ছোট বিষয় হ্যান্ডেল করতে পারেন না, জনসেবা করবেন কীভাবে: হাইকোর্ট

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:০৮ পিএম, ২১ জুন ২০২২

আদালতের নোটিশ জারিকারকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিচারের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রেজাউল করিম ও তার অফিস সহকারী নাজির উকিল মিয়ার ওপর ক্ষোভপ্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

মঙ্গলবার (২১ জুন) হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ ক্ষোভপ্রকাশ করেন। শুনানির শুরুতে আদালতে নোটিশ জারিকারকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিচারের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার ইউএনও মো. রেজাউল করিম ও নাজির উকিল মিয়া নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

তখন আদালত বলেন, আপনাকে ক্ষমা করলে আমরা আটকে যাবো। আদালত সবার ওপরে। আদালতের আদেশ সবার মানতে হয়। আপনি আদালতের আদেশ মানেননি। আদালতের সমন নিয়ে নোটিশ জারিকারক আপনাদের কাছে গেলেন। আপনার উচিত ছিল তাকে ধন্যবাদ দেওয়া। অথচ আপনার কী দুর্ব্যবহারটাই না করলেন। তাকে বসিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুললেন। কত অজুহাত দেখালেন। আপনি যে আচরণ করলেন তা সভ্য রাষ্ট্রে কলঙ্গ লেগে গেল। আপনি একটা ছোট বিষয় হ্যান্ডেল করতে পারেন না। কীভাবে জনসেবা করবেন? একটি কথা মনে রাখবেন আইন আদালত আছেন বলেই আপনি সম্মান পান। আপনি যদি আইন না মানেন আপনাকে কেউ মানবে না।

হাইকোর্ট ইউএনও রেজাউল করিমকে উদ্দেশ করে আরও বলেন, ‘আপনি নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নষ্ট করেছেন। আদালত অবমানার ঘটনায় আদালতে আসতে হয়েছে আপনাকে। আপনার ক্যারিয়ারে স্পট পড়ে গেলো। আমরা যদি একটি লাইন লিখে দিই আপনার ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাবে।’

আদালত বলেন, ‘আদালতের জারিকারকের সঙ্গে আপনাদের দুর্ব্যবহারের ঘটনা পত্রিকায় এসেছে। সাধারণ মানুষ বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগ নিয়ে কঅ ভাবছে জানেন? আপনার এমন আচরণ শোভনীয় নয়। বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকতে হবে।’

আদালত নাজির উকিল মিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি মূল অপরাধী। আপনি সিনক্রিয়েট করেছেন। খুব খারাপভাবে মিসগাইড করেছেন।’

আদালত ইউএনওর আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি আইনমন্ত্রী ছিলেন। একজন সম্মানিত ব্যক্তি। দুর্ভাগ্যবশত আজকে এ মামলার শুনানিতে এসেছেন।’

শুনানির শেষ পর্যায়ে আদালত ইউএনওকে সামনে ঢেকে নিয়ে বলেন, ‘ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ করবেন না। আপনার দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রতি নজর রাখবেন। আদালতকে সম্মান না করলে আপনি কখনো সম্মান পাবেন না।’

পরে আদালত ইউএনও মো. রেজাউল করিম ও তার অফিস সহকারী উকিল মিয়াকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেন। একই সঙ্গে তাদের বিষয়ে জারি করা আদালত অবমাননার রুলের আদেশ দেওয়ার জন্য আগামী রোববার ২৭ জুন পরবর্তী দিন ধার্য করেন।

আদালতে মঙ্গলবার ইউএনও-নাজিরের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ ও ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়।

এর আগে গত ৭ জুন নোটিশ জারি করতে যাওয়া আদালতের দুই কর্মচারীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ বিষয়ে নিজেদের ভূমিকা কী ছিল তার ব্যাখ্যা দিতে তাদের তলব করেন হাইকোর্ট।

একই সঙ্গে রুলে তাদের বিরুদ্ধে কেন আদালত অবমাননার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে না, তা জানতে চান আদালত।

ওইদিন হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি রাজিক–আল–জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার রুলসহ এ আদেশ দেন।

আদালতে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও তার সঙ্গে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায়। তারই আলোকে তারা আজ হাজির হয়ে ক্ষমা চান।

এ বিষয়ে ওই দিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তুষার কান্তি রায় জানিয়েছিলেন, ফরিদপুরের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে ওই ঘটনা লিখিতভাবে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে জানানো হয়। এরপর প্রধান বিচারপতি বিষয়টি শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি জে বি এম হাসানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠান। পরে আদালত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অবমাননার রুলসহ ওই আদেশ দেন।

বোয়ালমারীর আদালত থেকে পাঠানো এ সংক্রান্ত অবহিতকরণপত্র থেকে জানা যায়, গত ২৭ এপ্রিল বোয়ালমারী সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের দেওয়ানি মামলার (৫৩/২০২২) নোটিশ জারি করতে জারিকারক মো. কামাল হোসেন ও মেহেদী হাসান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যান। সেদিন দুপুর আড়াইটার দিকে নাজির উকিল মিয়ার কাছে নোটিশ গ্রহণের অনুরোধ জানালে তিনি ব্যস্ততা দেখিয়ে তাদের অপেক্ষায় রাখেন। বিকেল ৪টার দিকে তারা আবারও নাজিরের কাছে গেলে তিনি উত্তেজিত হয়ে তাদের ওপরের তলায় গিয়ে বসতে বলেন।

অন্য জায়গায় সমন জারির কাজ আছে জানালে উকিল মিয়া বলেন, তাতে তার কী, জজকোর্টের নোটিশ না রাখলে তার কী হবে? তিনি এর চেয়ে বড় কাজে ব্যস্ত আছেন। তিনি নোটিশ পাশের টেবিলে দিতে বললে পাশের টেবিলে দায়িত্বরত কর্মচারী নোটিশ বুঝে নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

জারিকারক বিষয়টি আদালতকে অবহিত করবে বললে উকিল মিয়া বলেন, ‘জজের ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, আমরা নির্বাহী বিভাগের লোক। নোটিশ না রাখলে আমাদের কিছুই হবে না।’ একপর্যায়ে নোটিশ বুঝে নেন উকিল মিয়া। এরই মধ্যে ওই অফিসের একজন কর্মচারী বিষয়টি ইউএনওকে অবহিত করলে তিনি জারিকারক দুজনকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে দরজা আটকিয়ে জেরা করতে থাকেন।

স্টাফদের সঙ্গে বাজে ব্যবহারের অভিযোগ তুলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে জারিকারকদের সাজা দেওয়ার হুমকি দেন ইউএনও। একপর্যায়ে ইউএনও মো. রেজাউল করিম এ সময়ে তাদের মোবাইল কেড়ে নেন ও মুচলেকা দিয়ে চলে যেতে বলেন। তারা রোজা আছেন জানালে ইউএনও তাদের বলেন, মুচলেকা ব্যতীত তাদের ছাড়বেন না তিনি। একপর্যায়ে পা ধরে মাফ চাইতে বাধ্য করেন ইউএনও। এরপর জোর করে নির্দেশনামতে মুচলেকা লিখিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।

অবহিতকরণপত্রে আরও বলা হয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে মুক্ত হয়ে ওই দুজন জারিকারক বিষয়টি প্রথমে জেলা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত নাজির মো. রফিকুল ইসলামকে জানান। পরে নাজির বিষয়টি নেজারত শাখার ভারপ্রাপ্ত জজকে জানান। নেজারত শাখার ভারপ্রাপ্ত জজ জারিকারকদের লিখিত অভিযোগ পরে সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠান।

গত ১৯ মে বোয়ালমারীর সিনিয়র সহকারী জজ (৫৩/২০২২ নম্বর) মামলার এক আদেশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও তার কার্যালয়ের নাজিরের বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হবে না- তা আদেশ পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেন। পরবর্তীকালে আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাইকোর্ট কারণ দর্শানোর এই নোটিশের কার্যক্রম না চালাতে বোয়ালমারীর সিনিয়র সহকারী জজকে নির্দেশ দেন।

এফএইচ/এমএএইচ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]