ব্যক্তিগত আয়কর নথি অডিটে পড়ার কারণ ও করণীয় (শেষ পর্ব)

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫:১০ পিএম, ২৫ জানুয়ারি ২০২২

অডিট আয়কর আইনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একটি আয়কর নথি বিভিন্ন কারণে অডিটে পড়তে পারে। সাধারণত আয়-ব্যয়, সম্পদের ধারাবাহিকতা বা অসামাঞ্জস্যতাই অডিটের পড়ার প্রধান কারণ। আমরা বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে সমগ্র অডিটের পড়ার কারণ নিয়ে তিন পর্বে আলোচনা করবো। আজ থাকছে শেষ পর্ব।

দ্বিতীয় পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম, অডিট আপত্তির জবাব কীভাবে দেবো এবং কিছু আয়ের খাতের চেকলিস্ট নিয়ে। এই পর্বে আমরা বাকি খাতগুলোর চেকলিস্ট দেখবো।

>> সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ক্ষেত্রে
>> সঞ্চয়পত্রের সার্টিফিকেটের কপি
>> সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ট্যাক্স সার্টিফিকেট (যেমন, ডাকঘর

থেকে সঞ্চয়পত্র কেনা হলে ডাকঘর সেই সঞ্চয়পত্রের পক্ষে প্রতিবছর একটি সার্টিফিকেট ইস্যু করবে যেখানে মুনাফা ও ট্যাক্স কর্তনের বিষয় উল্লেখ থাকবে)।

>> ব্যাংক বিবরণী (সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকা ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ১ বছরের বিবরণী)
>> গাড়ির মালিকের ক্ষেত্রে
>> গাড়ি কেনার চুক্তিনামা
>> গাড়ির অগ্রিম কর বা ট্যাক্স যে ব্যাংকে জমা দেওয়া হয়েছে তার ডকুমেন্ট
>> গাড়ি বিক্রি করে থাকলে বিক্রির চুক্তিনামা
>> গাড়ির রেজিস্ট্রেশন কার্ড
>> ফ্রিল্যান্সারদের জন্য
>> ব্যাংক থেকে ফরেন রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট নিতে হবে (ফ্রিল্যান্সিংয়ের টাকা অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনতে হবে। টাকা যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক থেকে ফরেন রেমিট্যান্স প্রাপ্তির স্বপক্ষে সার্টিফিকেট নিতে হবে।)
>> ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট (ফ্রিল্যান্সিংয়ের টাকা ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ১ বছরের বিবরণী)
>> যে মার্কেটপ্লেস (upwork, fiverr ইত্যাদি) এ কাজ করা হয়েছে তার পক্ষে দলিলাদি (যেমন, প্রোফাইল ও কাজের তথ্য)
>> মার্কেট প্লেসের বাইরে কাজ করে থাকলে সেক্ষেত্রে যদি কোনো চুক্তিপত্র থাকে তাহলে সেই চুক্তিপত্রের কপি। যেমন, মেইলে কার্যাদেশ প্রাপ্তির তথ্য (Work order)।
>> পেশার সনদ (যেমন, সংশ্লিষ্ট ফ্রিল্যান্সার যদি গ্রাফিক ডিজাইনার হন তার পক্ষে সনদ)
>> ফ্রিল্যান্সার কার্ড (যদি থাকে)।
>> মনে রাখতে হবে, সংশ্লিষ্ট আয় ট্যাক্স ফ্রি দাবি করতে হলে প্রতি বছর অবশ্যই আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
>> ফ্রিলান্সিংয়ের খাত- Software development; Software or application customization; Nationwide Telecommunication Transmission Network (NTTN); Digital content development and management; Digital animation development; Website development; Web site services; Web listing; IT process outsourcing; Website hosting; Digital graphics design; Digital data entry and processing; Digital data analytics; Geographic Information Services (GIS); IT support and software maintenance service; Software test lab services; Call center service; Overseas medical transcription; Search engine optimization services; Document conversion, imaging and digital archiving; Robotics process outsourcing, Cyber security services, Cloud service, System Integration, e-learning platform, e-book publications, Mobile application development service এবং IT Freelancing

** প্রবাসীদের জন্য
>> ব্যাংক থেকে রেমিট্যান্স সার্টিফিকেট নিতে হবে (বিদেশে আয়ের টাকা অবশ্যই ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে আনতে হবে)।
>> ব্যাংক অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট (বিদেশে আয়ের টাকা ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ১ বছরের বিবরণী (১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত)
>> যে দেশে কাজ করেছে সেই দেশে কাজের চুক্তিপত্র (বিদেশে যে কোম্পানিতে চাকরি করেছে সেই কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত বেতনের ডকুমেন্ট)
>> পাসপোর্টের কপি
>> মনে রাখতে হবে, সংশ্লিষ্ট আয় ট্যাক্স ফ্রি দাবি করতে হলে প্রতিবছর অবশ্যই আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হবে।
>> অন্যান্য
>> আগের বছর রিটার্ন জমা দিয়ে থাকলে এর ফটোকপি ও প্রাপ্তি স্বীকারপত্র (পুরাতন কর দাতা হলে)
>> ই-টিন সার্টিফিকেট
>> জাতীয় পরিচয়পত্র (ভোটার আইডি কার্ড)
>> মোটরযান (গাড়ি, বাইক বেচাকেনা করে থাকলে তার প্রমাণাদি)
>> স্বর্ণ, রৌপ্য, হীরা তিনে থাকলে তার প্রমাণাদি
>> আসবাবপত্রের তথ্যাদি (বেচাকেনা করে থাকলে তার প্রমাণাদি)
>> ইলেক্ট্রনিক সামগ্রীর তথ্যাদি (কম্পিউটার, ফ্রিজ, টিভি, মোবাইল ইত্যাদি কেনাবেচা করে থাকলে তার প্রমাণাদি)
>> শেয়ার মার্কেট থেকে আয় থাকলে তার তথ্যাদি (পোর্টফলিও, সার্টিফিকেট, লেজার ইত্যাদি। যেমন ধরুন, মি. মোকলেসের শেয়ার হিসাব বের করতে হলে সংশ্লিষ্ট বছর অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত লেজারের কপি ব্রোকারেজ হাউস থেকে তুলতে হবে। এছাড়াও বছর শেষে (অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত) একটি সার্টিফিকেট তুলতে হবে। শেয়ারের টাকা ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ১ বছরের বিবরণী (১ জুলাই  থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত)  

>> দান (বাবা-মা ও স্বামী স্ত্রী) বা ঋণ নিয়ে থাকলে তার তথ্যাদি (যদি ৫ লাখ টাকার অধিক দান বা ঋণ করা হয় তাহলে অবশ্যই ব্যাংকের মাধ্যমে করতে হবে, সেক্ষেত্রে ব্যাংকের স্টেটমেন্টে এই দান বা ঋণের তথ্যের প্রতিফলন ঘটতে হবে। লোন যদি ব্যাংক থেকে নেওয়া হয় তাহলে ব্যাংক থেকে প্রতি বছর সেই লোনের একাউন্ট স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করতে হবে যেখানে লোনের Principle amount ও Interest amount আলাদা করা থাকবে)

>> এফডিআর (FDR) এর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এফডিআর অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট (মুনাফা ও ট্যাক্স কর্তনসহ এফডিআরের টাকা ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ১ বছরের বিবরণী)

>> ডিপিএস (DPS) এর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ডিপিএস অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট (মুনাফা ও ট্যাক্স কর্তনসহ ডিপিএস এর টাকা ব্যাংকের যে অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে সেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ১ বছরের বিবরণী)

>> প্রাইজ বন্ডের তথ্য দিতে হবে (বেচাকেনা যা করাই হোক না কেন)

>> পারিবারিক ব্যয় সংক্রান্ত তথ্যাদি

>> কর অব্যাহতি প্রাপ্ত বা করমুক্ত আয়ের তথ্যাদি (যেমন, মৎস্য খামার, গরুর খামার ইত্যাদি)

>> কৃষিজমি থাকলে, সেই কৃষিজমি থেকে আয়ের তথ্য।

>> সব ধরনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব দিতে হবে (যেমন, প্লট, ফ্ল্যাট, কৃষিজমি, অকৃষি জমি, গ্রামের পতিত জমি ক্রয়-বিক্রয় করে থাকলে তার হিসাব। সংশ্লিষ্ট ভূমিতে কোনো উন্নয়ন বা স্থাপনা বা বিল্ডিং বা ঘর তৈরি করলে তার তথ্য ও হিসাব উল্লেখ করতে হবে। উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো সম্পত্তি প্রাপ্ত হলে তার হিসাব ও তথ্য দিতে হবে। জমি বা ফ্ল্যাট বুকিং দিলেও তার তথ্য ও হিসাব দিতে হবে)।

>> বিনিয়োগ বা রিবেট সংক্রান্ত তথ্য (কর ছাড় নিতে হলে প্রতি বছর কেনা সঞ্চয়পত্রের তথ্য, ডিপিএস (লিমিট ৬০ হাজার পর্যন্ত), লাইফ ইন্সুরেন্স, শেয়ার মার্কেটের বিনিয়োগ, স্বীকৃত পিএফ ফান্ডের বিনিয়োগ, গোষ্ঠী বিমা তহবিলে চাঁদার বিনিয়োগ- এছাড়াও আয়কর নির্দেশিকায় উল্লেখিত খাতে বিনিয়োগের তথ্যাদি)

>> করদাতা কোনো কোম্পানির পরিচালক হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির অধিগ্রহণ করা শেয়ারের হিসাব

>> কোথাও কোনো {AIT(Advance Income Tax/অগ্রিম কর)/TDS(Tax Deducted at Source/উৎসে কর) কর বা ট্যাক্স কেটে রাখলে তার তথ্যাদি দিতে হবে।

উপরের সব দলিলের ফটোকপি আয়কর অফিসে আয়কর রিটার্নের সঙ্গে জমা দিতে হবে। এসব তথ্যের বাইরে যদি কোনো আয় (যেমন, লটারি প্রাপ্তি, সম্মানী ভাতা ইত্যাদি) বা তথ্যাদি থাকে তাহলে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। 

আমরা তিনটি পর্বের মাধ্যমে আয়কর নথি অডিটে পড়ার কারণের বিস্তারিত আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। প্রথম পর্বে আমরা বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে অডিটে পড়ার কারণ বোঝার চেষ্টা করেছি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্বে আমরা যথাক্রমে অডিট আপত্তির জবাব ও কোন কোন দলিলাদি আয়কর রিটার্নের সঙ্গে জমা দিলে আয়কর নথি অডিটে পড়ার আশঙ্কা কমে যায় সে বিষয়ে কথা বলেছি। তবে মনে রাখতে হবে, ‘অডিট’ আয়কর আইনের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া তাই আয়কর নথি অডিটে প্রক্রিয়ার আওতায় এলে আতঙ্কিত না হয়ে তা মোকাবিলা করাই উত্তম।

মো. রাজু আহমেদ
আয়কর আইনজীবী


এএ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]