৃত ভবিষ্যৎ তহবিলের (পিএফ) অধীনে অর্জিত টাকা ও স্বীকৃত ভবিষ্যৎ তহবিলের টাকার মুনাফার তথ্য দিতে হবে। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে, কর্মরত প্রতিষ্ঠানের উল্লেখিত ভবিষ্যৎ তহবিলটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অনুমোদিত কিনা। এছাড়াও চাকরি পরিবর্তনের ফলে স্বীকৃত ভবিষ্যৎ তহবিলের (পিএফ) টাকা একবারে পেয়ে থাকলে তার সার্টিফিকেট ও ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দিতে হবে।
• ব্যবসায়ী (একক মালিকানাধীন ব্যবসা/যাদের শুধু ট্রেড লাইসেন্স আছে/এফ-কমার্স ব্যবসায়ী/ই-কমার্স ব্যবসায়ী সমগ্র বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব ও স্থিতিপত্র (Income Statement ও Balance Sheet)
• ব্যাংক বিবরণী/Bank Statement (ব্যবসার পণ্য বিক্রির টাকা ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের এক বছরের বিবরণী।
• ট্রেড লাইসেন্সের কপি।
• ট্রেড লাইসেন্স প্রতিবছর রিনিউ করার সময় ট্যাক্সের টাকা যে চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়েছে সেই চালানের ফটোকপি।
• ব্যবসার নামে যদি কোনো সম্পত্তি (যেমন, জমি, প্লট, ফ্ল্যাট বা গাড়ি ইত্যাদি) কেনা হয় তাহলে তার দলিলাদি।

বাড়িওয়ালার ক্ষেত্রে
• ভাড়ার চুক্তিনামা (আবাসিক/ অনাবাসিক উল্লেখ থাকতে হবে)
• ভাড়ার রসিদ (প্রতি মাসের বাড়ি ভাড়ার রিসিপ্ট)।
• সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্সের রসিদ।
• ল্যান্ড ট্যাক্স জমা দেওয়ার রসিদ।
• বাড়ি বা ফ্ল্যাটের ভাড়ার টাকা রাখার জন্য আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করতে হবে। ভাড়ার টাকা ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক একাউন্টের এক বছরের বিবরণী
• ব্যাংক লোন প্রাপ্তির পক্ষে সার্টিফিকেট (যদি ব্যাংক লোন থাকে)।
• বাড়ি যদি ঋণের (ব্যাংক) মাধ্যমে করা হয় তাহলে প্রতি বছর ঋণের টাকা জমা দেওয়ার ব্যাংকের হিসাব বিবরণী ও লোনের ট্যাক্স সার্টিফিকেট।
জমি (প্লট/ফ্ল্যাট) বিক্রেতা
• জমির মালিকানা স্বত্ব (যে দলিলের মাধ্যমে করদাতা জমির মালিকানা অর্জন করেছেন। যেমন, জমি কেনার মাধ্যমে মালিকানা অর্জন করে থাকলে জমি কেনার দলিল। জমি যদি উত্তরাধিকার সূত্রে অর্জন করে তাহলে তার স্বপক্ষে দলিলাদি (যেমন, উত্তরাধিকার সনদ, বাটোয়ারা দলিল ইত্যাদি)। যদি উইল বা অছিয়তের মাধ্যমে জমির মালিকানা অর্জন হয় তাহলে উইল বা অছিয়তের দলিলাদি। জমি যদি দানপত্রের মাধ্যমে পেয়ে থাকে তাহলে দান দলিল।)
• জমির বিক্রয় দলিল (জমি যে দলিলের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছে সেই দলিল)।
• জমি বিক্রি করার সময় যে কর পরিশোধ করা হয়েছে তার প্রমাণপত্র (যে চালান বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে কর পরিশোধ করা হয়েছে সেই চালান বা পে-অর্ডারের ফটোকপি)।
পরবর্তী পর্বে আমরা আরও কিছু খাতের চেকলিস্ট দেখবো।

চলবে…

মো. রাজু আহমেদ
আয়কর আইনজীবী

এএ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]