ই-কমার্সের মাধ্যমে কত টাকা পাচার হয়েছে, জানতে চান হাইকোর্ট

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৩৭ পিএম, ২৩ মে ২০২২
ফাইল ছবি

প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির মাধ্যমে ই-কমার্স বিদেশে কত টাকা পাচার করা হয়েছে তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে ই-কমার্সের অর্থপাচারের ঘটনার নেপথ্যে কে বা কারা জড়িত এবং কাদের ব্যর্থতায় অর্থপাচার হয়েছে, সংশ্লিষ্টদের কাছে এ বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে।

সোমবার (২৩ মে) পৃথক তিন রিটের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি খিজির হায়াতের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আইনজীবী ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল জাগো নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিন আদালতে রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব, আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও অ্যাডভোকেট মো. আনোয়ারুল ইসলাম বাদল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার তাপস কান্তি বল। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার খান মোহাম্মদ শামীম আজিজ।

আদেশের বিষয়ে ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব সাংবাদিকদের বলেন, ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে কী পরিমাণ টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, তা নিরূপন করতে দুদকসহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

পাশাপাশি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনেতে আসা গ্রাহক বা ক্ষতিগ্রস্তদের টাকার পরিমাণ নির্ধারণ করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এছাড়া আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়বদ্ধতা নির্ধারণে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।

আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কম্পেটিশন কমিশন, ভোক্তা অধিকার- এ তিন প্রতিষ্ঠানের নিষ্ক্রিয়তার কারণে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। তাই তাদের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না সেটি চ্যালেঞ্জ করে আদালতের নির্দেশনা চেয়ে রিটটি করেছিলাম। ওই রিটের শুনানি নিয়ে তাদের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। এছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাদের অর্থ কেন ফিরিয়ে দেওয়া হবে না, রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে। আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলেছেন আদালত।

অপর রিটকারীদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আনোয়ারুল ইসলাম বাদল আদেশের বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জানান, ই-কর্মাসের দায়িত্ব কার। রেগুলেটরি কমিটি গঠন করার দায়িত্ব কার। রেগুলেটরি বডি বা অথরিটির জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট বাডি গঠন করা হবে কি না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।

গত ২১ এপ্রিল হাইকোর্টের একই বেঞ্চ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে পণ্য কিনতে গিয়ে পেমেন্ট গেটওয়েতে আটকে থাকা টাকা গ্রাহকদের ফেরত দিতে করা পৃথক তিনটি রিটের ওপর পরবর্তী শুনানি ও আদেশের জন্য ২২ মে দিন ঠিক করেন। ওইদিন বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সময় নেওয়ার কারণে ‘নট টুডে’ করেন আদালত। এরপর শুনানি ও আদেশের জন্য ২৩ মে ঠিক করে আদেশ দেন আদালত। এরই ধারাবাহিকতায়এসব আদেশ ও রুল জারি করে আদেশ দেন হাইকোর্ট।

এর আগে হাইকোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২৫ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালি ডটকমের ১৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ৬৭টি হিসাবের আনুষঙ্গিক দলিলাদি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হিসাবগুলোতে লেনদেনের বিবরণী থেকে জানা গেছে, ইভ্যালি ডটকম লিমিটেড ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নামে প্রাপ্ত ৩৬টি হিসাবে (সঞ্চয়ী চলতি) মোট ৩৮৯৮ দশমিক ৮২ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

এর মধ্যে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমা প্রায় ১৯৫৬ দশমিক ১৯ কোটি টাকা ও উত্তোলন হয়েছে প্রায় ১৯৪ দশমিক ৬৩ কোটি টাকা। এসব অ্যাকাউন্ট থেকে ২০১৯ সালের জুন থেকে ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেলিম রেজা, ফরিদ হোসোইন, তারিক রহমান রাকিবুর ৫০ কোটি টাকা নগদ উত্তোলন করেছেন। ৩৬টি অ্যাকাউন্টে লেনদেন হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ বিষয়ে বিএফআইইউ কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান থেকে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পলিসি কী, তা জানার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টে সংশ্লিষ্টরা এ প্রতিবেদন জমা দেন।

গত বছরের ২৫ নভেম্বর এ বিষয়ে হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানি হয়।

এর আগে আদেশ অনুযায়ী শুনানিতে এ বিষয়ে প্রতিবেদন না পেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি গত ১৬ নভেম্বর উষ্মা প্রকাশ করেন হাইকোর্টের গঠিত বেঞ্চ।

গত ২০ সেপ্টেম্বর ই-কমার্সের গ্রাহকদের স্বার্থ ও অধিকার রক্ষায় জাতীয় ডিজিটাল কমার্স পলিসির ম্যান্ডেট অনুসারে একটি স্বাধীন ই-কমার্স নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আনোয়ারুল ইসলাম।

২৩ সেপ্টেম্বর ই-অরেঞ্জে কোটি কোটি টাকা আটকে থাকা ৩৩ জন গ্রাহক ডিজিটাল বা ই-প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরির জন্য অর্থনীতিবিদ, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, ব্যবসায়ী ও অন্য অংশীজনদের নিয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন এবং ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট করেন। তাদের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

২২ সেপ্টেম্বর মানবাধিকার সংগঠন ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন, ইভ্যালি ও ই-অরেঞ্জের দুজন গ্রাহকের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লব আরেকটি রিট করেন।

রিটে কোনো ব্যক্তি বা সরকারি কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা ব্যর্থতায় ইভ্যালি, আলেশা মার্ট, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, দারাজ, কিউকম, আলাদিনের প্রদীপ ও দালাল প্লাসের মতো পরিচিত বাজার থেকে পণ্যের জন্য লাখ লাখ গ্রাহকের ক্ষতি ও আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা নির্ণয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত একজন বিচারকের নেতৃত্বে এক সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়। ওই তিন রিট একত্রে শুনানি নিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর আদালত এসব আদেশ দেন।

এফএইচ/আরএডি/এমকেআর/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]